Friday, June 05, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

চলার পথে নতুন আতঙ্ক ‘শয়তানের নিঃশ্বাস’

ভিজিটিং কার্ড, কাগজ, কাপড়, হাত কিংবা মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে এটি লাগিয়ে কৌশলে নিঃশ্বাসের কাছাকাছি আনা হয়

আপডেট : ১১ মে ২০২৪, ০৬:১৮ পিএম

রাজধানী ঢাকার বাসিন্দা তাহমিনা বেগম (ছদ্মনাম)। কিছুদিন আগে বাজার থেকে ফেরার পথে অপরিচিত এক নারী তার কাছে কোনো একটি ঠিকানা জানতে চায়। এ সময় তার সামনে আসে আরেক তরুণ। এরপর তারা তাহমিনার কাছে জানতে চায়, তার এলাকায় পরিচিত কোনো গরীব কিংবা এতিম কেউ আছে কি-না। তারা তাকে সাহায্য করবে। তাহমিনার বাসার পাশে একটি গরীব পরিবার থাকায় সে এ বিষয়ে ওই নারী ও তরুণের কাছে বিস্তারিত জানতে চায়।

কিন্তু মাত্র দুই-তিন মিনিটের মধ্যেই তাহমিনার কী যেন হয়ে যায়। তিনি ওই অপরিচিত নারী এবং তরুণের কথা মতো তার কানের দুল, গলার চেইন এবং সঙ্গে থাকা কয়েক হাজার নগদ টাকা তুলে দেন।

নিজের সেই অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে সংবাদমাধ্যম বিবিসি বাংলাকে তাহমিনা বেগম বলেন, “আমি ওদের সঙ্গে কথা বলি কয়েক মিনিট। এরপরই কী যেন হয়ে গেল, আমার আর বুদ্ধি কাজ করছিল না। ওরা বলল, আন্টি আপনার গয়না আর টাকাগুলো ব্যাগে রাখেন। নাহলে হারিয়ে যেতে পারে। আমি ঠিক সেটাই করলাম। আমার মাথায় আসল না যে কেন আমি এগুলো খুলব, কেন হারিয়ে যাবে বা কেন ব্যাগে রাখব? তারপর ছেলেটা বলল আমার সঙ্গে আসেন। আমি তখন ব্যাগটা মেয়েটার কাছে দিয়ে ছেলেটার পেছনে হাঁটতে শুরু করি।”

তাহমিনা জানান, কিছুদূর হাঁটার পর তার সম্বিত ফিরে আসে। কিন্তু তখন তিনি আর ওই দুজনের কাউকে পাননি, ততক্ষণে তারা দুজনই সটকে পড়েছে।

তিনি বলেন, “আমি এখনও বুঝতে পারি না কীভাবে কী হয়ে গেল। ওরা আমাকে কিছুই করেনি। শুধু কাছাকাছি ছিল এবং মেয়েটা মুখের সামনে হাত নেড়ে একটা ঠিকানা জিজ্ঞেস করেছিল।”

তবে, শুধু তাহমিনা বেগমই নন। প্রতারকদের কথা মতো নিজের জিনিস তাদের হাতে তুলে দেওয়ার মতো এমন তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনেকেই হয়েছেন।

আর এসব ঘটনার পেছনে উঠে এসছে “স্কোপোলামিন” নামক এক ধরনের ড্রাগের নাম।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি তরল কিংবা পাউডার দুই ধরনেই পাওয়া যায়। এই ড্রাগ কাগজ, কাপড়, হাত এমনকি মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে লাগিয়ে এর ঘ্রাণ দিয়ে কিছু সময়ের জন্য যে কারো মানসিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেওয়া সম্ভব।

বাংলাদেশে স্কোপোলামিন ব্যবহারের প্রমাণ

২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে নারায়ণগঞ্জে একটি বেসরকারি বিশ্ববদ্যিালয়ের শিক্ষক খুন হন। সেই খুনের ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশ দুজনকে গ্রেপ্তার করে। তাদের কাছ থেকে প্রথমবারের মতো স্কোপোলামিন পাওয়ার কথা জানায় পুলিশ।

