Friday, June 21, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

আজও দুর্গাপূজার সময় মহিষাসুরের অনুসারীরা পালন করেন শোক

দুর্গাপূজার সময় মহিষাসুরের জন্য শোক পালন করা হয়। কোথাও অরন্ধন, কোথাও জানালা-দরজা বন্ধ করে ঘরে বসে থাকেন অনুসারীরা। যেন দুর্গাপূজার মন্ত্র বা ঢাকের শব্দ কানে না পৌঁছায়

আপডেট : ২০ অক্টোবর ২০২৩, ০৪:২০ পিএম

“আগুনে যে ঝাঁপ দেয়- তারও কিছু অনুসারী থাকে,/উজ্জ্বলতা এক ফাঁদ, আড়ালে সে পোড়াতেই ডাকে।” ইমতিয়াজ মাহমুদের কবিতার অংশ এটি। দেবী দুর্গার অসুর বধ ও অসুরের বংশধরের শোক পালনের ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক প্রেক্ষাপটে কথাটি মেলাতে পুরোপুরি মিলে যায়। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী “অসুরদের” সম্রাটকে বধের কারণে যে দুর্গার পূজা করেন লাখ লাখ সনাতন ধর্মাবলম্বী, সেই অসুরের অনুসারীও নেহায়েত কম নয়।

অসুরকে সনাতন হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা খল চরিত্র হিসেবে উপস্থাপন করেন। অন্যদিকে অসুর বংশীয় ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীরা দেবতা মনে করেন তাকে। দুর্গাপূজার সময় শোক পালন করেন এই নৃ-গোষ্ঠীর মানুষ।

অসুরদের লোককথা অনুযায়ী, আর্যদের দেবী দুর্গা এই সময়েই তাদের রাজা মহিষাসুরকে ছলনার মাধ্যমে হত্যা করেছিলেন। রাজাকে হারানোর শোক হাজার হাজার বছর ধরেও ভুলতে পারেননি তারা।

“অসুর” ভারতের একটি বিশেষ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড আর বিহারে এদের বাস। পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড, ছত্তিশগড়ের আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে অসুর সম্রাট “হুদুড় দুর্গা”র স্মরণে প্রতি বছর সভার আয়োজন করা হয়।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি ২০২০ সালের ২৬ অক্টোবর এক প্রতিবেদনে জানায়, “হুদুড় দুর্গার স্মরণে ২০১১ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে দুই শতাধিক স্মরণসভা হয়েছিল, ২০১৮ সালে সংখ্যাটা বেড়ে দাঁড়ায় সতশ'র কিছু বেশি। আর ২০২০ সালে পশ্চিমবঙ্গের শুধু তিন জেলায় (মালদা, উত্তর দিনাজপুর এবং দক্ষিণ দিনাজপুর) সাড়ে তিন হাজার জায়গায় এই স্মরণ সভা হয়েছে।”

মহিষাসুর ও দেবী দুর্গা বিতর্ক

হিন্দু পুরাণে মহিষাসুর আর দেবী দুর্গার যুদ্ধের কাহিনী আছে। আদিবাসী লোকগাথাতেও সেই কাহিনী রয়েছে, কিন্তু দুটি কাহিনীর দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ বিপরীত।

হুদুড় শব্দের অর্থ ঝঞ্ঝা, বিদ্যুৎ বা বজ্রের ধ্বনি। মহিষাসুরের প্রভাব আর শক্তি ছিল বজ্রের মতো। আর দুর্গা শব্দটা দুর্গের রক্ষক অর্থে ব্যবহৃত। এটা পুংলিঙ্গ। প্রবল শক্তিশালী এক দুর্গের রক্ষক, অর্থাৎ রাজাই ছিলেন মহিষাসুর বা হুদুড় দুর্গা।

শরদিন্দু উদ্দীপন নামে এক গবেষক অসুরদের নিয়ে গবেষণা করেছেন। তিনি বিবিসিকে বলেন, “মহিষাসুর ছিলেন অত্যন্ত বলশালী ও প্রজাবৎসল এক রাজা। আদিবাসীদের প্রচলিত লোকগাথা অনুযায়ী এক গৌরবর্ণা নারীকে দিয়ে তাদের রাজাকে হত্যা করা হয়েছিল। আর্যরা ভারতে আসার পরে তারা কোনোভাবেই মহিষাসুরকে পরাজিত করতে পারছিল না। তাই তারা মহিষাসুরকে বধ করার জন্য এক নারীকে ব্যবহার করেন।”

