চৈত্র মাসের সকাল এসেছিল উষ্ণ আবহাওয়া নিয়ে। সকালের আলো ফোটার আগেই মেয়েকে নিয়ে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশে ফুল হাতে অপেক্ষা করছিলেন মোখলেছ। স্বাধীনতা দিবসে শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এসেছেন তিনি। ভোরের আলো ফুটলে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা শ্রদ্ধা জানান। তারা বেরিয়ে গেলে সর্বসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয় সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধ। নিমিষেই পুরো সৌধ এলাকা লোকারণ্যে রূপ নেয়। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে ভিড়ও। স্বাধীনতা দিবসের এই দিনে দিনভর শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় সিক্ত হন মুক্তিযুদ্ধের শহিদ ও মুক্তিযোদ্ধারা সবাই।
আনুষ্ঠানিকতার শুরু সকাল ৫টা ৫৬ মিনিটে। মঙ্গলবার (২৬ মার্চ) প্রথম প্রহরে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একই সঙ্গে শ্রদ্ধা জানান ভুটানের রাজা জিগমে খেসার নামগুয়েল ওয়াংচুক। মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর শহিদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে সেখানে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন তারা।
বাংলাদেশ সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর একটি চৌকস দল রাষ্ট্রীয় সালাম জানায়। এ সময় বিউগলে করুণ সুর বেজে ওঠে। স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণে রাখা দর্শণার্থী বইয়ে সই করেন রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান।
স্মৃতিসৌধের পরিদর্শন বইয়ে মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসে স্বাধীনতার চেতনায় বাংলাদেশকে উন্নত ও সমৃদ্ধ সোনার বাংলা গড়ে তোলার প্রতিজ্ঞা পুনর্ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আর রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন আশা প্রকাশ করেন, ‘‘দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে এবং উন্নত সমৃদ্ধ স্মার্ট বাংলাদেশ হিসেবে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে প্রতিষ্ঠিত হবে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা।’’
এরপর সফররত অতিথি সৌধ প্রাঙ্গণে চার মাস বয়সী ‘‘নাগেশ্বর চাপা’’ রোপণ করেন। সঙ্গে ছিলেন ভুটানের রানি জেৎসুন পেমা। তারা স্মৃতিসৌধ এলাকা ত্যাগ করলে
সকাল সাড়ে ৬টার দিকে সবার জন্য খুলে দেওয়া হয় জাতীয় স্মৃতিসৌধ। একে একে জাতীয় সংসদের স্পিকার, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রী, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, তিন বাহিনীর প্রধান ও ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিকরা শহীদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান।
রাজনৈতিক দলের নেতারা এসে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন। সরকারের সেতুমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের স্বাধীনতা দিবসে স্বাধীনতার ঘোষক প্রশ্নে কথা বলেন। প্রভাবশালী এই মন্ত্রী বলেন, ‘‘আজ আমাদের দেশের স্বাধীনতার ঘোষক নিয়ে বিতর্ক হয়। এত বছর পরও সেই বিতর্ক চলছে। আমাদের বক্তব্য, ঘোষণার পাঠক ঘোষক হতে পারে না। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের পর আর কারো কোনো বৈধ অধিকার নেই স্বাধীনতার ঘোষক হাওয়ার।’’
