Thursday, June 04, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

ডেটিং দুনিয়ায় নতুন ট্রেন্ড ‘পাফার-ফিশিং’

সম্পর্কে আবেগ বা ঘনিষ্ঠতা বাড়লেই আপনার সঙ্গী হঠাৎ বদলে যেতে পারে 

আপডেট : ২৮ মে ২০২৬, ০২:২৪ পিএম

‘লাভ বম্বিং’ বা ‘ঘোস্টিং’- এর দিন শেষ। জেন-জ়ি প্রজন্মের ডেটিংয়ের পরিভাষায় এবার যুক্ত হলো এক নতুন শব্দ ‘পাফার-ফিশিং’।আপাতদৃষ্টিতে এটিকে সামুদ্রিক কোনো মাছের নাম মনে হলেও, সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটি আসলে এক জটিল ও নেতিবাচক মানসিক আচরণের নাম। 

আমেরিকান থেরাপিস্ট ও লেখিকা কেটি মর্টন তার ‘Why Do I Keep Doing This?’ বইটিতে এই ধারণাকে প্রথমবার আলোচনায় নিয়ে আসেন। বর্তমানে যা নেটপাড়ায় এখন ভাইরাল।

কী এই পাফার-ফিশিং?

সহজ কথায়, সমুদ্রের পাফার ফিশ বা পটকা মাছ যেমন কোনো বিপদের আশঙ্কা দেখলেই নিজের শরীরকে বেলুনের মতো ফুলিয়ে কাঁটাযুক্ত এক শক্ত বল বানিয়ে ফেলে, সম্পর্কের ক্ষেত্রে কিছু মানুষ ঠিক একই আচরণ করেন। সম্পর্কে যখনই ঘনিষ্ঠতা বা ইমোশনাল অ্যাটাচমেন্ট বাড়তে শুরু করে, তখনই এরা এক অদৃশ্য দেয়াল তুলে নিজেদের গুটিয়ে নেন। সম্পর্কে সিরিয়াসনেস বা দায়বদ্ধতা আসার মুখে আচমকা দূরে সরে যাওয়ার এই অদ্ভুত প্রবণতাকেই বলা হচ্ছে ‘পাফার-ফিশিং’।

চেনার উপায়: ‘হট অ্যান্ড কোল্ড’ আচরণ

বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্পর্কের শুরুতে এই ধরনের মানুষদের চেনা প্রায় অসম্ভব। প্রথম দিকে তাঁরা অত্যন্ত রোম্যান্টিক, কেয়ারিং এবং আবেগপ্রবণ হন। কিন্তু সম্পর্ক যখনই একটা গভীর বা সিরিয়াস মোড় নিতে যায়, তখনই তাদের আচরণে দ্রুত বদল আসে:

ক) এক মুহূর্ত খুব কাছে আসতে চাইলেও, পরের মুহূর্তেই চরম দূরত্ব তৈরি করেন।

খ) সম্পর্ক সিরিয়াস হতে থাকলে সঙ্গীর ছোটখাটো খুঁত বা ত্রুটি নিয়ে অতিরিক্ত মাথা ঘামাতে শুরু করেন।

গ) যেকোনো জরুরি বা বাস্তবসম্মত আলোচনা এড়িয়ে যান, কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই হঠাৎ উধাও বা ‘ঘোস্ট’ হয়ে যান।

ঘ) আবার কিছুদিন পর এমনভাবে ফিরে আসেন, যেন কিছুই হয়নি।

কী বলছে সমীক্ষা ও গবেষণা?

এই আচরণটি নিয়ে বিশ্বজুড়ে নানা মনস্তাত্ত্বিক গবেষণা এবং ডেটিং অ্যাপগুলোর সমীক্ষায় চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে:

কমিটমেন্ট অ্যানজাইটি: ডেটিং অ্যাপ ‘বাম্বল’এর একটি বৈশ্বিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রায় ৬২% জেন-জি এবং মিলেনিয়াল ব্যবহারকারী স্বীকার করেছেন যে, তারা সম্পর্কে অতিরিক্ত মানসিক ঘনিষ্ঠতা তৈরি হলে ভয় পান এবং নিজেদের গুটিয়ে নেন। একে অনেকে ‘গার্ডরেইলিং’ ও বলছেন, যা চরম রূপ নিলে ‘পাফার-ফিশিং’ এ পরিণত হয়।

মস্তিষ্কের অবচেতন ভয় মনস্তত্ত্বের বিখ্যাত ‘অ্যাটাচমেন্ট থিওরি’ অনুযায়ী, যারা পাফার-ফিশিং করেন, তারা মূলত ‘Dismissive Avoidant’ মানসিকতাসম্পন্ন। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, সম্পর্কে ঘনিষ্ঠতা বাড়ার সাথে সাথে এদের মস্তিষ্কের ‘অ্যামিগডালা’ (যা ভয় ও বিপদ সংকেত নিয়ন্ত্রণ করে) অংশটি অতি সক্রিয় হয়ে ওঠে। সাধারণ মানুষ সম্পর্কের গভীরতাকে নিরাপত্তা মনে করলেও, পাফার-ফিশারদের মস্তিষ্ক এটিকে একটি ‘খাঁচায় বন্দী হওয়ার মতো বিপদ’ হিসেবে সনাক্ত করে এবং তারা আত্মরক্ষার্থেই দূরে সরে যায়।

‘ফোদো’ বা বিকল্প হারানোর ভয়: মনোবিজ্ঞানীদের মতে, আধুনিক ডেটিং অ্যাপে অন্তহীন অপশন থাকার কারণে তরুণদের মনে FODO (Fear of Dating Options) কাজ করে। অর্থাৎ আজ একজনের সাথে বেশি জড়িয়ে পড়লে হয়তো আগামীকালের আরও ভালো কোনো পার্টনার পাওয়ার সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাবে - এই মানসিক দ্বন্দ্বই তাদের সম্পর্কের গভীরতা থেকে দূরে ঠেলে দেয়।

কেন এই অদ্ভুত আচরণ?

মনোবিদদের মতে, এই আচরণের মূলে রয়েছে এক ধরণের মানসিক ভয় বা ‘কমিটমেন্ট ফোবিয়া’। এছাড়া রয়েছে -

শৈশবের ট্রমা: যাদের ছোটবেলা অবহেলা বা অস্থিরতার মধ্য দিয়ে কেটেছে, তাদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি দেখা যায়।

স্বাধীনতা হারানোর ভয়: সম্পর্ক গভীর হলে তারা ভাবেন হয়তো নিজের স্বাধীনতা হারাচ্ছেন বা সম্পর্কে আটকে পড়ছেন। 

অবিশ্বাসের দেয়াল: কাউকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে না পারার কারণে এরা নিজেদের চারপাশে এক অদৃশ্য দেয়াল তুলে নেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এরা মানুষ হিসেবে খারাপ নন, তবে এদের মূল সমস্যা হলো যোগাযোগের অভাব। হঠাৎ করে সঙ্গীর এই রূপ বদলে অপরজন মারাত্মক মানসিক অবসাদের শিকার হতে পারেন। এই পরিস্থিতি এড়াতে সম্পর্কের শুরু থেকেই ভয় লুকিয়ে  না রেখে খোলামেলা কথা বলা জরুরি।

   

About

Popular Links

x