Thursday, June 04, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

গরম বাড়লে মেজাজ হারায় কেন? বিজ্ঞানের ব্যাখ্যায় এটা 'হিট অ্যাঙ্গার'

গবেষণা বলছে, মস্তিষ্কে চাপের কারণে মেজাজ খিটখিটে হয় এবং সহ্যক্ষমতা কমে যায় 

আপডেট : ২১ এপ্রিল ২০২৬, ১০:২৩ পিএম

পিচগলা রোদ আর ভ্যাপসা গরমে জনজীবন যখন হাঁসফাঁস করছে, তখন চারপাশের মানুষের আচরণের দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে - সবার সহ্যক্ষমতা যেন শেষ প্রান্তে পৌঁছেছে। রাস্তার মোড়ে রিকশাচালকের সাথে উচ্চ স্বরে কথা, বাসে সিট নিয়ে কন্ডাক্টরের সাথে তুমুল তর্ক কিংবা তুচ্ছ ঘটনায় মেজাজ হারিয়ে ফেলা এখন প্রতিদিনের চিত্র। আপাতদৃষ্টিতে একে কেবল ধৈর্যহীনতা মনে হলেও, এর পেছনে রয়েছে গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও বৈজ্ঞানিক কারণ। মনোবিজ্ঞানীরা একে বলছেন 'হিট-অ্যাগ্রেশন হাইপোথিসিস'- যেখানে সূর্যের উত্তাপের সাথে মানুষের রাগের এক সরাসরি যোগসূত্র পাওয়া যায়। 

শরীরের অস্বস্তি ও মেজাজের পরিবর্তন 

তীব্র গরমে আমাদের শরীর এক জটিল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়। বাইরের তাপমাত্রা বাড়লে শরীর নিজেকে শীতল রাখতে 'থার্মোরেগুলেশন' প্রক্রিয়া সক্রিয় করে। এতে হৃদস্পন্দন বেড়ে যায় এবং শরীর দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, অতিরিক্ত তাপে মস্তিষ্কের 'সেরোটোনিন' নামক হরমোনের ভারসাম্য বিঘ্নিত হয়, যা আমাদের মেজাজ নিয়ন্ত্রণে রাখে। একই সাথে স্ট্রেস হরমোন 'কর্টিসল' বেড়ে যাওয়ার ফলে তৈরি হয় শারীরিক ও মানসিক অস্বস্তি। এই ত্রিমুখী চাপের ফলেই আমরা অল্পতেই খিটখিটে হয়ে পড়ি এবং ধৈর্য হারিয়ে ফেলি।

গবেষণায় তাপমাত্রার সঙ্গে রাগের সম্পর্ক

বিগত কয়েক দশকের গবেষণা বলছে, পারদ যত উপরে ওঠে, মানুষের আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠার প্রবণতাও তত বাড়ে। আইওয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. ক্রেইগ অ্যান্ডারসন দেখিয়েছেন, উচ্চ তাপমাত্রার সাথে অপরাধ ও অস্থিরতার এক নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। এমনকি স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সমীক্ষা অনুসারে, তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে ব্যক্তিগত পর্যায়ে সহিংসতা প্রায় ৪ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। অর্থাৎ রোদ যত কড়া হয়, মানুষের মস্তিষ্ক যুক্তির চেয়ে আবেগ দিয়ে তত বেশি পরিচালিত হতে শুরু করে।

পারিপার্শ্বিক চাপ ও মানসিক অস্থিরতা 

আমাদের মতো জনবহুল দেশে গরমের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ে যানজট, শব্দদূষণ আর ধুলোবালি। এই প্রতিকূল পরিবেশ মানসিক চাপকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়। দীর্ঘ সময় গরমে আটকে থাকা, পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব এবং পানিশূন্যতা মিলে মানুষের সহ্যক্ষমতাকে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনে। ফলে মরুভূমি বা গ্রীষ্মপ্রধান দেশের মানুষেরা এই আবহাওয়ায় অভ্যস্ত হলেও, যখন তাপমাত্রা অসহনীয় পর্যায়ে চলে যায়, তখন আর কোনো 'অ্যাডাপ্টেশন' কাজ করে না।

হিট অ্যাঙ্গার নিয়ন্ত্রণ রাখার উপায় 

প্রকৃতিকে ঠান্ডা করা আমাদের হাতে নেই, কিন্তু নিজের মেজাজ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। বিশেষজ্ঞরা কিছু সহজ অভ্যাসের কথা বলছেন:

জলের বিকল্প নেই: শরীর সতেজ রাখতে এবং মস্তিষ্কের কার্যকারিতা ঠিক রাখতে সারাদিন প্রচুর পানি পান করুন। পানিশূন্যতা বিরক্তি ও ক্লান্তি বাড়ায়।

সরাসরি রোদ এড়িয়ে চলা: খুব জরুরি না হলে দুপুরের কড়া রোদ এড়িয়ে চলুন। বাইরে বের হলে ছাতা বা টুপি ব্যবহার করুন, যাতে মস্তিষ্ক সরাসরি তাপ থেকে রক্ষা পায়।

খাবার ও বিশ্রাম: অতিরিক্ত তেল-মশলাযুক্ত ভারী খাবার এড়িয়ে হালকা ও স্বাস্থ্যসম্মত খাবার খান। গরমের ক্লান্তি কাটাতে রাতে অন্তত ৭-৮ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন ঘুমের চেষ্টা করুন।

তর্ক এড়িয়ে চলা: যখন বুঝবেন গরমের কারণে আপনার অস্বস্তি বাড়ছে, তখন যেকোনো অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক থেকে নিজেকে সরিয়ে নিন। একটু নীরবতা অনেক বড় ঝগড়া থামিয়ে দিতে পারে।

তীব্র এই দাবদাহে শরীর ও মনের ওপর যে চাপ তৈরি হয়, তা কাটিয়ে ওঠা কেবল সচেতনতার মাধ্যমেই সম্ভব। বাইরের আবহাওয়া যাই হোক না কেন, নিজের ভেতরের প্রশান্তি ধরে রাখাই হতে পারে এই উত্তপ্ত সময়ে সুস্থ থাকার সেরা উপায়।

   

About

Popular Links

x