Tuesday, June 25, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

শিশুদের নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা থামান এখনই

  • শিশুদের নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা অনেকের কাছেই যেন স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে
  • সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘মিম’ এবং ‘ট্রল’ করার প্রবণতাও বেড়েছে
আপডেট : ০৮ নভেম্বর ২০২৩, ১২:২০ এএম

রাজধানীর লালমাটিয়া এলাকার গৃহবধূ তাহমিনা ইয়াসমিন (ছদ্মনাম)। ছোটবেলায় পরিবারের উৎসাহে যুক্ত ছিলেন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে। ইচ্ছে ছিল বড় নৃত্যশিল্পী হওয়ার। তবে হঠাৎ বাবার মৃত্যুর কারণে তাদের পরিবারে ছন্দপতন ঘটে। কলেজে পড়া অবস্থায় বিয়ে হয়ে যায়, নতুন সংসারে এসে ছেদ পড়ে সাংস্কৃতিক চর্চায়। তবে ভেতরে ভেতরে স্বপ্নটা পুষেই রেখেছিলেন। নিজের স্বপ্ন মেয়েকে দিয়ে বাস্তবায়ন করাতে তাই মেয়েকেও ভর্তি করে দিয়েছেন নাচের স্কুলে। মেয়েরও নাচের প্রতি প্রবল ঝোঁক। তাহমিনা মেয়ের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি পেজ খুলেছেন। সেখানে নিয়মিত তিনি দশ বছর বয়সী মেয়ের নাচের ভিডিও আপলোড করেন। তবে সেখানে মাঝে মধ্যেই নেতিবাচক মন্তব্য আসে। তাহমিনা বিষয়টিকে তেমন পাত্তা দিতেন না। তবে সম্প্রতি ফেসবুকে এক মেয়ে শিশুশিল্পীর বিভিন্ন ভিডিওতে নেটিজেনদের অশ্লীল ও আক্রমণাত্মক মন্তব্য দেখে ভয় পেয়ে যান তিনি। ওই মেয়ে শিশুটির ছবি ব্যবহার করে বড়দের দ্বারা “মিম” এবং “ট্রল” করার বিষয়টি তাকে আরও বেশি ভাবিয়ে তোলে। নিজের মেয়ের সঙ্গে এমন কিছু ঘটলে তিনি মেনে নিতে পারবেন না। তাই ইদানিং ফেসবুকে মেয়ের ভিডিও আপলোড করা কমিয়ে দিয়েছেন। এতে তার মেয়েটিও নাচের প্রতি কিছুটা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে।

প্রায় একই রকম অভিজ্ঞতা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সোহেল রহমানের (ছদ্মনাম)। তার আট বছর বয়সী ছেলের সমবয়সীদের তুলনায় সব বিষয়ে অনেক বেশি আগ্রহ। কথায়ও বেশ পটু তার ছেলে। সে কথার সবকিছুই যে যৌক্তিক, তা নয়। তবে ছোট ছেলের পাকা পাকা কথার ভিডিওধারণ করে মাঝে মধ্যেই অনলাইনে আপলোড করেন সোহেল। কিন্তু হঠাৎই একদিন তার সামনে আসে একটি বিশেষ দিবসে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এক শিশুর দেওয়া উত্তর নিয়ে। ওই দিবস সম্পর্কে সে কী জানে এমন প্রশ্নের জবাবে শিশুটি একজন বিশেষ সম্মানিত ব্যক্তির নাম বলেন, যা প্রশ্নের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল না। তবে, ওই শিশুর অবুঝ উত্তরটি হাসির খোরাক হয়ে ওঠে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী বয়সে বড়দের কাছে। তারা ওই শিশুর ছবি ও মন্তব্য ব্যবহার করে মেতে ওঠে “মিম” এবং “ট্রল”করায়। নিজের ছেলের ছবি বা মন্তব্য নিয়ে কেউ এমন করতে পারে, এমন শঙ্কায় সোহেল অনলাইন থেকে নিজের ছেলের ছবি-ভিডিও সরিয়ে নিয়েছেন।

তাহমিনা কিংবা সোহেলের মতো নিজের সন্তানকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন রামপুরার বাসিন্দা নাফিসা ইসলাম (ছদ্মনাম)। তবে তার বিষয়টি একটু আলাো। তার তের বছর বয়সী ছেলে একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ে। জন্ম থেকেই তার ছেলের দৃষ্টিশক্তিতে কিছুটা সমস্যা রয়েছে। চিকিৎসকের পরামর্শে তাই ছেলের চোখে দিতে হয়েছে চশমা। চশমা ছাড়া তার ছেলে কিছুটা কম দেখে। আর এই বিষয়টিই আরেক বিপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে তার ছেলের জন্য। সহপাঠীরা তার ছেলেকে “কানা” বলে ডাকে। ছেলে তার ছোট হলেও বিষয়টি মানতে পারে না, এমন ডাকে সে কষ্ট পায়। এমনকি স্কুলেও যেতে চায় না। সহপাঠীরাও তার সমবয়সী, তাই তাদের বলে তেমন লাভ হবে না ভেবে নাফিসা বিষয়টি নিয়ে অন্য শিশুদের অভিভাবক এবং শিক্ষকদের সঙ্গে আলাপ করেন, যাতে তারা অন্য ‍শিশুদের বিষয়টি বুঝিয়ে বলেন। কিন্তু তাতেও বন্ধ হয়নি সহপাঠীদের ঠাট্টা। বরং অনেক অভিভাবক তো এমনও বলে বসেছেন যে, “আপনার ছেলেকে বোঝান, বন্ধুরা এরকম একটু মজা করতেেই পারে। বিষয়টিকে সে যেন মজা হিসেবেই দেখে।” ছেলের অনাগ্রহের কারণে কয়েক দিন যাবত তাকে স্কুলে পাঠাচ্ছেন না তিনি।

