Sunday, June 16, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

রোজা রাখা কি ডায়েটের চেয়ে বেশি উপকারী?

রোজার স্বাস্থ্যসম্মত ফলাফল পেতে হলে এখানেও দিতে হবে পরিমিত বোধের পরিচয়

আপডেট : ০৭ মার্চ ২০২৪, ০১:৫৮ পিএম

প্রতিদিনের আহারের একটি বিরাট অংশ ভূমিকা রাখে শরীরের স্বাভাবিক বিপাক প্রক্রিয়ায়। পরিমিত খাবার খেলে দেহের প্রয়োজনীয় পুষ্টির যোগান বজায় থাকে। তবে বয়সের ওপর ভিত্তি করে খাবার শারীরিক কাঠামোর ওপর ভিন্ন ধরনের প্রভাব ফেলে। 

এক্ষেত্রে শরীরের নির্দিষ্ট গড়ন ধরে রাখতে খাবারে তারতম্য আনা হয়। আর এখানেই প্রয়োজন ক্যালোরির হিসেব-নিকেষ; তথা ডায়েট চার্ট। কিন্তু দিনের একটি বড় অংশ টানা আহার থেকে বিরত থাকা তুলনামূলক বেশি স্বাস্থ্যসম্মত। চলুন, বিজ্ঞানের আলোকে জেনে নেওয়া যাক, কেন রোজা ডায়েট অপেক্ষা বেশি উপকারী।

ক্যালোরি খরচ বাড়ে, মেদ কমায়

শরীরে খাদ্য প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে রক্তে গ্লুকোজ বেড়ে যায়। ফলে বিপাকসহ দেহের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন কার্যকলাপে চিনির ভূমিকা বাড়ে। এটি শরীরকে হৃষ্ট-পুষ্ট করলেও শরীরে প্রয়োজনীয় শক্তি তৈরি হয় না। ঘণ্টাখানেক পর পর আহারেও এটি অব্যাহত থাকে তবে ধীরগতিতে। কিন্তু দিনে ১৩ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে খাবার গ্রহণ থেকে বিরত থাকা সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাপার। এ সময় শরীর যথেষ্ট পরিমাণে চর্বি পোড়াতে শুরু করে এবং কিটোন তৈরি করে, যা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

বিরতিহীন উপবাস শুরুর কয়েক দিনের মধ্যে এই প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায়। এ কারণে প্রতি ২৪ ঘণ্টায় তিন বেলা আহারকে ৮ ঘণ্টা দূরত্বে দুই বেলা আহার দিয়ে প্রতিস্থাপন করা প্রয়োজন। এতে ডায়েটের চেয়েও তুলনামূলক কম সময়ে মেদ কমে আসাটা দৃশ্যমান হবে।

ক্যালোরির হিসেব রাখার প্রয়োজন নেই

বিরতিহীন উপবাসের ক্ষেত্রে ক্যালোরি গণনা পেছনে মনোযোগ বা সময় ব্যয় করার প্রয়োজন নেই।

প্রতীকী ছবি/সংগৃহীত

শুধু তাই নয়, অক্ষরে অক্ষরে ডায়েট মেনে চলতে গিয়ে ব্যয়বহুল খাবার কেনার ধকল সামলাতে হয়। অন্যদিকে রোজার ক্ষেত্রে খাবারের ধরন নয়; খাবার খাওয়াই মূখ্য।

রোজা দীর্ঘমেয়াদে বয়স পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ

বয়স ৪০ পেরোনোর পর শরীরে ইনসুলিনের কার্যকর ব্যবহারে তারতম্য দেখা দেয়। তাই স্বাভাবিকভাবেই ২৫ বছর বয়সের ডায়েট এবং চল্লিশোর্ধ বয়সের ডায়েট এক রাখার উপায় নেই। এই ১৫ বছরের পার্থক্যে শরীরে খাদ্যকেন্দ্রিক বড় পরিবর্তন আসে। সেক্ষেত্রে ৪০ বছরের বেশি বয়সে সুঠাম শরীর পেতে প্রয়োজন সূক্ষ্ম হিসেব। আর রোজা যেকোনো বয়সের জন্যই উপযোগী।

বিশেষ করে ৪০ বছরের বেশি বয়সী নারীদের রোজা রাখা উচিত, কারণ এটি ক্রমবর্ধমান ইনসুলিন প্রতিরোধে সহায়তা করবে। ৪০-এর পরে উপবাস হরমোনের পরিবর্তনে সাহায্য করতে পারে। একই সঙ্গে ওজন কমানোর ক্ষেত্রেও এটি মোক্ষম হাতিয়ার।

