Thursday, June 04, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

ছাত্র সংসদ নির্বাচনের তারিখ নিয়ে মতবিরোধ

  • সর্বোচ্চ অগ্রগতি দেখিয়েছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
  • ডাকসু নির্বাচন নিয়ে সোচ্চার বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও ইসলামি ছাত্র শিবির
আপডেট : ১৬ জানুয়ারি ২০২৫, ০১:৪৭ পিএম

উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র সংসদ নির্বাচন শিক্ষার্থীদের মধ্যে গণতন্ত্র চর্চার বিকাশ ঘটিয়ে থাকে। তবে ১৯৯০ সালে এরশাদ সরকারের পতনের পর গণতান্ত্রিক সরকার দেশে ক্ষমতা গ্রহণ করলেও, এই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোর ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধ হয়ে যায়। সর্বশেষ ২০১৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও তা ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেনি। এদিকে, অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোও দীর্ঘ এই সময়ে নির্বাচন আয়োজনের কোনো উদ্যোগ নেয়নি।

তবে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবি আবারও জোরালো হয়ে উঠেছে। ইতোমধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করেছে যে, আগামী ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে সর্বোচ্চ অগ্রগতি দেখিয়েছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। কর্তৃপক্ষ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জাকসু) নির্বাচন আয়োজনের জন্য নির্বাচন কমিশন গঠন করেছে। কমিশন গত শনিবার খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশ করেছে। আগামী ১ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করবে বলে জানা গেছে।

এই পরিস্থিতিতে নির্বাচনের সময় নিয়ে ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির চায় দ্রুততম সময়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হোক। অন্যদিকে ছাত্রদলসহ কিছু ছাত্রসংগঠন বলছে দীর্ঘদিন ধরে ক্যাম্পাসে সক্রিয় না থাকায় তারা নির্বাচনের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। ছাত্র সংসদের গঠনতন্ত্রের কিছুটা সংস্কার করে তারা নির্বাচনের পক্ষে মত দিয়েছেন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক নাইমুল হাসান কৌশিক ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “আমরা দীর্ঘ ১৭ বছর ক্যাম্পাসের বাহিরে ছিলাম। ক্যাম্পাসে আমাদের স্বাভাবিক রাজনীতির জন্য কিছুটা সময় প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি। শিক্ষার্থীদের জানার জন্য বা আমাদের জানার জন্য শিক্ষার্থীরা যখন সময় পাবে কেবল তখনই একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব।”

ছাত্রদলের মতো একই মত দিয়েছে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টসহ বেশকিছু ছাত্র সংগঠন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)/সংগৃহীত

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ঋদ্ধা অনিন্দ্য গাঙ্গুলী ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “আমরা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন আয়োজনের ইচ্ছাকে স্বাগত জানাই। তবে এর আগে প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে হবে। তারপরই নির্বাচন আয়োজন করা উচিত।”

বিশ্ববিদ্যালয় শাখা সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের সমন্বায়ক সজীব আহমেদ বলেন, “জাকসু সংবিধানকে হালনাগাদ করার জন্য একটি কমিটি গঠন করা উচিত। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে একটি নিরপেক্ষ, হলভিত্তিক ছাত্রদের ডাটাবেজ তৈরি করতে হবে।”

তবে প্রশাসন ঘোষিত সময়ের মধ্যেই নির্বাচন চায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন জাবি শাখার আহ্বায়ক আরিফুজ্জামান উজ্জ্বল ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে দীর্ঘদিন পর আমরা জাকসু নির্বাচন পেতে যাচ্ছি। সে অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ইতোমধ্যে রোডম্যাপ ও খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশ করেছে। আমরা আশাকরি প্রশাসন রোডম্যাপ অনুযায়ী যথাসময়েই নির্বাচন সম্পন্ন করবে।”

ছাত্রদলসহ অন্যান্য ছাত্রসংগঠন জাকসুর যে সংস্কার প্রস্তাব করেছে সে বিষয়ে মতামত জানতে চাইলে তিনি বলেন, “জাকসুর গঠনতন্ত্র অনুযায়ী এর সংস্কারের এখতিয়ার শুধুমাত্র নির্বাচিত প্রতিনিধিদের। সেক্ষেত্রে নির্বাচন না হলে এর সংস্কার সম্ভব না।”

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে জাকসু নির্বাচনের প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক মনিরুজ্জামান ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “ইতোমধ্যে আমরা চারটা সভা করেছি। প্রশাসনের রোডম্যাপ অনুসারে আমরা খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশ করেছি। পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে কাজ করছি আমরা।”

নির্বাচনের প্রস্তুতির বিষয়ে তিনি বলেন, “বর্তমান নির্বাচন কমিশন প্রশাসন কর্তৃক প্রকাশিত রোডম্যাপ অনুসারে কাজ করছে। আমরা বাস্তবতা মাথায় রেখেই এগোচ্ছি। নির্বাচন কমিশনের তো সংস্কারে ভূমিকা নেই, জাকসুর বর্তমান সংবিধান মেনে নির্বাচনে হবে।”

