Friday, June 05, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

নিরাপদ খাদ্য: শাহবাগে বসছে দেশি চালের সাপ্তাহিক হাট

  • বিগত বছরগুলোতে মানুষের খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন এসেছে
  • আঁশযুক্ত দেশি চালসহ নিরাপদ খাদ্যপণ্যের সমাহার এই হাট
আপডেট : ১৯ জানুয়ারি ২০২৪, ০৭:৩৬ পিএম

শাহবাগের সড়ক বিভাজকে গত ১২ জানুয়ারি দিনব্যাপী এক ব্যতিক্রমধর্মী হাট বসেছিল। অনেকটা গ্রামগঞ্জের সাপ্তাহিক হাটবারের মতোই সেদিন নিরাপদ খাদ্যপণ্যের বাজারজাতকারক ও খুচরা বিক্রেতারা তাদের পসরা সাজিয়ে বসেছিলেন।

এই হাটের লক্ষ্য হারিয়ে যেতে বসা স্বাস্থ্যসম্মত বেশ কয়েক ধরনের দেশি জাতের আঁশযুক্ত লাল চাল ও বীজ ধানের প্রচারণা ও সহনীয় দামে বিক্রি। সেদিন শাহবাগের হাটে আরও উঠেছিল পাহাড়ের বিন্নি চাল, লাল চিনি, হাতে ভাজা মুড়ি, চিড়া, কাউন, যবের ছাতু, গমের লাল আটা, তিল, তিসি, খেজুরের গুড়, মধু, এবং সরিষা, তিসি ও কালোজিরার তেলসহ বিবিধ নিরাপদ খাদ্যপণ্য।

বেলা ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত চলেছে সেই “দেশি চালের হাট”। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বরাতে অনেকে ভোক্তা এই উদ্যোগ সম্পর্কে জেনে কেনাকাটা করতে জড়ো হন শাহবাগে। পাশাপাশি পথচারী থেকে শুরু করে রিকশা ও সিএনজিচালকদের মতো স্বল্পআয়ের মানুষও এই আয়োজন দেখে থেমেছেন, উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে সাগ্রহে নিরাপদ খাদ্যপণ্য সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন।

পণ্য বিক্রির পাশাপাশি দুপুরে ও রাতে চামারা চালের ভাতের সঙ্গে নিরাপদ উপায়ে উৎপাদিত সবজির ভর্তা-ভাজি-ডাল দিয়ে খাবারও বিক্রি হয়েছে।

হাটে নিরাপদ পণ্য নিয়ে এসেছেন এক উদ্যোক্তা/ঢাকা ট্রিবিউন

এরপর শনি ও রবিবার যথাক্রমে মিরপুর ১০ এবং মিরপুর ৬ নম্বর এলাকায় ছোট পরিসরে বসেছিল এই হাট।

আগামী শুক্রবার (১৯ জানুয়ারি) শাহবাগের সড়ক বিভাজকে ফের বসবে “দেশি চালের হাট”, জানালেন হাটের প্রধান উদ্যোক্তা হাসান মেহেদী। তিনি সোনালী ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা। সাপ্তাহিক ছুটির দিন সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে দেশি জাতের ধান চাষে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে স্বেচ্ছাশ্রমভিত্তিক প্রতিষ্ঠান “পথ্য” গড়ে তোলেন।

মেহেদী দীর্ঘদিন ধরে তার ফেসবুক প্রোফাইল থেকে আঁশসহ বিভিন্ন দেশি চাল খাওয়ার উপকারিতা নিয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে কাজ করছেন। তাছাড়া তিনি নিজ উদ্যোগে দেশি ধানের বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করেন।

খোলা আকাশের নিচে এভাবে হাট চালুর পরিকল্পনায় তার সঙ্গে আরও কয়েকজন বাজারজাতকারক ও বিক্রেতা যুক্ত হন। যারা শাহবাগে তাদের উৎপাদিত পণ্য নিয়ে হাজির হন।

কী ছিল প্রথম হাটে?

