Wednesday, June 10, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

রাস্তার খাবারে কি মিশছে ‘জিংক ফসফাইড’

জিংক ফসফাইড সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়লে হার্ট, লিভার, কিডনি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলির ক্ষতি করবে 

আপডেট : ০৮ মে ২০২৬, ০৪:০৯ পিএম

রাস্তার পাশে ধোঁয়া ওঠা বিরিয়ানি কিংবা জিভে জল আনা শিক কাবাব - স্বল্প মূল্যে এসব মুখরোচক খাবার দেখে লোভ সামলানো দায়। কিন্তু এই সস্তার খাবারের আড়ালে কি লুকিয়ে আছে বড় কোনো বিপদ? সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং জনমনে একটি আতঙ্ক ছড়িয়েছে যে, কিছু অসাধু বিক্রেতা খাবারে ইঁদুর মারার বিষ বা ‘জিংক ফসফাইড’ ব্যবহার করছে। বিষয়টি কতটা সত্যি আর কতটা গুজব - তা নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর উদ্বেগ।

জিংক ফসফাইড আসলে কী?

জিংক ফসফাইড মূলত ইঁদুর মারার প্রধান উপাদান। এর তীব্র গন্ধ ও বিষক্রিয়া যেকোনো প্রাণীর জন্য মারাত্মক। অভিযোগ উঠেছে, অনেক সময় রাস্তার ধারের দোকানগুলোতে ইঁদুরের উপদ্রব কমানোর জন্য এই বিষ ছিটানো হয়, যা অসাবধানতাবশত খাবারের সংস্পর্শে আসতে পারে। আবার বাসি মাংসের উৎকট গন্ধ ঢাকতে কিংবা মাংস দ্রুত নরম করতে কিছু অসাধু চক্র শক্তিশালী রাসায়নিক ব্যবহার করছেন - এমন সন্দেহ থেকেই এই আতঙ্কের সূত্রপাত।

গবেষণা ও বাস্তবতা

খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংস্থার মতে, সরাসরি খাবারে জিংক ফসফাইড মেশানোর কোনো স্বীকৃত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ বা ল্যাব রিপোর্ট এখনো বাংলাদেশে পাওয়া যায়নি। তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জিংক ফসফাইড না থাকলেও রাস্তার খাবারে এমন কিছু উপাদান পাওয়া গেছে যা এর চেয়েও ভয়াবহ: 

টেক্সটাইল ডাই ও সিসা: বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (BFSA) অভিযানে দেখা গেছে, সস্তা বিরিয়ানি বা জিলাপিতে ব্যবহৃত রং আসলে কাপড়ের রং। এতে উচ্চমাত্রায় সিসা ও ক্রোমিয়াম থাকে, যা কিডনি বিকল ও ক্যানসারের অন্যতম কারণ।

আইসিডিডিবি’এর প্রতিবেদন: গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকা শহরের রাস্তার ধারের প্রায় ৫৫% খাবারে ‘ই-কোলাই’ ও ‘সালমোনেলা’র মতো মারাত্মক ব্যাকটেরিয়া থাকে।

পোড়া তেলের বিষ: একই তেল বারবার ব্যবহারের ফলে তৈরি হওয়া ‘পলি-সাইক্লিক অ্যারোমেটিক হাইড্রোকার্বন’ মানুষের ডিএনএ-র স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে।

জিংক ফসফাইড কতটা বিপদজনক

জিংক ফসফাইডযুক্ত খাবার পাকস্থলীর অম্লরস হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিডের সঙ্গে বিক্রিয়া করে ফসফিন নামে এক বিষাক্ত গ্যাস তৈরি করবে। ফসফিন রক্তে মিশে সুস্থ কোষে পৌঁছলে সবচেয়ে আগে কোষের শক্তিঘর তথা মাইটোকনড্রিয়াকে নষ্ট করে দেবে। ফলে কোষে আর অক্সিজেন ও পুষ্টিরস পৌঁছতে পারবে না। ধীরে ধীরে কোষ অকেজো হতে থাকবে। জিংক ফসফাইড সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়লে হার্ট, লিভার, কিডনি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলির ক্ষতি করবে। এর থেকে মাল্টিঅর্গ্যান ফেলিয়োরের আশঙ্কা প্রবল।

কাদের জন্য প্রাণঘাতী হতে পারে

শিশু ও বয়স্কদের জন্য এই বিষ মারাত্মক। ছোটদের বিপাকহার বেশি হওয়ায় দ্রুত বিষ ছড়িয়ে পড়তে পারে সারা শরীরে। আবার যাদের ওজন কম, তাদের জন্যও মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে এই বিষ। প্রাণসংশয়ও ঘটতে পারে।

হার্টের রোগ, লিভারের অসুখ, ডায়াবিটিস বা কিডনির রোগ আগে থেকেই থাকলে, বিষটির প্রভাবে শরীরের নানা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিকল হয়ে যেতে পারে। তাই খাবার খাওয়ার পরে যদি বমি হতে থাকে, ডায়েরিয়া, পেশির খিঁচুনি দেখা দেয় এবং শরীর অসাড় হয়ে যেতে থাকে, তা হলে দেরি না করে নিকটবর্তী হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।

কী থেকে শরীরে ঢুকতে পারে

দোকান থেকে কিনে আনা সবজি ও ফল ভাল করে নুন-জলে বা ভিনিগার মেশানো জলে পরিষ্কার করতে হবে। যদি দেখেন ফল বা সবজি অতিরিক্ত চকচকে দেখাচ্ছে, তা হলে সেটি ভাল করে না ধুয়ে খাবেন না। রাস্তায় বিক্রি হওয়া চালের কোনও খাবার যেমন খিচুড়ি, বিরিয়ানি বা ভাত, ডাল জাতীয় খাবারে মিশে থাকতে পরে বিষ। দোকানদার কি ধরনের শস্য কিনছেন বা দীর্ঘ সময় সেগুলি সংরক্ষণ করে রাখার জন্য কীটনাশক প্রয়োগ করলে তার থেকেও বিষ শরীরে ঢুকতে পারে। 

তরমুজ, পেঁপে বা আনারসের মতো ফল যদি আগে থেকে কেটে রাখা হয় বা যে জায়গায় রাখা হচ্ছে সেখানে ইঁদুর তাড়াতে বিষ প্রয়োগ করা হয়েছিল, তা হলেও ফসফাইডের মতো রাসায়নিক ফল বা খাবারে মিশে যেতে পারে। আবার অনেক সময় পুরনো খবরের কাগজের ঠোঙায় খাবার দেওয়া হয়। যদি সেই কাগজ কোনও বিষাক্ত রাসায়নিকের সংস্পর্শে থাকে, তবে তা খাবারে আসতে পারে।

সচেতনতাই এখন সমাধানের উপায়

সস্তার খাবার খেয়ে জীবন ঝুঁকিতে না ফেলতে কিছু নিয়ম মেনে চলা জরুরি:

১. উগ্র গন্ধ ও অস্বাভাবিক রং: খাবারে অতিরিক্ত কড়া গন্ধ বা উজ্জ্বল রং দেখলে তা এড়িয়ে চলুন।

২. খোলা খাবার পরিহার: ড্রেন বা ডাস্টবিনের পাশের দোকান থেকে খাবার খাওয়া বন্ধ করুন।

৩. আস্থাভাজন জায়গা: চোখের সামনে তৈরি হওয়া টাটকা এবং পরিষ্কার খাবারকেই প্রাধান্য দিন।

   

About

Popular Links

x