Friday, June 05, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

নিখুঁত প্রোফাইলের নেশায় আমরা কি নিজেকে হারিয়ে ফেলছি?

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিখুঁত ছবির আড়ালে লুকিয়ে থাকে ভয়াবহ ‘ডোরিয়ান গ্রে ইফেক্ট’  

আপডেট : ০৩ মে ২০২৬, ০৬:৩০ পিএম

কল্পনা করুন এমন একটা জাদুকরী আয়নার কথা, যার সামনে দাঁড়ালে আপনাকে সবসময় তরুণ আর নিখুঁত দেখাবে। আপনার চেহারায় বয়সের ছাপ পড়বে না, সারাদিনের ক্লান্তি, চোখের নিচের কালি কিংবা মনের ভেতর জমে থাকা কোনো বিষণ্ণতার চিহ্ন সেখানে দেখা যাবে না। আপনি দিন দিন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠবেন, কিন্তু আপনার সেই জরাজীর্ণ রূপটা ফুটে উঠবে অন্য কোথাও - হয়তো দেয়ালের আড়ালে রাখা কোনো গোপন ছবিতে।

শুনতে রূপকথার মতো মনে হলেও, ২০২৬ সালের এই ডিজিটাল বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আমরা কি আসলে সবাই এই জীবনটাই অতিবাহিত করছি না? আমাদের হাতে থাকা স্মার্টফোনটি কি সেই জাদুকরী আয়না হয়ে ওঠেনি?

অস্কার ওয়াইল্ড ও ডোরিয়ান গ্রের অভিশাপ

১৮৯০ সালে প্রখ্যাত সাহিত্যিক অস্কার ওয়াইল্ড ‘দ্য পিকচার অফ ডোরিয়ান গ্রে’ নামে একটি কালজয়ী উপন্যাস লিখেছিলেন। গল্পের নায়ক ডোরিয়ান গ্রে ছিলেন অসম্ভব সুদর্শন। এক শিল্পী তার একটি চমৎকার তৈলচিত্র এঁকেছিলেন। সেই ছবির দিকে তাকিয়ে ডোরিয়ান আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ছবিটির সৌন্দর্য চিরকাল থাকবে কিন্তু তিনি নিজে বুড়ো হয়ে যাবেন। এক তীব্র হতাশায় তিনি কামনা করেন - চেহারার বার্ধক্য বা জীবনের গ্লানি যেন তার শরীরে না পড়ে, বরং সব ছাপ যেন পড়ে তার সেই ছবিতে।

অলৌকিকভাবে তার সেই ইচ্ছা পূরণ হয়েছিল। ডোরিয়ান বাস্তবে আজীবন সুন্দর রয়ে গেলেন, কিন্তু তার শোবার ঘরের গোপন কোণে রাখা ছবিটি দিনে দিনে বীভৎস ও কুৎসিত হতে লাগলো। ডোরিয়ান যত অন্যায় করতেন, তার ছাপ পড়তো সেই ছবির মুখে। সমাজ তাকে দেখতো একজন চিরতরুণ দেবদূতের মতো, কিন্তু তার ভেতরের আসল রূপটা ছিল সেই লুকানো ছবির মতো ভয়াবহ।   

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম: আমাদের আধুনিক ক্যানভাস   

অস্কার ওয়াইল্ড যখন এটি লিখেছিলেন, তখন তিনি কল্পনাও করেননি যে শতবর্ষ পরেও আমাদের সবার হাতে একটি করে ‘ডোরিয়ান গ্রে’র ক্যানভাস থাকবে। আজকের দিনে আমাদের স্মার্টফোনের স্ক্রিনটাই হলো সেই জাদুকরী জায়গা। আমরা অনলাইনে আমাদের জীবনের সবচেয়ে ‘নিখুঁত’ মুহূর্তগুলো শেয়ার করি। সেখানে আমাদের কোনো দুঃখ নেই, চেহারায় ক্লান্তি নেই, আছে শুধু উজ্জ্বল ফিল্টার আর হাসিমুখ। 