শুধু তাহমিনা, সোহেল কিংবা নাফিসা নন; নিজেদের বিভিন্ন বয়সী সন্তান নিয়ে প্রতিনিয়ত এমন নানা অপ্রত্যাশিত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হচ্ছেন অসংখ্য বাবা-মা। তাদের সন্তানরা কোনো না কোনোভাবে প্রায়ই অনলাইনে-অফলাইনে সহপাঠী, বন্ধু, স্বজন কিংবা প্রতিবেশীর দ্বারা ঠাট্টা-তামাশার স্বীকার হচ্ছেন। অনেকেই হয়ত নিছক মজার জন্যই শিশুদের নাম, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা, শারীরিক গঠন, অভ্যাস কিংবা আচরণ নিয়ে মন্তব্য করেন, কিন্তু এই বিষয়টিই যে ভয়াবহ বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে ওই শিশুর জন্য। অন্যদের এই মজা শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর রেখে যেতে পারে ভয়াবহ প্রভাব। যার পরণতি তাকে বইতে হতে পারে ভবিষ্যতেও।

অনলাইন কিংবা অফলাইনে সমবয়সী, ছোট কিংবা বড়দের দ্বারা এমন ঠাট্টা কিংবা তামাশা করার বিষয়টিকে “বুলিং” হিসেবেই দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশে (আইসিডিডিআরবি) কর্মরত মনোবিজ্ঞানী ফারজানা ফাতেমা রুমী বলেন, “চার রকমের বুলিং রয়েছে। শারীরিক, মৌখিক, সামাজিক এবং সাইবার বুলিং। শিশুদের নিয়ে এমন ঠাট্টা-তামাশা শারীরিক বুলিং ছাড়া বাকিং তিনি ধরনের বুলিংয়েরই শ্রেণিভূক্ত হিসেবে ধরা যায়।”

সাইবার কিংবা সামাজিক বুলিং সংশ্লিষ্ট শিশু ছাড়া অন্য শিশুদের মনের ওপরও প্রভাব ফেলে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার ভাষ্য, যেকোনো শিশুকে বুলিংয়ের শিকার হতে দেখে অন্য শিশুদের মনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। সে নিজেকে অনিরাপদ ভাবতে পারে।নিজেও এমন পরিস্থিতির শিকার হতে পারে ভেবে সে নিজেকে গুটিয়ে নিতে পারে, যার ফলে তার বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ও সৃজনশীলতা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ভুক্তভোগীরা পরবর্তী সময়ে আচরণগত বিভিন্ন মানসিক সমস্যায় ভুগতে পারেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

এই মনোবিজ্ঞানী বলেন, “মানুষের ব্যক্তিত্বের ভিত্তি গড়ে ওঠে শিশুকাল থেকে। অথচ বর্তমানে বুলিং শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।” 

তিনি বলেন, "শিশুরা জাতির ভবিষ্যৎ। সেই ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যদি এরকম মানসিক বিপর্যয়ের সঙ্গে বেড়ে ওঠে তাহলে সামগ্রিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশ ও দেশের সমৃদ্ধি।"

বুলিং কিংবা ঠাট্টা তামাশার বিষয়টি শিশুমনে কী ধরনের প্রভাব ফেলে সে বিষয়ে ঢাকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএেএমইউ) মনোরোগবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ডা. সালাহ্‌উদ্দিন কাউসার বিপ্লব বলেন, “বুলিংয়ের শিকার শিশুরা হীনমন্যতা এবং উদ্বিগ্নতাজনিত মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ে বেড়ে উঠতে পারে। এটি তা ভেতর বিভিন্ন পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডারের জন্ম দিতে পারে। এমনকি ক্ষেত্র বিশেষে শিশুকে আত্মহত্যার দিকেও ঠেলে দিতে পারে।”

