Tuesday, July 14, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

ডাইনোসর থেকেই এসেছে আজকের ব্রয়লার মুরগী! বিবর্তনের ধারায় উঠে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য

মাত্র ৭০ সেন্টিমিটারের মতো লম্বা এই ডাইনোসরটি আকারে ছিল ঠিক আজকের একটি বড়সড় মুরগি বা রাজহাঁসের সমান

আপডেট : ১৪ জুলাই ২০২৬, ০৭:৪১ পিএম

বনের মুক্ত পরিবেশ থেকে আজকের খামারের ডাইনোসর-সদৃশ পাখি হওয়া পর্যন্ত ব্রয়লার মুরগির গল্পটি বেশ পুরনো। আমাদের ডাইনিং টেবিলের বহুল পরিচিত 'ফার্মের মুরগি' বা ব্রয়লারের বিবর্তনীয় শিকড় বুঝতে সম্প্রতি বিজ্ঞানীদের দৃষ্টি গেছে সাড়ে ১২ কোটি বছর পুরোনো এক জীবাশ্মের দিকে, যা আধুনিক পাখির বিবর্তনীয় ইতিহাসের একটি নতুন জানালা খুলে দিয়েছে।

স্পেনের উত্তরাঞ্চলের বার্গোস প্রদেশে পাওয়া গেছে ‘ফসকেইয়া পেলেনডোনাম’ নামের এক প্রাক-ঐতিহাসিক ডাইনোসরের জীবাশ্ম। মাত্র ৭০ সেন্টিমিটারের মতো লম্বা এই ডাইনোসরটি আকারে ছিল ঠিক আজকের একটি বড়সড় মুরগি বা রাজহাঁসের সমান। বিজ্ঞানীদের মতে, আজকের আধুনিক মুরগি কিংবা পাখির এই 'ডাইনোসরীয়' রক্তধারা এবং তাদের বিবর্তনের পথচিত্র বোঝার জন্য এটি এক যুগান্তকারী আবিষ্কার।

বিজ্ঞান সাময়িকী পেপারস ইন প্যালিওন্টোলজি-তে প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, দুই পায়ে হাঁটা মুরগির আকারের এই ছোট ডাইনোসরটির পেছনের পা ছিল লম্বা ও দ্রুত দৌড়ানোর উপযোগী। টি-রেক্সের মতো সামনের হাতগুলো ছোট হলেও এরা মাংসাশী ছিল না; বরং অদ্ভুত গঠনের দাঁত ও শক্ত চোয়ালের সাহায্যে তৃণভোজী জীবনযাপন করত।

স্পেনের সালাস দে লস ইনফান্তেস ডাইনোসর মিউজিয়ামের পরিচালক এবং এই জীবাশ্মের আবিষ্কারক ফিদেল তোরসিদা ফার্নান্দেজ জানান, ডাইনোসর থেকে আধুনিক পাখির (যার অন্তর্ভুক্ত আজকের মুরগিও) রূপান্তরের ইতিহাস বিজ্ঞানীরা যতটা সরল ভাবতেন, বিষয়টি আসলে তার চেয়ে অনেক জটিল। সাড়ে ১২ কোটি বছর আগে ছোট ছোট এই প্রাণীগুলোই বিবর্তনের ধারায় পরিবর্তিত হয়ে আজকের পাখিকুলে রূপ নেওয়ার পথ সুগম করে।

জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিতে আদিম ডাইনোসর বংশোদ্ভূত বুনো 'রেড জাঙ্গলফাউল' থেকে হাজার বছরের প্রজনন ও বিবর্তনের মাধ্যমে তৈরি হয়েছে আধুনিক গৃহপালিত মুরগি। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বুনো অবস্থায় থাকা এই পাখিকে মানুষ প্রথম পালতে শুরু করে। পরবর্তীতে ডিম ও মাংসের উৎপাদন বাড়াতে কৃত্রিম নির্বাচনের মাধ্যমে প্রজনন করানো হয়।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কল্যাণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৪৬ সালের ‘চিকেন অব টুমরো’ প্রজেক্টের পর কম সময়ে বেশি মাংস উৎপাদনকারী আধুনিক ‘ব্রয়লার’ জাতের বিকাশ ঘটে। আজকের আধুনিক ব্রয়লার কোনো হরমোন বা কৃত্রিম রাসায়নিক দিয়ে তৈরি নয়; বরং তা কোটি কোটি বছরের বিবর্তনীয় ধারা এবং আধুনিক জিনগত নির্বাচনের বৈজ্ঞানিক সাফল্য।

