Wednesday, May 29, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি নেতিবাচক, এ খাতে ঋণ কমেছে সরকারের

পিআরআই নির্বাহী পরিচালক বলেন, দেশের মূল্যস্ফীতি যে পরিমাণে বাড়ছে এর জন্য মধ্যবিত্তদের খরচ বেড়ে গেছে এবং সঞ্চয়ের পরিমাণও কমিয়ে দিয়েছে

আপডেট : ০২ নভেম্বর ২০২২, ০৩:৪৭ পিএম

সঞ্চয়পত্র থেকে বিনিয়োগকারীদের মুখ ফিরিয়ে নেওয়া, দেশের মূল্যস্ফীতির ব্যাপক বৃদ্ধি এবং বার্ষিক উন্নয়ন ব্যয় কম থাকায় সরকারের বাজেট ঘাটতি মেটাতে সঞ্চয়পত্র ও ব্যাংকিংখাত থেকে ঋণের পরিমাণ কমেছে।

অন্যদিকে সরকার এখন সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেওয়ার চেয়ে সুদ ও আসল বেশি পরিশোধ করছে। ফলে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রির হার নেতিবাচক।  

এ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে ২১,৫১১ কোটি টাকার। এর মধ্যে আগের মূল টাকা ও মুনাফা পরিশোধ করা হয়েছে ২১,১৮০ কোটি টাকা। মূল টাকা ও মুনাফা পরিশোধের পর তিন মাসে সরকারের নিট ঋণ দাঁড়িয়েছে ৩৩০ কোটি টাকা। 

২০২১-২২ অর্থবছরে একই সময়ে সরকার সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নিয়েছে ২৬,৬০৫ কোটি টাকা। সেই সময়ে আগের ঋণ বাবদ পরিশোধ করেছে ১৮,০৪৭ কোটি টাকা। গত অর্থবছরে একই সময় নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রির পরিমাণ ছিল ৮,৫৫৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে এ বছর ২৫% কম ঋণ নেওয়া হয়েছে।

জাতীয় সঞ্চয় স্কিমগুলোতে বিনিয়োগকৃত অর্থের ওপর নির্দিষ্ট সময় পরপর মুনাফা দেয় সরকার। মেয়াদপূর্তির পরে বিনিয়োগকৃত অর্থও ফেরত দেওয়া হয়। প্রতি মাসে বিক্রি হওয়া সঞ্চয় স্কিমগুলোর প্রাপ্ত বিনিয়োগ থেকে আগে বিক্রি হওয়া স্কিমগুলোর মূল ও মুনাফা বাদ দিয়ে নিট ঋণ হিসাব করা হয়। 

ওই অর্থ সরকারের কোষাগারে জমা থাকে এবং সরকার তা প্রয়োজন অনুযায়ী বাজেটে নির্ধারিত বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রকল্প বাস্তবায়নে কাজে লাগায়। এ কারণে অর্থনীতির পরিভাষায় সঞ্চয়পত্রের নিট বিনিয়োগকে সরকারের “ঋণ” বা “ধার” হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

মুদ্রাস্ফীতিই কি বড় আঘাত?

অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকারদের মতে, ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ব্যয় বেড়েছে এবং সঞ্চয়পত্র, ব্যাংক আমানতসহ সঞ্চয়ের সামগ্রিক প্রবণতা কমেছে।

সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে ধস এবং এর প্রভাব সম্পর্কে জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “এটি একটি ভালো লক্ষণ যে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের নিট ঋণ কমছে। সরকার যদি কম সুদে ব্যাংক থেকে ঋণ নেয় তাহলে এটি ভালো হবে।”

তিনি আরও বলেন, “দেশের মূল্যস্ফীতি যে পরিমাণে বাড়ছে এর জন্য মধ্যবিত্তদের খরচ বেড়ে গেছে এবং তারা সঞ্চয়ের পরিমাণও কমিয়ে দিয়েছে। এছাড়া আগে মানুষ জালিয়াতির মাধ্যমে সঞ্চয়পত্র কিনত যা এখন নিয়ন্ত্রিত। এসব কারণেও সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি কমেছে।”

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এ বছরের জুন শেষে ব্যাংকিং খাতে আমানতের স্থিতি ছিল ১৪ লাখ ৭১ হাজার ৬৭৩ কোটি টাকা। সেখানে আগস্ট শেষে স্থিতি নেমেছে ১৪ লাখ ৬৮ হাজার ৯৩৭ কোটি টাকায়। অর্থাৎ জুলাই-আগস্ট দুই মাসে আমানত কমেছে ২ হাজার ৭৩৫ কোটি টাকা। সেখানে দুই মাসে নিট ঋণ বেড়েছে ৫,৪২৭ কোটি টাকা। সেপ্টেম্বর শেষে বেসরকারি খাতে বার্ষিক ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ১৩.৯৫%। আগের মাস আগস্টে যা ১৪.০৭% এ উঠেছিল।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯.৫২%। আর সেপ্টেম্বরে তা দাঁড়ায় ৯.১০%-এ। 

