ফেস্টুন অপসারণকে কেন্দ্র করে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ফয়সাল আহমেদকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় এক বিএনপি নেতারি বিরুদ্ধে। এনিয়ে মোবাইল ফোনে দুজনের মধ্যে কথার একপর্যায়ে ইউএনওকে আগের স্থানেই ফেস্টুন লাগাতে বলেন ওই বিএনপি নেতা। এসময় তিনি বলেন, “কালকে পোস্টার ভদ্রলোকের মতো লাগাবেন। ফাইজলামি! এহ, বিশাল ব্যাপার। উনি টিএনও হয়ে গোদাগাড়ীতে আসছেন।”
জানা গেছে, বিএনপির ওই নেতার নাম ইঞ্জিনিয়ার কে এম জুয়েল। তিনি রাজশাহী মহানগর বিএনপির সাবেক বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক। তার বাড়ি গোদাগাড়ী উপজেলার রিশিকুলে।
মঙ্গলবার (২৯ জুলাই) উপজেলা সদরের সড়ক বিভাজকে থাকা বিভিন্ন দলের ফেস্টুন অপসারণ করেন ইউএনও ফয়সাল আহমেদ। বিষয়টি জানতে পেরে ইউএনওকে ফোন করে তিরস্কার করেন জুয়েল।
ইউএনও ও বিএনপি নেতার কথপোকথনের একটি ফোনকল রেকর্ড পাওয়া গেছে। এতে শোনা গেছে, কে এম জুয়েল বলছেন, “আজকে একটা ঘটনা ঘটেছে, আমি শুনেছি। আমি সম্ভাব্য ক্যান্ডিটেট। আমি ইঞ্জিনিয়ার কে এম জুয়েল বলছি। আপনার গোদাগাড়ী থানার প্রোপারে যে পোস্টার সরিয়েছেন, এই বিষয়ে কিছুক্ষণ আগে আমাকে ইনফর্ম করা হলো। সেখানে আমার পোস্টার ছিল। জামায়াত-বিএনপির পোস্টার ছিল। আপনি যে হটাইছেন, এর কারণ কি? কোন পরিপত্র আছে? না ইচ্ছে করে?”
ইউএনও তখন বলেন, “জনগণ অভিযোগ দিয়েছে।”
জুয়েল বলেন, “জনগণ তো অনেক অভিযোগ দিয়েছে আপনাকে। সমগ্র গোদাগাড়ী থানাতে ভর্তি হয়ে আছে পোস্টার। তোলেন, সব তোলেন।”
এ সময় ইউএনও কিছু একটা বলতে চাইলে তাকে থামিয়ে দিয়ে জুয়েল বলেন, “শোনেন, আমি যেটা বলছি লিগ্যাল রাইট নিয়ে বলছি, সেটার সঠিক অ্যানসার করবেন। আপনি কেন ওই জায়গার পোস্টার তুলেছেন, আর অন্য জায়গার তুলছেন না কেন? আমি ঢাকাতে আছি, আমি আসতেছি।”
ইউএনও বলেন, “আচ্ছা ঠিক আছে।”
জুয়েল বলেন, “না, আপনি যেখান থেকে পোস্টার তুলেছেন, সেখানে আপনি সাবমিট করবেন পোস্টার।”
ইউএনও বলেন, “ঠিক আছে।”
এ সময় আরও ক্ষুব্ধ হয়ে বিএনপি নেতা জুয়েল বলেন, “কালকে যেন আমরা ওখানে দেখতে পাই, পোস্টার যেখানে ছিল। ঠিক আছে মানে কি? অবশ্যই করবেন। না হলে যেটা করা দরকার সেটাই করব। আপনার এগেইনেস্টে যেই রকম স্টেপ নেওয়া দরকার, সেটাই আমি করব। বিশেষ করে আমরা করব। আমার নেতার ছবি তুলেছেন আপনি ওখান থেকে। জাস্ট রিমেম্বার ইট।”
জুয়েল বলতে থাকেন, “নরসিংদী বাড়ি দেখান আপনি, না? কোন দল থেকে আসছেন আপনি? কোন দল থেকে এসেছেন? কার এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতেছেন আপনি? কালকে পোস্টার ভদ্রলোকের মতো লাগাবেন। ফাইজলামি! এহ, বিশাল ব্যাপার। উনি টিএনও হয়ে গোদাগাড়ীতে আসছেন।”
এ বিষয়ে ইউএনও ফয়সাল আহমেদ বলেন, “রাজশাহী-চাঁপাইনবাগঞ্জ মহাসড়কে ডাইংপাড়া মোড়ে ব্যক্তিগত, কোচিং, ভর্তি বিজ্ঞাপন ছাড়াও বিভিন্ন রাজনীতিক দলের ব্যানার ফেস্টুন লাগানো ছিল। এজন্য যানবাহন চলাচলে সমস্যা হচ্ছিল। পাশাপাশি পৌরসভার সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছিল। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় জনগণ অভিযোগ করে। সে প্রেক্ষিতে পৌরসভা থেকে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল সরানোর জন্য। দুই-তিনবার মৌখিক ও লিখিতভাবে জানানো হয়েছিল। না সরানোর কারণে ব্যানার-ফেস্টুন সরিয়ে পৌরসভায় রাখা হয়েছে।”
তিনি আরও জানান, বিষয়টি নিয়ে উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভাতেও আলোচনা হয়েছিল। সেখান থেকে সব পোস্টারই পৌরসভার পক্ষ থেকে সরানো হয়েছে। আমি তাকে চিনি না, বিএনপি নেতার পরিচয় দিয়ে ফোনে অনেক কথা বলেছেন। বিষয়টি আমি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। তবে শাসানোর বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
বিষয়টি নিয়ে বিএনপি নেতা কে এম জুয়েল বলেন, “ইউএনওর কাছে জনগণ অভিযোগ করেছে, আর আমরা কি মানুষ না? আমার ছবি তুলে ফেলুক আপত্তি ছিল না। কিন্তু আমার নেতার ছবি তুলে ফেলেছে। তার কাছে কি নির্বাচন কমিশন থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে পোস্টার তুলে ফেলতে? যদি দেওয়া হয়ে থাকে তাহলে আমি নিজেই সরিয়ে ফেলতাম। কিন্তু বিষয়টি তা নয়।”
তিনি বলেন, “ইউএনও কোনো চিঠিও দেননি। আমার সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ না থাকলে এলাকায় বিএনপির সভাপতি-সম্পাদক রয়েছেন। তাদেরকে জানাতে পারতেন। কিন্তু না জানিয়ে তিনি নিজে নিজে সরিয়েছেন।”
নাম প্রকাশ না করার শর্তে উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির একজন সদস্য জানান, দুইমাস আগে উপজেলা সদরের এসব ব্যানার-ফেস্টুন ও পোস্টারের বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় উত্থাপন করেন এক ব্যক্তি। এর একমাস পরেও সেগুলো অপসারণ না হওয়ায় পরবর্তী মাসের সভাতেও বিষয়টি আলোচনায় ওঠে। ওই সভায় ট্রাফিক পুলিশ আপত্তি করেছিল যে, ফেস্টুনের কারণে রাস্তার একপাশ থেকে অন্যপাশ দেখা যায় না। এতে দুর্ঘটনা ঘটছে।



