দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর পরিচালিত এক গবেষণা জরিপে উঠে এসেছে, ৯৮.৬৭% মানুষ দৈনন্দিন খরচের হিসাব লিখে রাখেন না। ৯৩.৩৩% মানুষ কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই খরচ করেন। ৮৪.৬৭% নাগরিক নিয়মিত কোনো সঞ্চয়ই করেন না।
দেশের দরিদ্র ও অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীর ব্যক্তি ও পরিবার পর্যায়ে বরাদ্দ, সময় ব্যবস্থাপনা ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা, তথ্য ব্যবস্থাপনার ধরন এবং এতে কী ধরনের ন্যূনতম পরিবর্তন আনা হলে আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন হবে-সে বিষয়ে গবেষণাটি উপস্থাপন করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক ইসতিয়াক রায়হান।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইন্সটিটিউট ফর এনভায়রনমেন্ট এন্ড ডেভেলপমেন্টের (আইইডি) সহায়তায় গবেষণাটি ২০২২ সালের ১৫ মার্চ থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত পরিচালিত হয়। এতে ঢাকা, ময়মনসিংহ ও যশোর এলাকার ১৫০ জন দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মানুষ অংশগ্রহণ করেন।
রবিবার (২৬ জুন) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) নসরুল হামিদ মিলনায়তনে “স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও আমাদের মনোগঠন: ব্যক্তি ও পরিবার” শীর্ষক পরামর্শ সভায় এ গবেষণাটি উপস্থাপন করা হয়।
গবেষণায় উঠে এসেছে, প্রতিদিনের সময় কীভাবে ব্যবহার করেন তা অংশগ্রহণকারীদের কেউই লিখে রাখেন না। ৯৯% জনগোষ্ঠী প্রতিদিনের কাজে কোনো রুটিন মেনে চলেন না। ব্যক্তিগত কাজের সময়ের ব্যবহার নিয়ে ৯০%-ই সন্তষ্ট না। মাত্র ১০% সন্তষ্টি প্রকাশ করেছেন।
জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ৬০% তার জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্ম নিবন্ধন, পাসপোর্ট কিংবা অন্যান্য সনদে নিজের ব্যক্তিগত তথ্য মিলিয়েই দেখেননি। ২৮% বলেছেন, তাদের তথ্য ঠিক আছে। ১২% জানিয়েছেন, তাদের ব্যক্তিগত তথ্যে ভুল আছে।
সঞ্চয়ে এই ‘অনাগ্রহ' কেন
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ফারহা তানজীম তিতিল ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন,‘‘আমাদের দেশে জীবনযাত্রার ব্যয় খুব বেশি, ফলে অর্থ বাঁচানোর সুযোগ কম। আগে ছোট পরিসরে সবজিক্ষেত বা গবাদিপশু পালন করে দরিদ্র শ্রেণির মানুষ নির্দিষ্ট কিছু প্রয়োজন মেটাতে পারত। এখন সেই সুযোগ কমে আসায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর খরচ বেড়ে সঞ্চয়ের সুযোগ আরও কমে গেছে।”
‘‘এছাড়া, সবার মধ্যে এক ধরনের পণ্যবাদিতা ঢুকে গেছে। মূলত এসব কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় মানুষ সঞ্চয় করতে পারছে না।”
তিনি বলেন, ‘‘বেশি করে দ্রব্য কিনলে দামে একটু কম পড়ে। কিন্তু দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আয় অনিয়মিত হওয়ায় তারা স্বল্প পরিমাণে পণ্য কিনতে বাধ্য হন, এতে দামও বেশি পড়ে।”
এসব কারণে সঞ্চয়ের সুযোগ কমে যায়।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ড. সৌমিত জয়দ্বীপ মনে করেন, “বেশ কয়েক বছর ধরে মানুষের আয় এবং ব্যয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। ব্যয় এত বেড়েছে পক্ষান্তরে আয় অতটা বাড়েনি। ফলে মানুষ হিমশিম খাচ্ছে। নানা সময় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বাজারের অস্থির অবস্থার কারণে নিম্নবিত্ত মানুষ সঞ্চয়ের সাহস পাচ্ছে না। এছাড়া, নানা ধরনের অব্যবস্থাপনা মানুষকে সঞ্চয়ের প্রবণতা থেকে সরিয়ে আনছে।”
সঞ্চয়ের প্রয়োজনীয়তা
সঞ্চয়ের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে অর্থনীতির শিক্ষক ফারহা তানজীম তিতিল বলেন, ‘‘যেকোনো ব্যক্তি বা দেশকে নিজের অবস্থান থেকে এগিয়ে যেতে চাইলে সঞ্চয়ের গুরুত্ব অপরিসীম। সঞ্চয়ে মূলধন বাড়ে। আর মূলধন বেশি থাকলে আরও বেশি সচ্ছল হওয়ার সুযোগ আসে এবং ধনী হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।”
আর ড. সৌমিত জয়দ্বীপের মতে, “মানুষ যখন খুব সমস্যায় পড়ে তখন এই সঞ্চয়ই তাকে রক্ষা করে। ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সঞ্চয়ের বিকল্প নেই।”
রবিবার ডিআরইউতে পরামর্শ সভায় বক্তারা /সৌজন্য ছবি
পরামর্শ সভায় আইইডির নির্বাহী পরিচালক নুমান আহম্মদ খানের সভাপতিত্বে আলোচনায় অংশ নেন, ডাকসুর সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও জনউদ্যোগ আহ্বায়ক ডা. মোশতাক হোসেন, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও স্যার উইলিয়াম ফাউন্ডেশনের কান্ট্রি ডিরেক্টর মেজর জেনারেল (অব) জীবন কানাই দাস, এজিং সাপোর্ট ফোরামের সভাপতি হাসান আলী, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের ওয়াসিউর রহমান তন্ময়, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রাজু আহমেদ, এনজিওদের সংগঠন এড্যাবের পরিচালক কেএম জসিমউদ্দিন, ইউএনডিপির প্রোগ্রাম অফিসার রেবেকা সুলতানা, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব নুর কামরুন্নাহার, অ্যাকশন এইডের উপ ব্যবস্থাপক অমিত রঞ্জন দেসহ আরো অনেকে।
সভাটি পরিচালনা করেন আইইডির সমন্বয়ক তারিক হোসেন মিঠুল।
পরামর্শ সভায় একটি গাইডলাইন তুলে ধরেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ইসতিয়াক রায়হান। এতে ব্যক্তি ও পরিবার পর্যায়ে আয় ব্যয়ের হিসেব সংরক্ষণ, সময় ব্যবস্থাপনা, ব্যক্তিগত তথ্য সকল জায়গায় সঠিকভাবে সংরক্ষণ, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্পদের যথাযথ সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। বক্তারা ব্যক্তি ও পারিবারিক পর্যায়ে সঞ্চয় বাড়াতে জোর দেওয়ার আহ্বান জানান। এতে সময়ের হিসেব রাখতে একটি ক্যালেন্ডারও উপস্থাপন করেন গবেষক ইসতিয়াক রায়হান।



