Friday, June 05, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

শরিয়া আইন বাস্তবায়নে ভোটের আগে একাট্টা হতে চায় ধর্মভিত্তিক দলগুলো

গণঅভ্যুত্থানের পর বেড়েছে ইসলামপন্থি দলগুলোর শক্তি

আপডেট : ০৪ মে ২০২৫, ০৯:৪১ এএম

আওয়ামী লীগ শাসনামলে বছরের পর বছর কঠোর দমন-পীড়নের মধ্য দিয়ে পার করতে হয়েছে বলে অভিযোগ বাংলাদেশের ইসলাম ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার পতনের পর এই দলগুলোই এবার কট্টরপন্থি সমমনাদের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধভাবে রাজনৈতিক মঞ্চে সক্রিয় হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। দেশে ইসলামি শরিয়া কায়েম করা, ইসলাম অবমাননাকারীদের মৃত্যুদণ্ডের আইন করাসহ বিভিন্ন উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য আগামী নির্বাচনকেই পাখির চোখ করেছে তারা।

সম্প্রতি ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মুহাম্মদ মামুনুল হক বলেন, “আমরা আত্মবিশ্বাসী যে, পরবর্তী নির্বাচনে আমরা সংসদে প্রবেশ করতে পারব।”

বাংলাদেশে মাদ্রাসাভিত্তিক প্রভাবশালী ইসলামি সংগঠন গত শনিবার (৩ মে) ঢাকায় একটি মহাসমাবেশ করছে। এই সমাবেশকে দলটির সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় শক্তি প্রদর্শন হিসেবে দেখা হচ্ছে। এদিন দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে হাজার হাজার হেফাজত সমর্থক ঢাকায় জড়ো হন। এরমধ্য দিয়ে ধর্মীয় সংগঠনের সক্রিয়তার উত্থানের প্রতিফলন ঘটছে।

২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার একচ্ছত্র শাসনের পতন হয়। এরপর থেকেই ইসলামপন্থি দলগুলো শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

মামুনুল হক এএফপিকে বলেন, “হেফাজতের অধীনে থাকা হাজার হাজার মাদ্রাসা এবং তাদের পাঁচ লক্ষাধিক সদস্য রয়েছে। যদি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হয়, তবে ভোটে তারা ভালো ফল করবে।”

বাংলাদেশের রাজনীতিতে মুসলিম বিভিন্ন দল ও সংগঠনের একটি জোট হেফাজতে ইসলাম। এই জোটে মামুনুলের নেতৃত্বাধীন দল খেলাফত-এ-মজলিশও রয়েছে।

দেশে অত্যন্ত প্রভাবশালী রাজনৈতিক এই জোট ১৫ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর থেকে দলটি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রশ্রয় পেয়েছে।

বাংলাদেশে এখনও আসন্ন নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়নি। তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান, নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনুস জানিয়েছেন, ২০২৬ সালের জুনের মধ্যেই জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

গণঅভ্যুত্থানের পর বেড়েছে শক্তি

২০২৪ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশে সবশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেবার প্রকৃত বিরোধী দল ছাড়াই চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জয়লাভ করেছিলেন শেখ হাসিনা।

ব্যাপক দমন-পীড়নের মুখে বিরোধী দলগুলো সেই ভোট বয়কট করে।

ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ী শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে ইসলামিপন্থি সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন। সেই সময় হাজার হাজার মানুষকে আটক করা হয়েছিল, যার মধ্যে মামুনুলও ছিলেন, যিনি ২০২১ সালে গ্রেপ্তার হয়ে তিন বছর জেলে ছিলেন।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের বিরোধিতায় ইসলামপন্থিরা বিক্ষোভ করলে মামুনুলসহ অনেকেই মামলার মুখোমুখি হন।

