বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের পণ্য সবচেয়ে বেশি রপ্তানি হয় যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোতে। তবে অতিরিক্ত মজুত ও খুচরা দোকানের কারণে দেশটিতে ক্রয়াদেশ কমেছে।
এই পরিস্থিতি বিবেচনায় ধীরে ধীরে নতুন বাজারের দিকেও ঝুঁকছেন ব্যবসায়ীরা। এরইমধ্যে অ-প্রথাগত বাজার হিসেবে উঠে এসেছে জাপান। সেখানে রপ্তানিতে চমক দেখেছে দেশের অর্থনীতি।
জাপানে ২০২৩ সালে তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে ১.৬ বিলিয়ন ডলারের। যা আগের অর্থবছরে ছিল ১.০৯ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এ অর্থবছরে আয় বেড়েছে ৪৫.৬২%।
অর্থনৈতিক সংকট সত্ত্বেও গত অর্থবছরে বাংলাদেশের সামগ্রিক তৈরি পোশাক রপ্তানি ১০% বেড়েছে।
দেশীয় জ্বালানি সংকট, চাহিদা হ্রাস, অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি সত্ত্বেও অপ্রচলিত বাজার এই বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে।
তথ্য বলছে, একক বৃহত্তম রপ্তানি গন্তব্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজার জার্মানিতে পোশাক রপ্তানি কমেছে। এছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে রপ্তানি বেড়েছে সামান্য পরিমাণ।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ অর্থবছরে অপ্রচলিত বাজারে ৮.৩৭ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে। যা ২০২২ অর্থবছরের ৬.৩৭ বিলিয়ন ডলার থেকে ৩১.৩৮% বেশি।
তৈরি পোশাক খাতে রপ্তানি আয়ের মোট ১৭.৮২% এসেছে অপ্রচলিত বাজার থেকে।
২০২৩ অর্থবছরে তৈরি পোশাক রপ্তানি খাত থেকে মোট আয় ৪৬.৯৯ বিলিয়ন ডলার। যা ২০২২ অর্থবছরের ৪২.৬১ বিলিয়ন ডলার থেকে ১০.২৭% বেশি।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) দেশগুলোকে ঐতিহ্যবাহী বাজার মনে করা হয়। এর বাইরে অন্য দেশগুলোকে অপ্রচলিত বাজার বিবেচনা করা হয়।
অপ্রচলিত বাজারের মধ্যে রয়েছে, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, ব্রাজিল, মেক্সিকোসহ অন্যান্য দেশ।
পোশাক প্রস্তুতকারকরা বলছেন, কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ের পরে বাংলাদেশের পোশাক খাত অপ্রচলিত বাজারে ভালো আয় করছে।
তারা বলছেন, চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে পশ্চিমা বাজার কিছুটা অস্থিতিশীল। তবে এর বাইরে অন্য দেশগুলো তুলনামূলক ভালো অবস্থানে রয়েছে। ফলে এসব দেশে রপ্তানি গতিশীল রয়েছে।
এ কারণেই প্রথমবারের মতো অপ্রচলিত তিনটি বাজারে আরএমজি রপ্তানি বিলিয়ন-ডলার ক্লাবে যোগ দিয়েছে।
অপ্রচলিত বাজারের প্রধান গন্তব্যের মধ্যে জাপানে রপ্তানি ১.৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। যা গত অর্থবছরের ১.০৯ বিলিয়ন ডলার থেকে ৪৫.৬২% বেড়েছে।
অস্ট্রেলিয়া ও ভারতে পোশাক রপ্তানি প্রথমবারের মতো ১ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক ছুঁয়েছে।
২০২৩ অর্থবছরে অস্ট্রেলিয়ায় ১.১৫ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ। যা ২০২২ অর্থবছরের ৮১২.২৪ মিলিয়ন ডলার থেকে ৪২.৪৮% বেড়েছে।
২০২৩ অর্থবছরে ভারত থেকে আয় হয়েছে ১.০১ বিলিয়ন ডলার। যা ২০২২ অর্থবছরের ৭১৫.৬১ মিলিয়ন ডলার থেকে ৪১.৫৮% বেশি।
ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ কোরিয়া, মেক্সিকো ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে রপ্তানি যথাক্রমে ২২.৪৫% বেড়ে ৫৩৮.৪৬ মিলিয়ন ডলার, ২৬.৫০% বেড়ে ৩৪৮ মিলিয়ন ডলার ও ৩.৫৩% বেড়ে ২৯২.৩৭ মিলিয়ন ডলার হয়েছে।
