Tuesday, June 25, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

এমপি আনোয়ারুল হত্যাকাণ্ড: শিমুল ভুঁইয়া গ্রেপ্তারে দামোদরে আতঙ্ক

শিমুল ভূঁইয়ার স্ত্রী জেলা পরিষদের সদস্য, ভাই ইউপি চেয়ারম্যান

আপডেট : ২৫ মে ২০২৪, ০২:২২ পিএম

ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনার হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে খুলনার ফুলতলার শীর্ষ সন্ত্রাসী শিমুল ভূঁইয়াকে প্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এই শিমুল ভূঁইয়া নাম বদলে সৈয়দ আমানুল্লাহ নামে পাসপোর্ট তৈরি করে কলকাতায় গিয়েছিলেন। আমানুল্লাহ নামধারী এই শিমুল ভূঁইয়াই এমপি আনোয়ারুলের মূল খুনি বলে দাবি করছে বাংলাদেশ ও কলকাতার পুলিশ।

এই ঘটনায় মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে আনোয়ারুলের ঘনিষ্ঠ বন্ধু আক্তারুজ্জামান ওরফে শাহীনকে শনাক্ত করেছে পুলিশ। হত্যার জন্য আমানুল্লাহ নামধারী শিমুল ভূঁইয়ার সঙ্গে চুক্তি করেন শাহীন।

এ ঘটনায় শিমুল ভূঁইয়াসহ ঢাকায় গ্রেপ্তার তিনজনের আট দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। এদিকে, এ ঘটনায় জিহাদ হাওলাদার নামে এক ব্যক্তিকে কলকাতা থেকে গ্রেপ্তার করেছে পশ্চিমবঙ্গের সিআইডি।

পুলিশ বলছে, আনোয়ারুল আজীম আনারকে হত্যার পর তার দেহ টুকরা করেছিলেন “কসাই” জিহাদ। বারাসাতের আদালত জিহাদ হাওলাদারের ১২ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন।

কলকাতা পুলিশ সেখানকার গণমাধ্যমকে আরও বলেছে, জিহাদ অবৈধভাবে ভারতের মুম্বাইয়ে বাস করতেন। সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীমকে হত্যার মাসখানেক আগে জিহাদকে কলকাতায় এনে রাখেন খুলনার ফুলতলার কুখ্যাত সন্ত্রাসী শিমুল ভূঁইয়া।

এদিকে, এমপি আনোয়ারুল হত্যাকাণ্ডে চরমপন্থী নেতা শিমুল ভূইঁয়া গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে খুলনার ফুলতলা উপজেলার দামোদর ও জামিরা ইউনিয়নের গ্রামগুলোতে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। আতঙ্ক, উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠায় দিন পার করছেন স্থানীয়রা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আমানুল্লাহ নামধারী শিমুল ভূঁইয়ার পুরো নাম মাহমুদ হাসান শিমুল। নব্বইয়ের দশক থেকে শুরু করে ২০০৫-০৬ সাল পর্যন্ত তিনি মাহমুদ হাসান শিমুল নামেই পরিচিত ছিলেন। এরপর কারাগারে থাকা অবস্থায় নিজেকে শিমুল ভূঁইয়া নামে পরিচিত করে তোলেন। তিনি পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টির খুলনা অঞ্চলের সম্পাদক।

খুলনার ফুলতলা উপজেলার দামোদর ইউনিয়নের দামোদর গ্রামে শিমুল ভূঁইয়ার বাড়ি। তার ছোট ভাই শিপলু ভূঁইয়া দামোদর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান। শিমুল ভূঁইয়ার স্ত্রী সাবিনা ইয়াসমিন (মুক্তা) খুলনা জেলা পরিষদের সদস্য।

অভিযোগ রয়েছে, খুলনা অঞ্চলের বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিকে হত্যার মাষ্টার মাইন্ড শিমুল ভূঁইয়া। নিষিদ্ধ ঘোষিত পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টির কার্যক্রম না থাকলেও আঞ্চলিক নেতা শিমূল ভূঁইয়া গোপনে দলটির কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছেন। বছরের পর বছর ধরে সংগঠিত করে রেখেছেন এ সংগঠনের মতাদর্শীদের। টাকার লোভে অনেক ভাড়াটে খুনিরাও তার গ্রুপের কিলিং মিশনে কাজ করছেন বলে জানা গেছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, দামোদর গ্রামে পাশাপাশি নতুন তিনটি পাকা ডুপ্লেক্স বাড়ি। তিনটি বাড়িরই নির্মাণকাজ এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। প্রধান ফটক ও নকশায় আভিজাত্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ওই তিনটি বাড়ির মালিক শিমুল ভূঁইয়া, তার ছোট ভাই শরীফ মুহাম্মদ ভূঁইয়া (শিপলু) ও বড় ভাই হানিফ মুহাম্মদ ভূঁইয়া।