২০২৪ সালের আগস্টে বিক্ষুব্ধ জনতা শেখ হাসিনার সরকারি বাসভবনে হামলা চালালে তিনি ভারত পালিয়ে যান এবং এখনও সেখানে স্বেচ্ছা নির্বাসনে রয়েছেন।

বর্তমানে ইসলামপন্থিরা ফের সংগঠিত হয়ে রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে শুরু করেছে। তবে তাদের উত্থানে দেশের সুফি মুসলমান, হিন্দু সংখ্যালঘু ও নারী সমাজের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

হাসিনার চলে যাওয়ার পর ইসলামপন্থি দলগুলো ফের শক্তি অর্জন করছে। অনেক ক্ষেত্রেই তারা অন্যান্য জনগোষ্ঠীর ওপর তাদের দৃষ্টিভঙ্গি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।

ইসলামপন্থি দলগুলোর উত্থান সুফিবাদি মুসলিম, হিন্দু সংখ্যালঘুসহ বিভিন্ন গোষ্ঠীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশেষ করে নারীরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

বিভিন্ন স্থানে ইসলামপন্থিরা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড যেমন গান, নাটক, নারী ফুটবল, ঘুড়ি উৎসব ইত্যাদিকে “ইসলামবিরোধী” আখ্যা দিয়ে নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়েছে।

তারা বিভিন্ন সুফি দরগায় হামলা চালিয়েছে ও সম্প্রতি খিলাফত মজলিসের সমর্থকেরা একটি পাবলিক লাইব্রেরিতে ঢুকে শত শত বই নিয়ে যায়, যার মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের বইও ছিল।

এ বিষয়ে খিলাফত মজলিসের যুবনেতা গোলাম রাব্বানী বলেন, “আমরা সেইসব বই সরিয়েছিলাম যেগুলো নাস্তিকতা ছড়ায়।”

শরিয়া বাস্তবায়ন করুন

হেফাজতের শনিবারের মহাসমাবেশের আগে রাজধানীতে কয়েকটি বড় দলের পক্ষ থেকেও মিছিল হয়েছে, যারা ইসলামী ভোটব্যাংকের সমর্থন চায়।

এই দলগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-যেটি গঠিত হয়েছে হাসিনাবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে, দেশের বৃহত্তম ইসলামি ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামি।

মামুনুল হক জানিয়েছেন, সরকারের নারী কমিশনের আনা নারী ও পুরুষের সমান উত্তরাধিকার অধিকারের প্রস্তাবের বিরোধিতা করছেন তারা।

তিনি এএফপিকে বলেন, এ কমিশন ইসলামী পারিবারিক ঐতিহ্যের প্রতি অসম্মান দেখাচ্ছে।”

মামুনুল হক বলেন, “মনে হচ্ছে তারা বিবাহ বিবাহ ও তালাকের ধর্মীয় মূল্যবোধ ভেঙে দিয়ে এখানে একটি পাশ্চাত্য ধাঁচের সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে চায়।”

মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশের সংবিধানে মূলনীতি চারটি। এগুলো হলো- জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার ওপর প্রতিষ্ঠিত।

তবে মামুনুল হক জানান, তার সমর্থকরা ইসলামি শরিয়া আইন চান।

তিনি বলেন, “সবকিছু কোরআনের আলোকে পরিচালিত হবে... একটি ইসলামিক কল্যাণ রাষ্ট্রে যারাই হোক- ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে ন্যায়সঙ্গতভাবে দেখা হবে।”

তবে মামুনুল হকের স্পষ্ট বার্তা, এর মধ্যে ইসলামের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার জন্য মৃত্যুদণ্ড অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

মামুনুল বলেন, “আল্লাহর বিরুদ্ধে কথা বললে, নবির সম্মান ক্ষুণ্ণ করলে এবং মুসলমানদের অপমান করলে আমরা মৃত্যুদণ্ডের দাবি করি।”

তিনি বলেন, “এই বিষয় নিয়ে আর আলোচনার কোনো সুযোগ নেই।”

   

About

Popular Links

x