সে সময় তাদের কাছ থেকে বোতলের ভেতর সাদা পাউডার আকারে কয়েক গ্রাম স্কোপোলামিনসহ আরও কয়েক ধরনের মাদক জব্দ করা হয়। সিআইডি’র ল্যাবে টেস্ট করার পর সেখানে স্কোপোলামিন শনাক্ত হয়।

এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার গোলাম মোস্তফা রাসেল বিবিসি বাংলাকে জানান, শুরুতে এই স্কোপোলামিন সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল না তাদের।

তিনি বলেন, “রাসায়নিক পরীক্ষার যে রিপোর্টটা আমরা পেয়েছি সেই রিপোর্টে কিন্তু স্কোপোলামিন, পটাশিয়াম সায়ানাইড ও ক্লোরোফর্ম শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে স্কোপোলামিন ছিল আমাদের কাছে একেবারেই নতুন। এই নাম, এর ব্যবহার, কোন কোন ক্ষেত্রে এটা কাজে লাগানো হতে পারে সেটা আমরা জানতাম না। পরে এটা নিয়ে স্টাডি করে আমরা জানতে পারি যে, এটাকে আসলে 'ডেভিলস ব্রেথ' বা 'শয়তানের নিঃশ্বাস' বলে অনেকে।”

তিনি জানান, তারা এখন পর্যন্ত তদন্তে জানতে পেরেছেন এই ড্রাগ কুরিয়ারের মাধ্যমে এবং বিভিন্নভাবে চোরাকারবারিরা দেশে আনছে।

ধুতরার ফুল থেকে স্কোপোলামিন

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে বলা হয়, স্কোপোলামিন মূলত একটি সিনথেটিক ড্রাগ। চিকিৎসা বিজ্ঞানে ওষুধ তৈরিতে এর ব্যবহার রয়েছে। বমি বমি ভাব, মোশন সিকনেস এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে অপারেশন পরবর্তী রোগীর জন্য ওষুধে এর ব্যবহার রয়েছে।

তবে এটা প্রাকৃতিক কোনো উপাদান নয়। প্রাকৃতিক উপাদানের সঙ্গে আরও উপাদানা কিছু যোগ করে কৃত্রিমভাবে স্কোপোলামিন তৈরি করা হয়। এটা তরল এবং পাউডার দুই রূপেই পাওয়া যায়। তবে এর গুরুত্বপূর্ণ বা মূল উপাদান আসে ধুতরা ফল থেকে।

এ বিষয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের প্রধান রাসায়নিক পরীক্ষক ড. দুলাল কৃষ্ণ সাহা বিবিসি বাংলাকে বলেন, “আমাদের দেশে একসময় মানুষকে পাগল করে দেওয়ার জন্য দুধের মধ্যে ধুতরা বেটে খাইয়ে দেয়া হত। ধুতরা ফুল কিন্তু একটা বিষ। ঐ ধুতরা থেকে উপাদান নিয়ে সিনথেটিক্যালি এটা বানানো হয়েছে। মেক্সিকোর যে মাদকচক্র আছে, তারা এই মাদকটা বানিয়ে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিচ্ছে।”

স্কোপোলামিনের ব্যবহার

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোতে লিকুইড হিসেবে ইনজেকশনের মাধ্যমে স্কোপোলামিন ব্যবহারের তথ্য পাওয়া যায়।

ওষুধ হিসেবে স্কোপোলামিনের ব্যবহার এখনও আছে উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সায়েদুর রহমান বিবিসি বাংলাকে বলেন, “এটা এবং এর মতো আরও বেশকিছু ওষুধ চিকিৎসা বিজ্ঞানে ব্যবহার করা হয়। স্কোপোলামিন প্রথম দিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় গোয়েন্দা জ্ঞিাসাবাদের ক্ষেত্রে ‘ট্রুথ সেরাম’ হিসেবে ব্যবহার করা হত। অর্থাৎ এটা যদি ইনজেক্ট করে দেওয়া হয় তাহলে সে সত্য কথা বলতে শুরু করে। কারণ তার মগজের উপর নিজস্ব যে নিয়ন্ত্রণ সেটা চলে যায়। সে তখন অন্যের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, অন্যের কথা শুনতে থাকে।”

