Tuesday, August 11, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

নোটিফিকেশন না এলেও কেন বারবার ফোন দেখি?

অকারণে বারবার ফোন দেখার অভ্যাস ধীরে ধীরে মনোযোগ কমিয়ে দেয়

আপডেট : ২৬ জুলাই ২০২৬, ০২:৫৬ পিএম

কোনো শব্দ হয়নি, পকেটে বা টেবিলে রাখা ফোনটিতে আসেনি কোনো ভাইব্রেশনও। তবুও আড্ডা, কাজ কিংবা পড়ার মাঝেই অবচেতনে হাত চলে যাচ্ছে ফোনের স্ক্রিনে। লক খুলে একনজর দেখে নেওয়া - না, নতুন কোনো মেসেজ বা আপডেট নেই। তবু খানিক বাদে আবার একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি।

কেন এমন হয়? এটা কি নিছকই অভ্যাস? নাকি এর পেছনে কাজ করছে আমাদের মস্তিষ্কের কোনো খেলা? চলুন, এই ‘অকারণ ফোন দেখা’র পেছনের বিজ্ঞানটা একটু জেনে নেওয়া যাক।

কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, একজন স্মার্টফোন ব্যবহারকারী দিনে গড়ে প্রায় দেড় শতাধিক বার ফোনে হাত দেন, যার অর্ধেকেরও বেশি ঘটে কোনো নোটিফিকেশন বা বার্তা ছাড়াই।

‘ডোপামিন’ 

আমাদের মস্তিষ্কে ‘ডোপামিন’ নামে এক ধরনের হরমোন আছে, এটি মূলত প্রত্যাশা ও অনিশ্চয়তার সঙ্গে কাজ করে। ডোপামিন আমাদের শুধু ভালো অনুভব করায় না, একই অভ্যাস বারবার করতে মস্তিষ্ককে শেখায়।

যখন আমরা ফোনে কোনো লাইক, কমেন্ট বা মেসেজ দেখি, তখন মস্তিষ্কে ডোপামিন নিসৃত হয় এবং আমাদের ভালো লাগে। এই ভালো লাগার আশায় আমরা বারবার ফোন চেক করি। অনেক সময় বিষয়টা শুধু ভালো লাগা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়, এটা আসলে আমাদের মস্তিষ্কের রিওয়ার্ড সিস্টেম-এর সঙ্গেও জড়িয়ে আছে। বিজ্ঞানীরা একে ‘স্লট মেশিন ইফেক্ট’-এর সঙ্গে তুলনা করেন। আমরা নতুন কোনো নোটিফিকেশনের আশায় বারবার স্ক্রিন রিফ্রেশ করি।

জরুরি কিছু মিস করলাম?

অন্যদিকে আছে ‘ফোমো’, ফেয়ার অফ মিসিং আউট। আমাদের অবচেতন মনে সবসময় একটা ভয় কাজ করে ‘আমি কি জরুরি কিছু মিস করলাম?’ বন্ধুরা কোথায় আড্ডা দিচ্ছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন কী ট্রেন্ড চলছে, কিংবা জরুরি কোনো ইমেইল এল কি না! এই উদ্বেগও কিছুক্ষণ পর পর ফোন চেক করার কারণ হতে পারে।

আমাদের সবাইকে এখন বিভিন্ন কারণে বেশি সময় ধরে ফোন ব্যবহার করতে হয়। এর ফলে আমাদের স্নায়ুতন্ত্র ক্রনিক অ্যালার্ট মোডে চলে যায়। মানে, মস্তিষ্ক মনে করে, যেকোনো সময় কিছু ঘটতে পারে। এর ফলেই ঘটে ‘ফ্যান্টম ভাইব্রেশন সিনড্রোম’।

আসলে কোনো নোটিফিকেশন নেই, কিন্তু মস্তিষ্ক এতটাই অভ্যস্ত হয়ে গেছে সংকেতের জন্য অপেক্ষা করতে যে, সামান্য কিছু শব্দকেও সে ফোনের ভাইব্রেশন হিসেবে ব্যাখ্যা করে ফেলে।

‘মাসল মেমোরি’

লিফটের ভেতর কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা, জ্যামে বসে থাকা, কিংবা অপরিচিত পরিবেশে একা দাঁড়িয়ে থাকার মুহূর্তের মতো ছোট ছোট পরিস্থিতিগুলোতেই মানুষ সবচেয়ে বেশি অস্বস্তি বোধ করে। কী করব, কোথায় তাকাব, কাউকে চোখে চোখে তাকাতে হবে কি না, এই দ্বিধা থেকে বাঁচতেই ফোনটা অনেকের সামনে আসে।

স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকাটা তখন এক ধরনের সামাজিক ঢাল। এতে আমরা অপ্রস্তুত নীরবতাও এড়িয়ে যেতে পারি। ধীরে ধীরে স্ক্রিনে চোখ রাখা ‘নিরাপদ আচরণ’ হিসেবে গেঁথে যায়, ফোন না দেখলে যেন অস্বস্তিটাই চোখে পড়ে।

এই ‘ফ্যান্টম চেকিং’ বা অকারণে ফোন দেখার অভ্যাসটি অজান্তেই অনেক মানুষকে কিছুটা হলেও বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে। এই অভ্যাসটা সময়ের সঙ্গে আরও গভীর হয়। একসময় আর কোনো বিশেষ কারণ লাগে না ফোন তোলার। হাত নিজে থেকেই পকেট বা ব্যাগে চলে যায়। একে বলা যায় আচরণগত ‘মাসল মেমোরি’। বছরের পর বছর একই নড়াচড়া করতে করতে মস্তিষ্ক আর সিদ্ধান্ত নেয় না। তখন নোটিফিকেশন না আসলেও ফোন চেক করাই স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হয়ে দাঁড়ায়।

শেষ কথা  

স্মার্টফোন আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে সহজ করেছে, এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু অকারণে বারবার ফোন দেখার অভ্যাস ধীরে ধীরে মনোযোগ কমিয়ে দেয়, কাজের ধারাবাহিকতা নষ্ট করে এবং আশপাশের মানুষ ও বাস্তব মুহূর্ত থেকে আমাদের দূরে সরিয়ে দেয়।

এই অভ্যাস রাতারাতি বদলানো কঠিন। কারণ এটি শুধু ইচ্ছাশক্তির বিষয় নয়, বরং মস্তিষ্কের দীর্ঘদিনের অভ্যাসের ফল। তবে প্রতিবার ফোন হাতে নেওয়ার আগে যদি নিজেকে প্রশ্ন করা যায় - এখন কি সত্যিই ফোনটা দেখা দরকার?' তাহলে ধীরে ধীরে এই প্রবণতা কমানো সম্ভব।

সব সময় স্ক্রিনে নয়, মাঝে মাঝে চোখ রাখুন বাস্তব জীবনের দিকেও। বর্তমান মুহূর্ত, প্রিয় মানুষ আর নিজের সঙ্গে কাটানো সময়ই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে মূল্যবান।

   

About

Popular Links

x