শরদিন্দু উদ্দীপনের ভাষায়, “রাজা মহিষাসুরের সময়ে নারীদের অত্যন্ত সম্মান দেওয়া হতো। রাজা কোনো নারীর সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হবেন না, বা তার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরবেন না, এ রকম ধারণা ছিল আর্যদের। তাই তারা দুর্গাকে এই কাজে ব্যবহার করেছিলেন।”

চলচ্চিত্র নির্মাতা সুমিত চৌধুরীর মতে, “এক গৌরবর্ণা নারীই যে মহিষাসুরকে বধ করেছিলেন, তা হিন্দু পুরাণেও আছে। দেবী দুর্গার যে প্রতিমা গড়া হয়, সেখানে দুর্গা গৌরবর্ণা, টিকলো নাক, যেগুলো আর্যদের শারীরিক বৈশিষ্ট্য। দুর্গার আরেক নাম সেজন্যই গৌরী। অন্যদিকে মহিষাসুরের যে মূর্তি গড়া হয় দুর্গাপূজায়, সেখান তার গায়ের রঙ কালো, কোঁকড়ানো চুল, পুরু ঠোঁট। এগুলো সবই অনার্যদের বৈশিষ্ট্য।”

গবেষকদের মতে, মহিষাসুর সংক্রান্ত যে লোকগাঁথা রয়েছে তা প্রায় ৩০০০ বছর পুরোনো। বুদ্ধেরও আগের যুগের ইতিহাস এটা। মহিষাসুরকে নিয়ে যে লোকগাঁথা তা পুরো দক্ষিণ এশিয়াজুড়েই পাওয়া যায়।

মহিষাসুর গবেষক ও আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক প্রমোদ রঞ্জনের ভাষায়, “বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে এই অসুর জাতির ইতিহাস আর্যদের পূর্ববর্তী যুগের ইতিহাস। শুধু লোকগাথায় মহিষাসুর আছেন, তা নয়। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনেও তাকে খুঁজে পাওয়া গেছে। মহিষাসুরের পরম্পরা দক্ষিণ এশিয়ার নানা এলাকায় ছড়িয়ে আছে। যে পরম্পরা হাজার হাজার বছর ধরে বয়ে আসছেন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষেরা।”

গবেষক শরদিন্দু উদ্দীপনের মতে, “সম্রাট অশোক মহিষাসুরকে বর্তমানের মহিশুর বা মাইসোর অঞ্চলটি শাসন করতে পাঠিয়েছিলেন।”

মহিষাসুরের জন্য যেভাবে পালন করা হয় শোক

চিরাচরিতভাবে দুর্গাপূজার সময়টাতেই মহিষাসুরের জন্য শোক পালন করা হয়। কোথাও অরন্ধন পালন করা হয়, কোথাও জানালা-দরজা বন্ধ করে ঘরে বসে থাকেন মহিষাসুরের অনুসারীরা। যেন দুর্গাপূজার মন্ত্র বা ঢাকের শব্দ তাদের কানে না যায়।

দুর্গাপূজার সময় তারা অশৌচ পালন করেন। ভুয়াং বাদ্যযন্ত্র নিয়ে দাসাই নাচ করেন তারা। যেখানে পুরুষরা নারী যোদ্ধার ছদ্মবেশ ধারণ করে কান্নার সুরে গান গেয়ে গ্রামে গ্রামে ঘোরেন।

মহিষাসুর গবেষক ও আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক প্রমোদ রঞ্জন বলেন, “অসুররা তাদের সম্রাটের জন্য শোক পালন করেন। এর কারণ একদিকে মনুবাদী সংস্কৃতির বিরুদ্ধে আদিবাসী সমাজের রুখে দাঁড়ানো; অন্যদিকে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতিকে তুলে ধরার প্রয়াস।”

About

Popular Links