এই চিকিৎসক আরও বলেন, “যখন আপনি কথা বলানোর জন্য ব্যবহার করছেন তখন এটা ট্রুথ সেরাম। যখন আপনি পাউডার ফর্মে নিঃশ্বাসের জন্য ব্যবহার করছেন তখন এটা ‘ডেভিলস ব্রেথ’। আর যখন এটা বমি অথবা মোশন সিকনেসের ক্ষেত্রে ব্যবহার করছেন তখন এটা আসলে মেডিসিন হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে।”

প্রতারণা কাজে স্কোপোলামিন মূলত পাউডার হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। ভিজিটিং কার্ড, কাগজ, কাপড়, হাত কিংবা মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে এটি লাগিয়ে কৌশলে টার্গেট করা ব্যক্তির নিঃশ্বাসের কাছাকাছি আনা হয়।

এ বিষয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের প্রধান রাসায়নিক পরীক্ষক ড. দুলাল কৃষ্ণ সাহা বলেন, “স্কোপোলামিন মানুষের নাকের চার থেকে ছয় ইঞ্চি কাছাকাছি আসলেই নিঃশ্বাসের আওতায় আসে। এটা নিঃশ্বাসের সঙ্গে ঢুকলেই মাত্র ১০ মিনিট বা তারও আগে প্রভাব ফেলতে শুরু করে। মেমোরি আর ব্রেন তখন সচেতনভাবে কাজ করতে পারে না। কারো ক্ষেত্রে স্বাভাবিক হতে এক ঘণ্টা লাগে। আবার কেউ তিন/চার ঘণ্টার মধ্যেও স্বাভাবিক হতে পারে না।”

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যা বলছে

বাংলাদেশে স্কোপোলামিন ব্যবহার করে প্রতারণার অভিযোগ প্রথম দিকে ঢাকায় পাওয়া গেলেও এখন ঢাকার বাইরের জেলাগুলোতেও এমন ঘটনার খবর পাওয়া যাচ্ছে।

তবে এমন ঘটনার নির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান পুলিশের কাছে নেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে কীভাবে মাদক কারবারীরা স্কোপোলামিন আনছে সেটিও বড় প্রশ্ন হিসেবে দেখা দিয়েছে।

বিবিসি বাংলা প্রতিবেদনে বলা হয়, নারায়ণগঞ্জের ওই ঘটনার পর গোয়েন্দারা তথ্য পান স্কোপোলামিন অনলাইনে বিক্রি হচ্ছে। সে সময় যে দু'জনকে গ্রেপ্তার করা হয় তারাও অনলাইনে বিক্রির সঙ্গে জড়িত বলে জানায় পুলিশ।

এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য বলছে, স্কোপোলামিন মূলত দেশের বাইরে থেকে আসছে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হচ্ছে কুরিয়ার সার্ভিস। তবে ওষুধের কাঁচামাল হিসেবেও আইনের ফাঁক গলিয়ে কেউ স্কোপোলামিন আনছে কি-না সেটাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে বিবিসি বাংলাকে জানান পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা।

এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি ইনামুল হক সাগর বলেন, “আমরা ইতোমধ্যেই কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছি। নারায়ণগঞ্জেও এর আগে গ্রেপ্তার হয়েছে। তাদের কাছে যে তথ্য পেয়েছি, সেগুলো আমরা বিশ্লেষণ করছি। তাদের সঙ্গে আরও কারা জড়িত সেগুলো বের করা এবং আইনের আওতায় আনার জন্য চেষ্টা চলছে।”

   

About

Popular Links

x