গত ১২ জানুয়ারি হাটের প্রথম দিনে চামারা চাল, কালীবোরো বীজধান ও কালাবকরি বীজধান বিক্রি করেছে “পথ্য”; বগা দিঘা ও হিজলদিঘা চাল নিয়ে এসেছিল “প্রাকৃতিক কৃষি বিপণন কেন্দ্র”; রাতাবোরো ও কালাবকরি চাল বিক্রি করেছে হাইজিন হারভেস্ট; বিরই, গাঞ্জিয়া, বাঁশফুল, বিন্নি, কালোচাল ও পূর্ণ আঁশযুক্ত চাল বিক্রি করেছে লালচাল ডট কম; আর পোলাও চাল তুলসীমালা ও কালোজিরা এনেছিল “বাঙলার ঐতিহ্য”।

এছাড়া স্প্রাউট উপযোগী আস্ত মাষকলাই, আস্ত মুগ, চানারা ধানের চিড়া, কার্তিকশাইল ধানের হাতে ভাজা মুড়ি, যবের ছাতু ও চামারা আতপ চালের গুড়া বিক্রি করেছে “দেশজ”; আর খেজুরের গুড়, মধু ও কালোজিরা তেল এনেছিল “স্বপ্নছোঁয়া”।

অন্যদিকে দুপুরে ও রাতের জন্য চামারা চালের ভাত ও ভর্তার প্ল্যাটার করেছিল “শুদ্ধ কৃষি”।

আগামী শুক্রবারের হাট

হাসান মেহেদী আশা করছেন, আগামী শুক্রবার “বনবীথি” এই “দেশি চালের হাট”-এ যুক্ত হবে সুন্দরবনের প্রাকৃতিক মধু, ঘরে তৈরি নারকেল তেল ও খুলনা অঞ্চলের বিখ্যাত চুইঝাল নিয়ে; “ডেইলি ফুড শপ” আনবে প্রাকৃতিক মধু, ঘি ও সরিষার তেল; কালোজিরা তেল ও তিলের তেল নিয়ে আসবে “বাদামী চাল”; এবং আঁশযুক্ত চালসহ ঘরে তৈরি বিভিন্ন পণ্য নিয়ে যুক্ত হবে পারফেকশন গুডস।

এছাড়া হাটের ক্রেতা-বিক্রেতা ও দর্শনার্থীরা চাইলে ১৪৯ টাকার চামারা প্ল্যাটার নিতে পারবেন। চামারা চালের ভাত, কাঁচা টমেটো ভর্তা, কচু শাক, মসুর ডাল ভর্তা, নতুন আলু ভর্তা, বেগুন ভর্তা এবং মাষকলাই ডাল এই প্ল্যাটারের অন্তর্ভুক্ত।

হাটে ওঠা নিরাপদ খাদ্যপণ্য/ঢাকা ট্রিবিউন

হাসান মেহেদীসহ এসব প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তারা প্রায় সবাই বয়সে তরুণ; এদের অনেকেই প্রায় এক যুগ ধরে নিরাপদ কৃষি ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তারা নিজেদের নিরাপদ খাদ্য আন্দোলন কর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।

চামারা: ছোটলোকের মোটা চাল

গত এক যুগে হাসান মেহেদীসহ অন্যান্য উদ্যোক্তাদের বিক্রয় ও প্রচারণার ফলে স্বাস্থ্যসচেতন অনেক পরিবার কাটিং-পলিশিং করা মিনিকেট বা নাজিরশাইল চাল ও উচ্চ কোলেস্টেরলযুক্ত সয়াবিন তেল কেনার অভ্যাস থেকে সরে এসেছেন। তাছাড়া বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী অনেক খাদ্যপণ্য অনলাইনে বা দোকান থেকে কিনতে পারছেন।

হাসান মেহেদী মনে করেন, বিগত বছরগুলোতে মানুষের খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন এসেছে। সঙ্গে তৈরি হয়েছে নিরাপদ খাদ্যপণ্য গ্রহণে অনীহা। এর ফলে তারা (বিশেষ করে শহরের বাসিন্দারা) নানাবিধ অসুখে ভুগছেন, যা সহজেই এড়ানো যেত।

আঁশযুক্ত লাল চাল, লাল আটা, লাল চিনি, নিরাপদ মাটিতে সার-কীটনাশক ছাড়া উৎপাদিত শাক-সবজি, প্রাকৃতিক মধু, সরিষার তেল, অবাণিজ্যিকভাবে পালিত দেশি মুরগি-হাঁস, নদী-খালবিলের মাছ এবং দেশি খাসি-গরুর মাংস ইত্যাদি নিরাপদ খাদ্যপণ্যের অন্তর্ভুক্ত।

অন্যান্য চালের পাশাপাশি মূলতঃ যমুনার চর এলাকায় উৎপাদিত চামারা চালকে সারাদেশে ছড়িয়ে দিতে সবচেয়ে বেশি সময় দেন হাসান মেহেদী।