কাদেরের এমন বক্তব্যের জবাবে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান বলেন, ‘‘শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সেদিনের মেজর জিয়া বিদ্রোহ ঘোষণা করে প্রকাশ্যে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন, সেই স্বাধীনতার ঘোষণা শুধু বাংলাদেশে নয়, সেদিন ভেসে এসেছিল, আমি মেজর জিয়া বলছি, তিনি বলেছিলেন, ‘আই মেজর জিয়া হেয়ারবাই ডিক্লেয়ার দ্যাট ইন্ডিপেন্ডেন্ট রিপাবলিক অব বাংলাদেশ হ্যাজ বিন এস্টাবলিশ’ সেই কথা ইথারে ভেসে শুধু বাংলাদেশে নয়, সেই কথা সারা বিশ্বে প্রচারিত হয়েছিল। যার মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সূচিত হয়েছিল। সারাবিশ্বের মানুষ জেনেছিল, একটি স্বাধীন দেশের জন্ম হতে যাচ্ছে।’’
দেশের প্রধান দুই দলের শীর্ষনেতারা স্বাধীনতার ঘোষক বিতর্কে কথা বললেও বিরোধী অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাদের মুখে উঠে আসে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন না হওয়ার আক্ষেপ।
গণফোরামের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মফিজুল ইসলাম খান কামাল বলেন, ‘‘স্বাধীনতা অর্জন করলেও, আমরা এখনো মুক্তি পাইনি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমা মুক্তির সংগ্রামের ডাক দিয়েছিলেন। তার ডাকে আমরা জীবন বাজি রেখে স্বাধীন দেশ অর্জন করেছি। কিন্তু দুঃখের বিষয় স্বাধীনতা পাঁচ দশক পর এসেও মুক্তি পাইনি।’’
আর বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, ‘‘স্বাধীনতার যে মূল চেতনা, আকাঙ্ক্ষা ছিল গণতন্ত্র রক্ষা ও প্রতিষ্ঠা করা। স্বাধীনতার ৫৪ বছরেও সেই গণতন্ত্র অধরা।’’
একইভাবে মুক্তিযুদ্ধের প্রাপ্তি থেকে জনসাধারণ এখনও অনেক দূরে রয়েছে বলে মন্তব্য করেন জাতীয় সমাজ তান্ত্রিক দলের (জেএসডি) সহসভাপতি তানিয়া রব।
অন্যদিকে মুক্তির সংগ্রাম কোনো স্থির বিষয় না, ১৯৭১ সালেই তা শেষ হয়নি বলে মন্তব্য করেন গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি। এজন্য সংগ্রাম চলছে বলেও জানান তিনি।
তবে সরকারের কাছ থেকে শেখার আছে বলে মনে করেন যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ। তিনি বলেন, ‘‘শেখ হাসিনা যেরকম নিষ্ঠার সাথে বর্তমান বাংলাদেশকে লালন করছেন, সেখান থেকে যুব সমাজ শিক্ষা নিতে পারে।’’
এদিকে স্বাধীনতা উদযাপনের এই দিনে উচ্ছ্বাস দেখা গেছে নতুন প্রজন্ম বিশেষত শিক্ষার্থীদের মধ্যে। গাজীপুরের রাজেন্দ্রপুরের ইকবাল সিদ্দিকী কলেজের ২০০ শিক্ষার্থীকে দেখা যায়, ৬৪ ফুট লম্বা পতাকাসহ এসে মুক্তিযুদ্ধের শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে।
সাভার থেকে শ্রদ্ধা জানাতে এসেছিলেন বেসরকারি চাকরিজীবী আকরাম হেসেন। তিনি বলেন, ‘‘এবার রোজার কারণে স্মৃতিসৌধে লোকজন তুলনামূলক অনেক কম এসেছে। আমি পরিবার নিয়ে ঢাকা থেকে ভোরবেলায় এসেছি। আমার অফিসের অনেক কলিগ সেহরির পর পরেই ঢাকা থেকে রওনা দিয়েছে। সকালে স্মৃতিসৌধে সবাইকে নিয়ে ফুল দিতে পেরে অনেক ভালো লাগছে।’’
সাভারের গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইভা বলেন, ‘‘আজ স্বাধীনতা দিবসে জাতীয় স্মৃতিসৌধে আসব এটা অনেক আগে থেকেই পরিকল্পনা করে রেখেছিলাম। আমরা কয়েকজন একসঙ্গে স্মৃতিসৌধে এসেছি। স্বাধীনতা দিবসে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের শ্রদ্ধা জানাতে পেরে ভালো লাগছে।’’
জাতীয় স্মৃতিসৌধের গণপূর্তের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান বলেন, ‘‘সকালে জনসাধারণের জন্য স্মৃতিসৌধ উন্মুক্ত করার পর দলে দলে মানুষ শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। শ্রদ্ধার ফুলে ধীরে ধীরে বেদি ভরে যায়।’’
নিরাপত্তার স্বার্থে এদিন স্মৃতিসৌধসহ আশপাশের এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়।