বিজ্ঞানীদের মতে, মাটির নিচে পাওয়া সাড়ে ১২ কোটি বছর আগের সেই মুরগিসদৃশ ডাইনোসর কিংবা আজকের ফার্মের আধুনিক ব্রয়লার, উভয়ই প্রমাণ করে যে বিজ্ঞানের চোখে কোনো কিছুই ছোট নয়। অতীত পৃথিবীর সেই ছোট ডাইনোসরগুলোর অস্তিত্বই আজকের খাদ্য নিরাপত্তার অন্যতম বড় স্তম্ভ হয়ে রূপ নিয়েছে।

বিজ্ঞানীদের মতে, আধুনিক ব্রয়লারের মূল পূর্বপুরুষ হলো দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বনাঞ্চলে ঘুরে বেড়ানো বুনো পাখি 'রেড জাঙ্গলফাউল'। হাজার বছর আগে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মানুষ প্রথম এ বুনো মুরগি পালন শুরু করে।

প্রাথমিকভাবে এর উদ্দেশ্য কেবল খাদ্য ছিল না; বরং ধর্মীয় আচার, বিনোদন এবং মোরগ লড়াইয়ের জন্য মুরগি পোষা হতো। সময়ের পরিক্রমায় ডিম ও মাংসের চাহিদা মেটাতে মানুষ বেছে বেছে বেশি উৎপাদনশীল ও শান্ত প্রকৃতির মুরগি প্রজনন করাতে শুরু করে।

ব্রয়লার মুরগি মূলত মাংস উৎপাদনের জন্য বিশেষভাবে তৈরি কৃত্রিম নির্বাচন পদ্ধতির ফসল। ১৯২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ডেলাওয়ারের খামারি সিসিল স্টিল ভুলবশত ৫০টির জায়গায় ৫০০টি মুরগির বাচ্চা পেয়ে তা বাণিজ্যিকভাবে লালন-পালন ও বিক্রি করেন। এ ঘটনাটি বাণিজ্যিক পোলট্রি খাতের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

পরবর্তীতে ১৯৪৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে আয়োজিত হয় বিখ্যাত ‘চিকেন অব টুমরো’ প্রতিযোগিতা। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল কম সময়ে ও কম খরচে বেশি মাংস উৎপাদনকারী জাত তৈরি করা। উচ্চমাত্রার জিনগত নির্বাচন, সঠিক পুষ্টি, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ও উন্নত খামার প্রযুক্তির মাধ্যমে মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বাজারজাতকরণের উপযোগী আধুনিক ব্রয়লার জাতের বিকাশ ঘটে।

বাংলাদেশে একসময় কেবল গ্রামীণ উঠানে দেশি মুরগি পালন হতো, যার উৎপাদনশীলতা ছিল তুলনামূলক কম। ষাটের দশকে তত্ক্ষণাৎ পূর্ব পাকিস্তানে এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে পোলট্রি নিয়ে পরীক্ষামূলক গবেষণা শুরু হয়।

পরবর্তীতে আশির দশকে 'আর্বার একরস'-এর মতো উন্নত ব্রয়লার লাইন দেশে নিয়ে আসা হয়। নব্বইয়ের দশক থেকে বেসরকারি খাতের উদ্যোগে ছোট ও মাঝারি খামারের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে, যা বর্তমানে লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে এবং দেশের পোলট্রি শিল্পকে বিলিয়ন টাকার খাতে রূপান্তর করেছে।

ফার্মের মুরগিতে হরমোন বা ইনজেকশন দিয়ে দ্রুত বড় করা হয়, দীর্ঘদিন ধরে বাজারে প্রচলিত এমন ধারণা বৈজ্ঞানিকভাবে ভিত্তিহীন। বিশেষজ্ঞরা জানান, হরমোন নয়, বরং বহু বছরের জেনেটিক উন্নয়ন, সুষম খাদ্য ব্যবস্থাপনা এবং আধুনিক স্বাস্থ্য পরিচর্যার কারণেই এরা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। ব্রয়লার কোনো কৃত্রিম জীব নয়, বরং এটি সাধারণ বুনো মুরগির এক বৈজ্ঞানিকভাবে উন্নত রূপ।

বনের ছোট এক পাখির গৃহপালিত হওয়া থেকে আজকের বাণিজ্যিক ব্রয়লার হয়ে ওঠার এই দীর্ঘ সফর কেবল একটি প্রাণীর গল্প নয়; এটি মানব সভ্যতার খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এক সফল মেলবন্ধন।

   

About

Popular Links

x