গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের ওয়েবসাইটে থাকা তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বে সবচেয়ে বয়স্ক ব্যক্তির (জীবিত) স্বীকৃতি পেয়েছেন জাপানের তমিকো ইতোকা। গত ১৬ সেপ্টেম্বর তার বয়স ছিল ১১৬ বছর ১১৬ দিন।
এদিকে, জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী বাংলাদেশের নাগরিক রাম সিংয়ের গড় এর বয়স ১১৯ বছর।
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের দুর্গম সীমান্তবতী এলাকা মেকানী ছড়ার বাসিন্দা রাম সিং গড়। জাতীয় পরিচয়পত্রে রাম সিং গড়ের জন্মতারিখ ১৯০৫ সালের ৬ আগস্ট। তার বাবার নাম বুগুরাম গড় ও মায়ের নাম কুন্তী গড়।
শ্রীমঙ্গল শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে বাংলাদেশ-ত্রিপুরা সীমান্তে গ্রাম মেকানী ছড়া। পাহাড়ি ওই গ্রামে বাস করেন রাম সিং গড়। চা বাগানে তৈরি পাকা ঘরে সন্তান ও নাতি-নাতনিদের নিয়ে বসবাস করেন তিনি। বয়সের ভারে দূর্বল হলেও অন্যের সাহায্য ছাড়াই চলাফেরা করতে পারেন রাম সিং গড়। বাড়িতে টুকটাক কাজও করেন। চশমা ছাড়া পড়তেও পারেন।
জাতীয় পরিচয়পত্রে জন্ম ১৯০৫ সালে সালে হলেও রাম সিংয়ের দাবি, তার বয়স আরও বেশি। তার দাবি, ১৩০ বছরের মতো হতে পারে বয়স।
রাম সিং গড় জানান, প্রায় ২০০ বছর আগে তার দাদা শাম্মি গড়নানা হালকু গড়ের সঙ্গে তার বাবা বুগুরাম গড় ভারতের মধ্যপ্রদেশের জবলপুর থেকে চা শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে এখানে আসেন। এখানে আসার পর তার বাবা বিয়ে করেন। তার দাদা ও বাবার হাতে শ্রীমঙ্গলের পুটিয়াছড়া চা বাগান সৃষ্টি হয় বলে দাবি করেন রাম সিং গড়।
প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের কয়েক বছর পর বিয়ে করেন রাম সিং। প্রথম স্ত্রীর ঘরে এক মেয়ে সন্তান। প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পর দ্বিতীয় বিয়ে করেন তিনি। সেই স্ত্রীর ঘরে পাঁচ ছেলেও তিন মেয়ের মধ্যে বড় ছেলে ৮০ বছর বয়সে মারা যান।
রাম সিং গড় জানান, যখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ হয় তখন চা বাগানের চৌকিদার। ইংরেজ সাহেবদের কাছে এই যুদ্ধের কথা শুনেছেন। আকাশে প্লেনের উড়াউড়ি দেখেন। আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, দেশভাগ সব ঘটনা স্পষ্ট মনে আছে তার।
শ্রীমঙ্গলের প্রাচীন বিদ্যাপীঠ ভিক্টোরিয়া উচ্চবিদ্যালয়ে ৩য় শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করেছেন। তখন ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের এক পাশে পাকা ঘর, লোহার পিলার ছিল, আর এক পাশে ছিল ছনের ঘর। এই ছনের ঘরেই তিনি ক্লাস করতেন। তখন তিনি মৌলভীবাজার সড়কের কোনো এক আচার্যের বাড়িতে থেকে পড়তেন। এ সময় শ্রীমঙ্গলে পাকা সড়ক হয়নি।
তার ভাষ্যমতে, পাকা ঘর বলতে শ্রীমঙ্গল পুরোনো বাজারে একটি ত্রিপুরা রাজ্য ব্যাংক, রামরতন বানিয়ার বাসা ও জগন্নাথ জিউর আখড়ার পশ্চিমে ত্রিপুরা রাজার বাংলো ছিল। মাঝেমধ্যে ত্রিপুরার রাজা হাতির পিঠে চড়ে এই বাংলোয় এসে থাকতেন এবং এখান থেকে খাজনা আদায় করতেন।
স্থানীয়রা জানান, রাম সিং গড়ের বয়সী মানুষেরা বহু আগেই মারা গিয়েছেন। কয়েক প্রজন্ম পার করে তিনি এখনো বেঁচে আছেন। বর্তমানে তার সংসারে চতুর্থ প্রজন্ম রয়েছে।
এলাকাবাসীর দাবি, পৃথিবীর সবচেয়ে প্রবীণ পুরুষ তিনি। রেকর্ডের জন্য গিনেজ কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানানোর দাবিও জানান তারা।
মেকানীছড়া গ্রামের বৃদ্ধা সরস্বতী গড়ের বয়স এখন ৮০ বছর। তিনি জানান, বিয়ের পর তিনি যখন এই এলাকায় আসেন, তখন রাম সিং গড়ের মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। দুই বছর আগে ওনার মেয়ে মারা যান। মেয়ের বয়সও আশির বেশি হবে।
হরিণছড়া চা বাগানের বাসিন্দা ৮০ বছর বয়সী নিরেণ হাদিমা জানান, তিনি ১৯৬১ সালে হরিণছড়া চা বাগানের স্টাফ হিসেবে যোগ দেন। তখনই তিনি রাম সিং গড়কে দেখেছেন বৃদ্ধ অবস্থায়।
শ্রীমঙ্গলের উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) আবু তালেব বলেন, “ইতিমধ্যে রাম সিংয়ের বাড়ি পরিদর্শন করেছি। আমি সমাজসেবা অফিসারকে দিয়ে ওনার তথ্যগুলো যাচাই-বাছাই করাব। সবকিছু ঠিক থাকলে আমরা জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে গিনেজ কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করব।”
শ্রীমঙ্গল উপজেলা সমাজ সেবা কর্মকর্তা মো.সোয়েব চৌধুরী বলেন, “রাম সিং বিষয়ের গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে। ভোটার আইডি কার্ডে জন্মতারিখ রয়েছে, সেসব বিষয় তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করা হবে। গিনেজ বুকে আবেদন করতে গেলে অনেক তথ্য-উপাত্তের প্রয়োজন।”