তার কাছে কেজিপ্রতি ৬০ টাকায় পাওয়া যায় স্বল্প, মাঝারি ও পূর্ণ আঁশযুক্ত চামারা চাল। এতে লাভ সীমিত হলেও তিনি খুশি। নিজের প্রতিষ্ঠান পথ্য এন্টারপ্রাইজ ছাড়াও ঢাকাসহ সারাদেশের ১৭টি বিক্রয়কেন্দ্রে তিনি চামারা চাল সরবরাহ করেন। যেখানে বিক্রয়কেন্দ্র নেই, সেসব এলাকার ভোক্তাদের কাছে ন্যায্যমূল্যে চাল পাঠান কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে।

হাসান মেহেদী চামারা চালকে “ছোটলোকের মোটা চাল” বলে প্রচার করছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আজকাল অনেক মধ্যবিত্তরা পর্যন্ত দেশি মোটা চাল বা আঁশযুক্ত চালের ভাত খেতে অনীহা প্রকাশ করেন এবং দেখতে সুন্দর ও চিকন নাজিরশাইল বা মিনিকেট চালে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন।”

লাল চাল বিক্রির লভ্যাংশ ধানের বীজ সংরক্ষণের কাজে ব্যয় করেন বলে জানান এই উদ্যোক্তা।

ঢাকার মধ্যে চামারাসহ অন্যান্য দেশি আঁশযুক্ত লাল চাল পাওয়া যাচ্ছে মোহাম্মদপুরের “প্রাকৃতিক কৃষি বিপনন কেন্দ্র”, গ্রিন রোডের “শুদ্ধ কৃষি”, উত্তরার “ডেইলি ফুড শপ”, মিরপুরের “লালচাল ডট কম”, বারিধারার “বাঙলার ঐতিহ্য”, পুরান ঢাকায় “টং” এবং বেইলি রোডের “হাইজিন হারভেস্ট”-এর বিক্রয়কেন্দ্রে।

এছাড়া লাল চালের সন্ধান পাওয়া যাবে ঢাকার বাইরে বাগেরহাটের “বনবীথি”, সিলেটের “সিলেটি খানি”, চট্রগ্রামের “কৃষক ভাই” ও “কৃষি কাব্য”, পাবনার “দেশজ”, সিরাজগঞ্জের “স্বপ্নছোঁয়া”, রাজবাড়ীর “হালাল মার্ট”, এবং মানিকগঞ্জের “চাষবাস”-এর বিক্রয়কেন্দ্রে।

দেশি ধানের চাষ কমে যাচ্ছে

হাসান মেহেদী মনে করেন, দেশি-বিদেশি নানা সুবিধাবাদী চক্রের কারণে দেশি ধানের চাষ অনেকাংশে কমে গেছে। বিষয়টি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের কারণে মানুষ আজকাল বেশি অসুস্থ হচ্ছে, আর তাই “কোটি কোটি টাকার আয়রন ও ক্যালসিয়াম ট্যাবলেট বিক্রি হয়। অথচ আউশ চালে দুটিই পর্যাপ্ত পরিমাণে থাকে।”

অন্যদিকে, বিপুল অর্থ খরচ করে শুষ্ক মৌসুমে ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলন করে বোরো ধান চাষ করা হচ্ছে, যা পরিবেশের জন্যও ক্ষতিকর।

হাসান মেহেদী আরও বলেন, “জমিতে সেচের সাহায্যে উচ্চফলনশীল বোরো চাষের ফলে জলিধানের জমির পরিমাণ হ্রাস পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৪.৯ লাখ হেক্টর। বর্তমানে বাংলাদেশে ১৫.১ লাখ হেক্টর ধানিজমি বর্ষাকালে অনাবাদি থাকে।

“তাছাড়া রাসায়নিক সার, কীটনাশক ও হাইব্রিড বীজ বহুলভাবে ব্যবহারের ফলে এই দেশ ক্যান্সারের খনিতে রুপান্তরিত হচ্ছে। ভূ-গর্ভস্থ পানি ও মাটি দূষিত হচ্ছে নাইট্রাস, ক্যাডমিয়াম, আর্সেনিক, লেড, ক্রোমিয়ামের মতো ভারি ধাতুসহ নানান রাসায়নিকের দ্বারা। সেচনির্ভর বোরো ধান আবাদ করে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকহারে কমে যাচ্ছে।”

তিনি মনে করেন, ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য আউশ ও আমন ধান আবাদে ফিরতে হবে। ভূ-গর্ভস্থ পানি তুলে বোরো আবাদ বন্ধ করতে হবে তাহলেই শুধুমাত্র বংশ-পরম্পরায় ধানচাষ মুক্তি পাবে। নিজস্ব সংস্কৃতিতে না ফিরলে ভবিষ্যৎ হরপ্পা-মোহেনজোদারোর মতো হবে, বলে সতর্ক করেন তিনি।

   

About

Popular Links

x