এটি শুধু ইনস্টাগ্রামের ঝলমলে ছবিতেই সীমাবদ্ধ নয়। আমাদের পুরো ডিজিটাল অস্তিত্বই এখন একটি মুখোশ। লিঙ্কডইনে বা অন্য কোনো সামাজিক মাধ্যমে যখন আমরা আমাদের সাফল্য তুলে ধরি, তখন সেই পদের পেছনে থাকা অসহ্য স্ট্রেস বা একাকীত্বের খবর কেউ পায় না। ফেসবুকে ফ্যামিলি ডিনারের হাসিমুখের আড়ালে থাকা দূরত্বগুলো আমরা ডিজিটাল ফিল্টারের আড়ালে ঢেকে রাখি। আমাদের অনলাইন প্রোফাইলগুলো চিরকাল সফল আর সুখী থাকছে - ঠিক ডোরিয়ান গ্রের চেহারার মতো। কিন্তু পর্দার আড়ালে আমাদের আসল শরীর আর মন - যেখানে ক্লান্তি, বয়স আর ব্যর্থতার দাগ বাড়ছে, সেটা হয়ে গেছে সেই লুকিয়ে রাখা কুৎসিত তৈলচিত্রের মতো। 

মনস্তত্ত্বের ‘ডোরিয়ান গ্রে ইফেক্ট’ 

ওয়াইল্ডের সেই কাল্পনিক গল্প আজ মনোবিজ্ঞানের গবেষণাগারে বাস্তবতা হিসেবে ধরা দিয়েছে। মনোবিজ্ঞানীরা একে বলছেন ‘দ্য ডোরিয়ান গ্রে ইফেক্ট’ (The Dorian Gray Effect)। গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ যখন দীর্ঘসময় ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের একটি ‘পারফেক্ট’ ইমেজ বা ফিল্টার করা ছবি দেখতে অভ্যস্ত হয়ে যায়, তখন সে তার আয়নার আসল চেহারার ছোটখাটো খুঁতগুলোও আর সহ্য করতে পারে না। এর ফলে বিশ্বজুড়ে এখন তরুণ প্রজন্মের মধ্যে কসমেটিক সার্জারি বা ডিজিটাল এডিটিংয়ের প্রবণতা বাড়ছে। ডোরিয়ান গ্রে যেমন তার বার্ধক্য সহ্য করতে না পেরে অভিশপ্ত জীবনের পথ বেছে নিয়েছিলেন, আধুনিক মানুষও তেমনি তার স্বাভাবিক বয়স বা ক্লান্তি মেনে নিতে পারছে না।

পরিণতি যখন অনিবার্য 

গল্পের শেষে ডোরিয়ান গ্রে আর সহ্য করতে না পেরে নিজের সেই কুৎসিত ছবিটিতে ছুরি বসিয়েছিলেন নিজের আসল রূপ ফেরাতে। কিন্তু মারা গিয়েছিলেন তিনি নিজেই। তার মৃতদেহটি যখন পাওয়া যায়, সেটি ছিল এক বীভৎস কুৎসিত বৃদ্ধের। আর দেয়ালে টাঙানো ছবিটি ফিরে পেয়েছিল তার আদি ও নিষ্পাপ সৌন্দর্য।

ওয়াইল্ড আমাদের সতর্ক করেছিলেন, মানুষ যখন তার বাস্তব সত্তাকে (Authentic self) অস্বীকার করে কেবল বাইরের ‘প্রতিচ্ছবি বা প্রোফাইল’ নিয়ে মত্ত থাকে, তখন তার ভেতরের মানুষটি ধীরে ধীরে মরে যায়। আমরা অন্যের কাছে আমাদের জীবনকে যতটা আকর্ষণীয় দেখাই, একাকিত্বে আমরা কি ঠিক ততটাই রিক্ত বোধ করি না? 

ডিজিটাল ফিল্টারের আড়ালে নিজের সত্যকে হারিয়ে ফেলাটাই আধুনিক যুগের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি। আমরা আয়নায় যা দেখি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যা দেখাই - এই দুটির মধ্যে দূরত্ব যত বাড়বে, আমাদের মানসিক অস্থিরতা তত বাড়বে। ডোরিয়ান গ্রের মতো আমাদের আসল জীবনটা যেন কেবল প্রোফাইলের আড়ালে নিস্তেজ না হয়ে যায়, সেই যত্ন নেওয়াটাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

   

About

Popular Links

x