ঘ্রাণই বলত কথা। বেলী ফুল জানান দিত ভূগোল। লেডি বার্ড টিউটোরিয়ালের কাঁঠাল গাছ মনে করিয়ে দিত মৌসুম। নিরিবিলির এক প্রতিরূপ হয়ে চোখে ভাসে ছোট্টবেলার পড়শী রোড।
গলি মহল্লায় অনেক। মানুষও বহু। আর দোকান তো হরদম। কিন্তু সব্বার চেয়ে আলাদা এই পড়শী রোড। পড়শী জেনারেল স্টোর নামে আজও অক্ষয় মিরপুর ২ নম্বর সেকশনের দোকানটি। রাস্তাও মানুষ চেনে এই পড়শীর নামে। লাগে না সাইনবোর্ড।
শহর পাল্টেছে। শহরবাসী সময় স্রোতে এদিক-ওদিক। কিন্তু মহল্লার স্মারক চিহ্ন দোকানের পরশ পাওয়া এই গলি। নাকি গলির পরশ পাওয়া এই দোকান? কারও সঠিক উত্তর বেছে নেওয়ার ঝক্কি নেই। আসলে একাকার মিলনই মৌলিক।
এখান দিয়েই মসজিদ। স্কুলে যেতে এ পথ। তালতলা মাঠের ম্যাচ শেষে সন্ধ্যা ঘনায় একই পথে। রাত গড়ালে পড়শী রোড জমা রাখে সনি থেকে সিনেমা দেখা শেষে মানুষের হুল্লোড়। কুয়াশা চুইয়ে পড়া রাত, মায়াবিনী শীতের রোদ্দুর আর টুপুর টাপুর বর্ষা - সব স্মৃতি নিউরনে স্টোর রেখে সজীব পড়শী রোড।
আজকের ঢাকা বহু কিছুর মতো মহল্লা সংস্কৃতি হারিয়েছে। পড়ার পাঠাগার আর খেলার ক্লাব প্রায় বিলীন। কে ভেবেছিল বড়বেলা এমন হবে? যে শহরের অধিকাংশ মানুষ জানেন না পাশের ফ্ল্যাটের মানুষের পরিচয়। কামলা দেওয়া শ্রমের পর জ্যামে অচল নাগরিক। সহায় তখন সেলফোন। সেখানে শাহরুখ-সানি-পুতিন-জেলেনস্কি কী নেই? সবজান্তা এখনের বিশ্বনাগরিক। হায় চ্যাট জিপিটি! তুমি বলতে পারো না আমার নাড়ি পোঁতা জমিনের নাম। তেমন “আনঅ্যাবল” তুমি আমার দাদার কব্বরে।
ঘুরে ফিরে পড়শী রোড এজন্য প্রাসঙ্গিক। ৮৮ সালে বন্যা ছুঁয়েছিল এই হযরত শাহ আলী (রা.) স্মৃতিভূমের মাটি। ডোবেনি তখনও পড়শী রোড। কোকাকোলার বাজার পাওয়ার সাক্ষী পড়শী জেনারেল স্টোর। এরশাদ নামে যে রাজা ছিলেন, তার পচন ও পতন মনে রাখে এ রাস্তা। ডাল-ভাত ছেড়ে আমাদের ফাস্টফুড নিত্যতার স্মৃতিও এখানে। স্নিগ্ধতার জোনাকি এখানে। তুরাগের পলিমাটির বলক এখানে। আর একইভাবে ছোটবেলার হারানো মার্বেল আর ভোকাট্টা ঘুড়িও পড়শী রোড বাদ রেখে নয়।