এমন পরিস্থিতি থেকে উত্তোরণের জন্য তিনি সচেতনতার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, “যারা ট্রল বা বুলিং করছে তারা বেশিরভাগই মজা করার জন্যই করছে। কিন্তু এই বিষয়টিই অন্যের ভয়াবহ ক্ষতি করছে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি দরকার সচেতনতা। পারিবারিকভাবে সচেতন হতে হবে, ধর্মীয় অনুশাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। এক্ষেত্রে বড়দের দায়িত্ব একটু বেশি। তাদের মনে রাখতে হবে যে শিশুরা অনেক বেশি সেন্সেটিভ, একবার তাদের মনে কোনো বিষয়ে ভয় ঢুকে গেলে সেখান থেকে বের করা কঠিন। তাই শিশুদের নিয়ে অনলাইন কিংবা অফলাইনে যেকোনো ধরেন মন্তব্য এবং রসিকতা করার আগে ভেবে নিতে হবে। পাশাপাশি নিজের সন্তানদেরও শেখাতে হবে, তারা যেন সমবয়সীদের কোনো দুর্বলতা কিংবা ভুল নিয়ে ঠাট্টা-মশকরা না করে।"

সাধারণত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সবচেয়ে বেশি বুলিং প্রবণতা দেখা যায় বলেও উল্লেখ করেন তিনি। 

তিনি ২০১৯ সালে ইউনিসেফের একটি সমীক্ষার কথা উল্লেখ করেন। ওই সমীক্ষায় বলা হয়, বাংলাদেশে প্রতি চারজন শিক্ষার্থীর একজন সমবয়সীদের দ্বারা বুলিংয়ের শিকার হয়।

যেসব শিশু বুলিংয়ের শিকার হয় ক্লাসে তাদের অনুপস্থিতির আশংকা বেশি থাকে উল্লেখ করে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের সমন্বিত উদ্যোগে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনকামূলক ক্যাম্পেইনের ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেন এই মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ।

পাশাপাশি তিনি গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকার প্রতিও জোর দেন। শিশুসংশ্লিষ্ট যেকোনো ভাইরাল বিষয়ে সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে তিনি ইউনিসেফ ও সরকারের শিশুবিষয়ক নীতিমালা মেনে চলার আহ্বান জানান।

বুলিংয়ের শিকার শিশুরা সমাজের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব নিয়ে বেড়ে উঠতে পারে বলেও সতর্ক করলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জিয়া রহমান। তার মতে, বুলিংয়ের শিকার শিশুর অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ কমে যেতে পারে। এসব বিষয় পরবর্তী সময়ে তাকে অপরাধপ্রবণ করে তুলতে পারে বলে মনে করেন তিনি। অনলাইন কিংবা অফলাইন, সবখানে বুলিং বন্ধে তিনিও সামাজিক সচেতনতার ওপর জোর দিতে হবে বলে জানান। পাশাপাশি শিশুদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও খেলাধুলায় সম্পৃক্ততা বাড়ানোর প্রতি জোর দেন তিনি।

সাইবার বুলিং বিষয়ে তিনি বলেন, “আমার একটি ট্রানজিকশন পিরিয়ডের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। সমগ্র বিশ্বই এই সময়টি পার করছে। এই ট্রানজিকশিটি হলো প্রযুক্তি নির্ভরতা। আমরা চাইলেই প্রযুক্তি নির্ভরতা এড়াতে পারি না। তবে আমার যেটা করতে পারি, সেটা হলো; গাইডলাইন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কী করা যাবে, কী করা যাবে না। কোন মজাটা অন্যের জন্য ক্ষতিকর সে বিষয়ে একটি গাইডলাইন তৈরি করা যেতে পারে।”

সচেতনতার পাশাপাশি সাইবার বুলিং রোধে আইনের যথাযথ ব্যবহারের প্রতিও জোর দেন এই বিশেষজ্ঞ।

সাইবার বুলিং রোধে পুলিশ সদা তৎপর বলে জানালেন ঢাকা মহানগর পুলিশেরর (ডিএমপির)  সাইবার ক্রাইম বিভাগের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (সিটিটিসি) নাজমুল ইসলাম।

তিনি বলেন, “আগের চেয়ে মানুষের মধ্যে প্রতিবাদ করার মানসিকতা এবং পুলিশের কাছে আসার প্রবণতা বেড়েছে। আমরা প্রতিদিন প্রায় ২৫-৩০ টা অনলাইনে হয়রানি সংক্রান্ত অভিযোগ পেয়ে থাকি। এর মধ্যে প্রায় ৭০% অভিযোগই টিনএজারদের কাছ থেকে আসে।”

সাইবার ক্রাইমের কাছে আসা সব অভিযোগে নিয়মিত মনিটর করা হয় এবং সেগুলো সুরাহা করতে পুলিশ শতভাগ চেষ্টা করে বলে জানান এই কর্মকতা। বর্তমানে বাংলাদেশ পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিট প্রযুক্তিগত দক্ষতায় বেশ সমৃদ্ধ বলে জানান তিনি।

তার মতে, পুলিশকে না জানালে সহায়তা করার সুযোগ পুলিশের থাকে না। তাই পুলিশের কাছে অভিযোগ জানানোর ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষকে উব্ধুদ্ধ করতে গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান জানান এডিসি নাজমুল ইসলাম।

About

Popular Links