মূল্যস্ফীতির হার থেকে আমানতের সুদের হার বাদ দিলে যা থাকে, সেটাই হচ্ছে প্রকৃত সুদের হার। সে হিসেবে বর্তমানে ব্যাংকে আমানত রাখলে ৬% টাকা কমে যাচ্ছে আমানতকারীদের। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মানুষ সবচেয়ে বেশি নিরাপদ মনে করে সঞ্চয়পত্রকে। তবে এতে বেশি সুদ দিতে হয় সরকারকে। এজন্য সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগে নানা বিধিনিষেধ বেধে দেওয়া হয়। যেমন আয়কর রিটার্নের সনদ ছাড়া পাঁচ লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করা যাবে না। পাশাপাশি কমানো হয়েছে সুদহার। এছাড়া কেনার ক্ষেত্রেও জুড়ে দেওয়া হয়েছে নানা শর্ত। ঘোষণার বাইরে সঞ্চয়পত্র রাখলে জেল-জরিমানার বিধান রয়েছে। এসব কারণে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগেও আগ্রহ হারাচ্ছে মানুষ।

সঞ্চয়পত্রের সুদ হার কমানোর পরামর্শ আইএমএফের

অর্থনীতির দুরাবস্থা কাটাতে সরকার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে ঋণ নেওয়া চেষ্টা করছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্রগুলো জানায়, বাংলাদেশ আইএমএফ থেকে চায় ৪৫০ কোটি ডলার।

এই ঋণের বিষয়ে আলোচনা করতে আইএমএফের একটি দল ঢাকায় এসেছে। দলটি বাংলাদেশের কাছে সঞ্চয়পত্রের নানা দিক জানতে চেয়েছে এবং এ বিষয়ে তাদের অভিমত জানিয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের বক্তব্যও জানতে চেয়েছে তারা। আইএমএফ চায় সঞ্চয়পত্রের সুদের হার আরও কমিয়ে আনুক বাংলাদেশ এবং এ হার অন্তত বাজারদরের কাছাকাছি থাকুক।

বর্তমানে সঞ্চয়পত্রের সুদের হার নিয়ে ১১ মাস আগে থেকে তিনটি স্তর চালু রয়েছে। সে অনুযায়ী কম টাকা বিনিয়োগকারীরা বেশি সুদ পাচ্ছেন, আর বেশি টাকা বিনিয়োগকারীরা পাচ্ছেন কম সুদ। তারপরও বর্তমান হার বাজারদরের চেয়ে বেশি বলে মনে করছে আইএমএফ।

অর্থ বিভাগের পক্ষ থেকে আইএমএফকে জানানো হয়েছে, ৩০ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগের বিপরীতে যে সুদ দেওয়া হয়, তা প্রায় বাজারদরের সমান। আর এক বছরও হয়নি তিনটি আলাদা সুদের হার নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া সঞ্চয়পত্র কেনায় অনলাইন পদ্ধতি চালু, সঞ্চয়পত্রে বেশি বিনিয়োগে করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) থাকার শর্ত আরোপ করা হয়েছে। 

সঞ্চয়পত্রের সুদের হারে সরকার ভর্তুকি দিয়ে থাকে এবং সরকারের পক্ষ থেকে একে সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী খাতের আওতায় থাকা বিষয় হিসেবেও বিবেচনা করা হয় বলে আইএমএফকে জানানো হয়।

সরকারের ঋণ লক্ষ্যমাত্রা

জাতীয় বাজেটে ২০২২-২৩ অর্থবছরের জন্য অভ্যন্তরীণ ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ৪৬ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। 

এর মধ্যে ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে এক লাখ ৬,৩৩৪ কোটি টাকা। এছাড়া এ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র থেকেও ৩৫,০০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে সরকার।

২০২২-২৩ অর্থবছরের আগস্ট পর্যন্ত সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ না নিয়ে উল্টো পরিশোধ করেছিল। 

কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, চলমান অর্থবছরের প্রথম ত্রৈমাসিকে, সরকার ব্যাংকিং খাত থেকে ১২,৫২৬ কোটি টাকা নিট ঋণ নিয়েছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৪,২১৮ কোটি টাকা।

এছাড়া, এ অর্থবছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ১৬,৮৩৩ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে সরকার।

সরকারের ব্যয় আগের তুলনায় বেড়েছে। এক্ষেত্রে আয় কম হওয়া বাড়তি খরচ মেটাতে সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছে। তবে এই ঋণের পরিমাণ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম।

About

Popular Links