ভৌতিক সিনেমা দেখার সময় হঠাৎ পর্দায় কোনো ভয়ংকর দৃশ্য ভেসে উঠলে অনেকেই চোখ বন্ধ করেন। কেউ চমকে ওঠেন, কেউ আবার ভয়ে চিৎকার করে ওঠেন। অথচ সিনেমা শেষ হওয়ার পর সেই দৃশ্য নিয়েই বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা করেন। সুযোগ পেলে আবারও ভৌতিক সিনেমা দেখতে বসেন। শুধু সিনেমা নয়, ভূতের গল্প, ভুতুড়ে বাড়ি কিংবা ভয় জাগানো বিভিন্ন অভিজ্ঞতার প্রতিও অনেকের আলাদা আকর্ষণ রয়েছে।
যে অনুভূতি থেকে মানুষ সাধারণত দূরে থাকতে চান, সেটিই আবার বিনোদনের উৎস হয়ে ওঠে কীভাবে? ভয় পাওয়ার মধ্যেও আনন্দ খুঁজে পাওয়ার পেছনে কাজ করে মস্তিষ্ক ও শরীরের কিছু স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া।
ভয় পেলে শরীরে কী ধরনের পরিবর্তন ঘটে
ভয় পাওয়া শুধু মানসিক কোনো বিষয় নয়। ভয় পেলে শরীরেও বেশ কিছু পরিবর্তন ঘটে। ভয় কেন অনেকের কাছে আনন্দদায়ক হয়ে ওঠে, তা বুঝতে হলে মস্তিষ্ক ও শরীরের এই প্রতিক্রিয়াগুলো সম্পর্কে জানা প্রয়োজন।
কোনো পরিস্থিতিকে বিপজ্জনক মনে হলে মস্তিষ্কের অ্যামিগডালা সক্রিয় হয়ে ওঠে। এটি মস্তিষ্কের এমন একটি অংশ, যা ভয় শনাক্ত করা এবং ভয়সংক্রান্ত প্রতিক্রিয়া তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অ্যামিগডালা শরীরের স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্রকে (অটোনমিক নার্ভাস সিস্টেম) সংকেত পাঠায়। এর ফলে অ্যাড্রেনালিন ও কর্টিসলের মতো স্ট্রেস হরমোনের নিঃসরণ বাড়ে। হৃদ্স্পন্দন ও রক্তচাপ বেড়ে যায়, শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত হয় এবং শরীর ঘামতে শুরু করে।
এ সময় শরীর সম্ভাব্য বিপদের মুখে লড়াই করা অথবা সেখান থেকে পালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়। এই প্রতিক্রিয়াকে বলা হয় ‘ফাইট অর ফ্লাইট’। মূলত আত্মরক্ষার জন্যই শরীরের এই স্বাভাবিক ব্যবস্থা কাজ করে।
তবে ভয় পেলেই সবাই একইভাবে প্রতিক্রিয়া দেখান না। কারও ক্ষেত্রে সামান্য শব্দেও তীব্র ভয় তৈরি হতে পারে, আবার কেউ ভীতিকর পরিস্থিতিতেও নিজেকে সামলে রাখতে পারেন। ব্যক্তিভেদে স্নায়ুতন্ত্রের সক্রিয়তা, ব্যক্তিত্ব ও পরিস্থিতি বিচার করার ক্ষমতার পার্থক্য এর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
ভৌতিক সিনেমা বা ভয়ংকর কোনো অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও আলাদা। তখন শরীর বিপদের সংকেতের মতো প্রতিক্রিয়া দেখালেও মানুষ জানেন, তিনি বাস্তবে নিরাপদ। ফলে শরীরের উত্তেজনা ও মনের নিরাপত্তাবোধ একসঙ্গে কাজ করে। অনেকের কাছে এই অভিজ্ঞতাই ভয়কে আনন্দ ও রোমাঞ্চে পরিণত করে।
ভয় ও আনন্দের মধ্যে সম্পর্ক কী?