সম্ভাব্য আরেক গন্তব্য রাশিয়ায় যুদ্ধের কারণে রপ্তানি ২৬.৯৬% কমে ৪২৬.৩৯ মিলিয়ন ডলার হয়েছে।
শিল্প সংশ্লিষ্টরা যা বলছেন
অপ্রচলিত বাজারে বড় আয়ের সুযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছেন শিল্প সংশ্লিষ্টরা।
পোশাক প্রস্তুতকারীরা ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০ বিলিয়ন ডলার তৈরি পোশাক রপ্তানির জন্য লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন। এছাড়া ২০২৫ সালের মধ্যে বিশ্ব বাজারের ১০%-এর দখল নিতে চান তারা। এজন্য ব্যবসায়ীরা নতুন বাজার খুঁজছেন।
ঢাকা ট্রিবিউনের সঙ্গে আলাপকালে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি ফারুক হাসান বলেন, “তারা ঐতিহ্যবাহী বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে চান।”
তিনি বলেন, “এখন আমাদের অপ্রচলিত বাজারের দিকে নজর দেওয়া উচিত। কারণ ক্রেতা এবং ব্র্যান্ডগুলো বাংলাদেশের সাথে ব্যবসা বাড়াতে আগ্রহী। আমরা জাপান, অস্ট্রেলিয়া, কোরিয়া, ভারত, মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকা মহাদেশের মতো টার্গেট দেশের জন্য বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছি। আমরা তাদের পোশাকের প্রবণতা এবং চাহিদা নিয়ে গবেষণা চালাচ্ছি। তাছাড়া, রপ্তানি বাড়ানোর জন্য, আমরা এই বাজারে একাধিক রোডশো আয়োজন করার পরিকল্পনা করছি।”
ব্যবসায়ী ও কূটনীতিকদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে ভবিষ্যতে অপ্রচলিত বাজারে রপ্তানি বৃদ্ধি করা যাবে বলে আশাবাদ প্রকাশ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, “নতুন বাজার অপ্রচলিত বাজারের শেয়ার বাড়াতে অবদান রাখছে। আমরা এই গন্তব্যগুলোকে ইইউতে পরিণত করার পরিকল্পনা করছি। আমরা পর্যাপ্ত ডিজাইন ও অন্যান্য প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কাজ করছি। এই বিষয়ে, সরকার এবং অন্যান্য স্টেকহোল্ডারদের কাছ থেকে নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন।”
বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের অন্যতম প্রধান খাত নিট পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানান, তারা নতুন বাজারে রপ্তানি বাড়াতে বিভিন্ন নীতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সরকারের সাথে কাজ করে আসছে।
তিনি বলেন, “এই দেশগুলোর জন্য চীন ছিল প্রধান উত্স। এখন ক্রয়াদেশ চীন থেকে বাংলাদেশে স্থানান্তরিত হচ্ছে। আমরা এই বাজারে বি-টু-বি যোগাযোগ বাড়ানোর জন্য কাজ করছি এবং কিছু সুবিধা পাচ্ছি।”
তিনি আরও বলেন, “তাদের ব্যবসা করার সহজতা প্রয়োজন।”
বিজিএমইএর পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রে তাদের বাজারের চাহিদা কমেছে, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যাংক সুদের হার বাড়িয়েছে ও অন্যান্য অর্থনৈতিক চাপ রপ্তানিকে প্রভাবিত করেছে।”
তিনি বলেন, “নতুন বাজারে আমাদের অবস্থান খুবই ভালো কারণ প্রায় সব গন্তব্যে প্রবৃদ্ধি ভালো হয়েছে। কিছু দেশে রপ্তানি বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। যেহেতু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমে সমস্যা রয়েছে, তাই আমাদের নতুন বাজারের দিকে মনোনিবেশ করা উচিত।”
তিনি আরও বলেন, “নতুন বাজারের অধিকাংশ দেশই উদীয়মান অর্থনীতির দেশ যেখানে রপ্তানিকারকদের জন্য প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে।”
সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে বাংলাদেশ রপ্তানি থেকে ৫৫.৫৫ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে।



