সভ্যতার ক্রমবিকাশের নানা স্তরে সমকালের চিহ্ন ধরে রাখতে স্থাপত্যে কারিকেচার করেছে মানুষ। শৈল্পিক রূপ দিতে নিরলস প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে এই বিদ্যায়। এ জন্য এক সময়ের স্থাপনার সঙ্গে অন্য সময়ের স্থাপনা বেশ আলাদা; কালের চিহ্নও। তবে ঐতিহাসিক অনেক স্থাপনা যেমন আমাদের মুগ্ধ করে, আবার কিছু স্থাপনা দৃষ্টিকটু মনে হয়।
চেক প্রজাতন্ত্রের রাজধানী প্রাগ শহরের ব্রুটালিস্ট ভবনগুলো সম্পর্কেও এমন দ্বিধা-দ্বন্দ্ব রয়েছে। গত শতাব্দীর ষাট ও সত্তরের দশকের কংক্রিটের তৈরি জ্যামিতিক আকারের সহজ-সরল স্থাপনা রয়েছে। সেই শৈলিকে “ব্রুটালিজম” বলা হয়। সবাই এসব স্থাপনা পছন্দ করেন না। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এমন ধরনের বেশ কয়েকটি স্থাপনা ভেঙে ফেলা হয়েছে।
“আর্কিটেকটুরা ৪৮৯” গোষ্ঠীর সদস্য ও শিল্পের ইতিহাসবিদ লুকাস ভাইরকার। তিনি এসব স্থাপনা ভেঙে ফেলার বিপক্ষে। তিনি জানান, ভেঙে ফেলা ভুল পদক্ষেপ। অন্য ইতিহাসবিদ ও স্থপতিদের সঙ্গে তিনি ব্রুটালিস্ট স্থাপত্য সংরক্ষণের চেষ্টা চালাচ্ছেন।
লুকাশ বলেন, “এসব স্থাপনা সময়ের স্মৃতিচিহ্ন। এগুলো অক্ষত রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্থাপনাগুলোর মাধ্যমে আমরা শহরের বয়স, মানুষ, স্থাপত্যের প্রবণতা তথা তত্ত্ব ও ভাবনাচিন্তা বুঝতে পারি।”
ব্রিটেনে উৎপত্তির পর ব্রুটালিজম গত শতাব্দীর ষাটের দশকে প্রাগে পা রাখে। সে সময়কার চেকোস্লোভাকিয়ার ওপর সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাব ছিল। সেখানকার সাবেক পার্লামেন্ট ভবনের মতো স্থাপনা এখনো রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়।

লুকাশ ভাইরকার মতে, “অনেকে বলবেন, খোদ কমিউনিজমের সঙ্গে এর যোগ রয়েছে। কিন্তু ভবনটি খুবই আধুনিক ও সমসাময়িক পশ্চিমা স্থাপত্যের প্রতিফলন। ষাটের দশকের শেষে কারেল প্রাগার সেটি ডিজাইন করেছিলেন। তিনি পশ্চিমা বিশ্বের শিল্প ও স্থাপত্য সম্পর্কে বেশ ওয়াকিবহাল ছিলেন।”
ব্রুটালিজম সোভিয়েত উদ্ভাবন ছিল না। এই শৈলির উদ্যোক্তারা সাহসী আকার-আয়তন ও খোলামেলা উপাদান দিয়ে সৎ, সহজ-সরল ও কেজো স্থাপত্য গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। গোটা বিশ্বেই ব্রুটালিস্ট ভবন ছড়িয়ে রয়েছে।
লন্ডনের বার্বিক্যান এস্টেটের ভবনটি “ব্রুটালিস্ট”। এই ভবনটিকে সুন্দর বলা যায় কিনা- এমন প্রশ্নে লুকাশ ভাইরকা বলেন, “আমি ঠিক সুন্দর বলব না, কারণ সুন্দর শব্দটি ভালো নান্দনিক কোনো শ্রেণি বোঝায় না। আমি বরং ইন্টারেস্টিং, স্কাল্পচারাল বা আবেদনময় হিসেবে বর্ণনা করব। কারণ ব্রুটালিস্ট ভবনগুলোর চরিত্রই হলো বিশেষ আবেদন সৃষ্টি করে আশপাশের পরিবেশের সঙ্গে কনট্রাস্ট সৃষ্টি করা।”
হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল ভবনটি প্রাগ শহরের দুটি অবশিষ্ট ব্রুটালিস্ট স্থাপনার অন্যতম। খোলামেলা কংক্রিটের তৈরি জ্যামিতিক আকারের এই ভবনের সঙ্গে অন্য কোনো শৈলি খাপ খায় না। আপাতত সেটির সংস্কারের কাজ চলছে, যদিও সেই উদ্যোগকে ঘিরে বিতর্ক রয়েছে। প্রাগের সব ব্রুটালিস্ট ভবন এতটা অজনপ্রিয় বা লুপ্তপ্রায় নয়। এমনকি জাতীয় থিয়েটারেরও সংরক্ষিত ভবনও তালিকায় রয়েছে।
একই শৈলি সম্পর্কে এমন ভিন্ন মনোভাব কেন? লুকাশ ভাইরকার মতে, “মনে হয় সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের লোকজনের নান্দনিকতা সম্পর্কে নিজস্ব মতামত রয়েছে। সেটাই হলো সমস্যা। তারাই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন; সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সবকিছু দেখছেন। সেটার সঙ্গে সবসময়ে ভবনের মূল্য খাপ খায় না।”
এ ক্ষেত্রে ব্রুটালিজম এমনকি আরও জনপ্রিয় গথিক ও বারোক শৈলিকে ছাপিয়ে টিকে যেতে পেরেছে। প্রাগের এমাউস মনাস্ট্রি চতুর্দশ শতকে গড়ে উঠেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সেই স্থাপনার মারাত্মক ক্ষতি হয়েছিল।
মনাস্ট্রির দুটি টাওয়ার আবার গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রতিযোগিতায় এক ব্রুটালিস্ট ডিজাইনের জয় হয়েছিল। যদিও অনেক মানুষ মূল টাওয়ার পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ দেখতে চেয়েছিলেন।
লুকাশ ভাইরকা বলেন, “আমার মনে হয় এই ধরনের স্থাপত্য বিশেষ এক অনুভূতি জাগিয়ে তোলে। নির্মাণের সময়ে এমন সব ভবন খুবই ইন্টারেস্টিং ছিল। তারপর ৬০ বা ৭০ বছর পর আমরা এখনো হয় এর পক্ষে বা বিপক্ষে সংগ্রাম চালাচ্ছি।”
তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়- যে স্থাপত্য যুগোপযোগী নয়, তা নিয়ে আমাদের কী করা উচিত? সেগুলো কী ভেঙে ফেলা ভালো? নাকি অতীত যুগের দূত হিসেবে সেগুলো অক্ষত রাখা দরকার?