তবে, তিনটি বাড়িই তালাবদ্ধ। ওই তিন পরিবারের সদস্যরা কোথায় গেছেন, তা আশপাশের কেউ বলতে পারছেন না। তাদের ব্যাপারে কিছু বলতে ভয় এলাকাবাসীর মনে। স্থানীয় লোকজন ওই বাড়িগুলোর সামনের মসজিদে নিয়মিত নামাজ পড়লেও শিমুলে বাড়ি শনাক্ত করতে অনেকেই অনাগ্রহী । তবে শিমুল ভূঁইয়ার বাড়িতে তার স্ত্রী সাবিনা ও স্কুলপড়ুয়া মেয়ে থাকতেন, সেটি নিশ্চিত করেছেন স্থানীয়দের কয়েকজন।

জানা গেছে, বর্তমান সরকারের আমলেই আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যোগদানের মধ্য দিয়ে জনপ্রতিনিধি হিসেবে নতুন করে নিজেদের আত্মপ্রকাশ ঘটিয়েছেন শিমুল ভূঁইয়ার পরিবারের সদস্য ও স্বজনরা।

শিমুল ভূঁইয়া গ্রেপ্তারে পর থেকে পুরো এলাকা জুড়েই আতঙ্ক বিরাজ করছে। শিমুলের সঙ্গে ফুলতলার ট্রাকচালক ফয়সাল আলী সাহাজি ও যুগ্নিপাশার মোস্তাফিজের সম্পৃক্ততার খবরে আতঙ্ক আরও বেড়েছে।

শুক্রবার (২৪ মে) সন্ধ্যায় শিমুলের বাড়ির সামনে একটি ঝুপড়ি দোকানে ৩-৪ জনকে বসে থাকতে দেখা যায়। কথা বলার জন্য তাদের কাছে যেতেই ২-৩ জন উঠে চলে যান। শিমুলের বাড়ি কোনটা জিজ্ঞেস করলে, তিনি এখানে নতুন এসেছেন বলে চলে যান। একটু পরেই দ্রুতগতিতে দীর্ঘদেহী একজন সেখানে আসেন এবং কয়েকজন সাংবাদিককে বাড়ির ছবি তুলতে ও ভিডিও করতে দেখে চটে ওঠেন। তিনি সাংবাদিকদের উদ্দেশ করে বলেন, “আপনাদের কি আর কোনো কাজ নেই। সারাদিন একই জায়গায় বসে ভিডিও করেন। আর কি কি করতে চান আপনারা। এখান থেকে দ্রুত সরেন।”

পার্শ্ববর্তী জামিরা বাজারে গিয়েও আতঙ্কিত পরিবেশ লক্ষ্য করা যায়। জামিরা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আবুল কাসেম সরদারের ছেলে সেলিম সরদার বলেন, “ইমরান আলীকে ১৯৯১ সালে ডুমুরিয়ায় হত্যা করার পর গ্রেপ্তার হয়ে শিমুল ৭ বছর জেল খাটে। ১৯৯৭ সালে কারামুক্তির পর ১৯৯৮ সালের ১৮ আগস্ট চেয়ারম্যান কাসেম সরদারকে হত্যা করে শিমুল। এই মামলায় ২০০০ সালে যশোর থেকে গ্রেপ্তার হয় শিমুল। এরপর সে ২০১৩ সাল পর্যন্ত কারাগারেই ছিল। কারাগারে থাকা অবস্থায় ২০১০ সালের ১৬ আগস্ট তার ভাই বাদলকে হত্যা করা হয়। এরপর কারামুক্তির পর ২০১৭ সালের ২৫ মে চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন সরদার মিঠুকে  হত্যা করে শিমুল। বাদল ও মিঠু হত্যার বিচার এখনও হয়নি। এই পরিবারটি এখনও ফুলতলার আতঙ্ক হয়ে রয়েছে।”

স্থানীয় মুসল্লী আবু সাইদ বলেন, “এখানে এতটা নিরব ও ভুতুড়ে পরিবেশ আগে দেখা যায়নি। আশপাশের লোকজনও এ নিয়ে কথা বলতে আগ্রহী নয়। আমি নিজেও কথা বলছি আর মনে হচ্ছে কেউ শুনল বা দেখল কি-না।”

উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম ১২ মে চুয়াডাঙ্গার দর্শনা সীমান্ত দিয়ে ভারতের কলকাতা যান। আট দিন নিখোঁজ থাকার পর ২২ মে তার খুন হওয়ার বিষয়টি দুই দেশের পুলিশ নিশ্চিত করে। কলকাতার নিউ টাউনে আক্তারুজ্জামান শাহীনের ভাড়া করা ফ্ল্যাটে আনোয়ারুলকে খুন করা হয়।

About

Popular Links