জাকসু নির্বাচনের মতো ডাকসু নির্বাচন নিয়েও ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে মতবিরোধ দেখা গেছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও ইসলামি ছাত্র শিবিরকে ডাকসু নির্বাচন নিয়ে সোচ্চার হয়েছে। সংগঠন দুটির নেতারা বলছেন, শিক্ষা কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে ডাকসু নির্বাচন প্রয়োজন। জাতীয় নির্বাচনের আগেই তারা ডাকসুসহ অন্যান্য ছাত্র সংসদ নির্বাচন চায়।

ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “ক্যাম্পাসগুলোতে পরিবেশ প্রতিনিয়ত অবনতি হচ্ছে। এক ছাত্র সংগঠন আরেক ছাত্র সংগঠনের দিকে বিভিন্ন অভিযোগ করছে। এছাড়াও ক্যাম্পাসে ছাত্রদের প্রতিনিধি না থাকায় তাদের কথা কেউ বলছে না। তাই আমরা দ্রুত সময়ের মধ্যে ছাত্র সংসদ নির্বাচন চাই।”

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সদস্য সচিব আরিফ সোহেল বলেন, “আমরা অবশ্যই জাতীয় নির্বাচনের আগে ছাত্র সংসদ নির্বাচন চাই। সেই জন্য যদি সংস্কার প্রয়োজন হয় তাহলে তা দ্রুত সম্পন্ন করে নির্বাচন দিতে হবে। ছাত্র সংসদ নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে যে নেতৃত্ব গড়ে উঠবে তারা হবে আগামী দিনের গণতন্ত্রের রক্ষাকারী।"

ক্যাম্পাসের স্বাভাবিক কার্যক্রমের নিশ্চিত হওয়ার পর ডাকসুসহ অন্যান্য ছাত্র সংসদের নির্বাচন আয়োজনের মত দিয়েছেন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছির।

তিনি বলেন, “আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ছাত্রলীগ ক্যাম্পাসগুলোতে কাউকে রাজনীতি করতে দেয়নি। এখন ধীরে ধীরে ক্যাম্পাসগুলোতে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরে আসছে। ঠিক এই মুহূর্তে যদি ছাত্র সংসদ নির্বাচন আয়োজন করা হয় তাহলে ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে বিভাজন বৃদ্ধি পাবে। আমাদের মতামত হলো ছাত্র সংগঠনগুলোকে বুঝবার জন্য শিক্ষার্থীদের কিছুটা সময় দিতে হবে। তারপরই কেবল নির্বাচন আয়োজন করলে শিক্ষার্থীরা তাদের যোগ্য প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারবে।”

ডাকসু নির্বাচনের বিষয়ে জানতে চাইলে উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমেদ খান বলেন, “সবার সঙ্গে কথা বলে নির্বাচনের একটি রোডম্যাপ করতে চাই। ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে একটা অনিশ্চয়তা সৃষ্টি রয়েছে, বৈধ নেতৃত্ব সৃষ্টি হলে তা কেটে যাবে। আমরা একটা কমিটি করেছি। তাদের সুপারিশ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেব।”

এদিকে ১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত ১৪টি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু)। বিশ্ববিদ্যালয়টির ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবিও জোরালো হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক সালেহ্ হাসান নকীব ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “রাকসু নির্বাচন নিয়ে আমরা কাজ করছি। আশা করছি, রাকসুর রোডম্যাপ খুব দ্রুতই ঘোষণা করা হবে।”

রাকসু নির্বাচন প্রসঙ্গে জানতে চাওয়া হলে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক সুলতান আহমেদ রাহী বলেন, “আমরা রাকসু নির্বাচন চাই। তবে আমরা কিছুটা সময় চাই। কারণ দীর্ঘদিন ছাত্রলীগের নির্যাতনের কারণে আমরা ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে পারিনি।”

ডাকসু, জাকসু ও রাকসুর মতো ১৯৯০ সালের পর আর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদেও (চাকসু)। ১৯৬৬ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত মাত্র ছয়টি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। চাকসুর সর্বপ্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার পূর্বে ১৯৭০ সালে। এরপর ১৯৭২, ১৯৭৩, ১৯৮০, ১৯৮১ ও ১৯৯০ সালে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তবে সম্প্রতি আবারও চাকসু নির্বাচনের আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে খুব দ্রুত চাকসু নির্বাচন আয়োজনের জন্য কাজ শুরু করা হবে।

ডাকসুর সর্বশেষ নির্বাচিত ভিপি ও গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “রাজনীতিতে নতুন নেতৃত্ব তৈরিতে ছাত্র সংসদের বিকল্প নেই। ডাকসু না হলে আমার রাজনীতিতে আসা হতো না। ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ধারাবাহিকতা থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রগতিশীল শিক্ষার্থীদের গ্রুপ তৈরি হতো। এখন সুযোগ হয়েছে, অবশ্যই এ সুযোগ হাতছাড়া করা যাবে না।”

   

About

Popular Links

x