ভয়ের অভিজ্ঞতা নিয়ে ২০২০ সালে সাইকোলজিক্যাল সায়েন্স সাময়িকীতে একটি গবেষণা প্রকাশিত হয়। ডেনমার্কের একটি ভুতুড়ে আকর্ষণকেন্দ্রে আসা ১১০ জনের অভিজ্ঞতা পর্যবেক্ষণ করেন গবেষকেরা।
গবেষণায় দেখা যায়, ভয় ও আনন্দের মধ্যে সম্পর্ক রয়েছে। তবে ভয় যত বাড়বে, আনন্দও তত বাড়বে - এমন নয়। বরং ভয় ও আনন্দের মধ্যে একটি ভারসাম্য থাকলে মানুষ অভিজ্ঞতাটি বেশি উপভোগ করতে পারেন।
খুব বেশি ভয় অস্বস্তি তৈরি করতে পারে। আবার ভয় একেবারেই না থাকলে রোমাঞ্চের অনুভূতিও কমে যেতে পারে। অর্থাৎ নিয়ন্ত্রিত মাত্রার ভয় অনেকের কাছে আনন্দদায়ক হয়ে উঠতে পারে।
অজানা ও ভয়ংকর বিষয়ের প্রতি কৌতূহল
মানুষের ভয় পাওয়ার আরেকটি দিক হলো অজানা বিষয় জানার আগ্রহ। অন্ধকার ঘরে কী আছে, হঠাৎ শব্দটি কোথা থেকে এল কিংবা ভৌতিক সিনেমার চরিত্রটির পরিণতি কী হবে - এসব জানার কৌতূহল মানুষকে আগ্রহী করে তোলে।
মনোবিজ্ঞানে ভয়ংকর, বিপজ্জনক বা অস্বাভাবিক বিষয় সম্পর্কে জানার আগ্রহকে ‘মরবিড কিউরিওসিটি’ বলা হয়। এ ধরনের কৌতূহল থেকেই কেউ অপরাধের ঘটনা, দুর্ঘটনা কিংবা ভৌতিক কাহিনি সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হতে পারেন। তবে এর অর্থ এই নয় যে তারা বাস্তবে এমন বিপদে পড়তে চান। বরং নিরাপদ দূরত্বে থেকে এসব বিষয় সম্পর্কে জানার আগ্রহ কাজ করতে পারে।
২০২৪ সালে ফ্রন্টিয়ার্স ইন সাইকোলজি সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ৫৫৮ জন অংশগ্রহণকারীর ভৌতিক চলচ্চিত্র দেখার অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করা হয়। এতে ভয়, উত্তেজনা, আনন্দ ও কৌতূহলের মতো অনুভূতির সম্পর্ক তুলে ধরা হয়। গবেষণাটি ভীতিকর বিষয় জানার আগ্রহের সঙ্গে এমন অভিজ্ঞতা উপভোগের সম্পর্ক বুঝতে সাহায্য করে।
সবাই কি ভয় উপভোগ করেন?
একই ভৌতিক সিনেমা দেখে একজন আনন্দ পেলেও অন্যজন আতঙ্কিত হতে পারেন। এর কারণ, সবার ভয় পাওয়ার ধরন এক নয়। ব্যক্তিত্ব, আগের অভিজ্ঞতা এবং অনিশ্চিত পরিস্থিতি সামলানোর ক্ষমতা - এসব বিষয় ভয়ের অভিজ্ঞতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
কেউ নতুন ও রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা পছন্দ করেন। আবার কেউ ভীতিকর পরিস্থিতি এড়িয়ে চলতেই স্বস্তি পান। তাই ভৌতিক সিনেমা বা ভয়ংকর অভিজ্ঞতার প্রতি আকর্ষণ সবার মধ্যে সমানভাবে দেখা যায় না।