ডায়েট করার চেয়ে রোজা রাখা সহজ

খাবারের ধরনের ভিত্তিতে বিভিন্ন খাদ্যের ব্যাপারে বিভিন্ন বয়সের মানুষের মানসিক অবস্থা থাকে বিভিন্ন রকম। সুস্বাস্থ্যের তাগিদে কৈশোরের প্রিয় খাবারটি যৌবনে এসে ত্যাগ করা যেতেই পারে। ২৪-২৫ বছর বয়সে বহু কষ্টে আয়ত্ত্বে আনা অপ্রিয় অথচ স্বাস্থ্যকর খাবারটি ৪০ বছর পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাওয়াটা দুষ্কর। ক্যালোরির হিসেবের জটিলতা বাদ দিলেও খাবারের তালিকাটি সময়ের সঙ্গে কঠিন বা বিরক্তিকর প্রতীয়মান হয়।

রোজার বিষয়টি এমন নয়। কারণ এখানে সুস্পষ্ট খাদ্য তালিকার বদলে রয়েছে খাদ্যাভ্যাস। অবশ্য দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকার কারণে ক্ষুধার কষ্ট এখানে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে সারাদিনে দুয়েকবার আহারের চেয়ে ঘণ্টাখানেক পর পর খাওয়া-দাওয়ায় শারীরিক বিড়ম্বনার আশঙ্কা বেশি থাকে।

এর বাইরেও রোজা অভ্যাসে পরিণত হলে কিটোনের মাত্রা বাড়তে থাকায় ক্ষুধা কমতে থাকে। ধীরে ধীরে এক সময় এটি ভরপেটের গ্যাস্ট্রিকসহ নানা সমস্যার ঝুঁকি কমায় এবং ভালোলাগার অনুভূতি এনে দেয়।

ডায়েটের মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা

একটি স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখার মূলমন্ত্র ক্যালোরি নিয়ন্ত্রণ- এমন বিশ্বাস দীর্ঘকাল ধরে চলে আসছে। এর পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই না করেই স্বাস্থ্য সচেতন প্রত্যেকেই এর পেছনে অনেক শক্তি ও সময় খরচ করেন। কিন্তু বিজ্ঞান এর পাশাপাশি আরও একটি বিষয়কে যুক্ত করে। সুস্থ শরীর ও মনের জন্য রক্তে শর্করার মাত্রা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।

প্রতীকী ছবি/সংগৃহীত

বার বার কম ক্যালোরির খাবার খেলে অবশ্যই চর্বি কমে এবং বিপাকীয় উন্নতি ঘটে। তবে এটি দীর্ঘমেয়াদে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল এনে দিতে পারে না।

মানবদেহ কোনো একদিকে ঘাটতি পেলে সময়ের সঙ্গে প্রয়োজন অনুযায়ী তার ভারসাম্য করে নিতে পারে। যখন দীর্ঘক্ষণের জন্য সীমিত ক্যালোরির খাবার খাওয়া হয়, তখন ক্ষুধা-তৃষ্ণা বাড়ে।

এ অবস্থায় মস্তিষ্ক নিয়মিত ক্যালোরি গণনার প্রবণতা হারায়।

হরমোনের ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য পেশীতে ভরের ভারসাম্য প্রয়োজন, যেটি বিপাকীয় সুস্বাস্থ্যের জন্যও দরকারি। কিন্তু দীর্ঘ পরিসরে ডায়েটে চর্বিহীন পেশীর ভর কমতে পারে। এমনকি এতে পুষ্টির ঘাটতিরও আশঙ্কা থাকে।

এছাড়া গভীরভাবে ভাবলে দেখা যায়, ক্যালোরি গণনা করাটা এক ধরনের মানসিক প্রশান্তি ছাড়া আর কিছুই নয়। বিশেষ করে দীর্ঘ সময়ের জন্য চিন্তা করলে এটি মানসিক অসুবিধাও বটে।

অন্যদিকে, রোজা স্বাস্থ্যকর ওজনের মাত্রা এবং সাধারণ সুস্থতা পরিচালনার একটি দারুণ উপায়। এটি জীবাণু প্রতিরোধ করে স্বাস্থ্যকর হজমের মাধ্যমে অন্ত্রের সামগ্রিক সুস্থতা দেয়। পরোক্ষভাবে এটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্রাম ও আরামদায়ক ঘুমের জন্যও উপকারী।

শেষাংশ

এই বৈজ্ঞানিক কারণগুলো রোজা রাখাকে ডায়েট করা অপেক্ষা বেশি গুরুত্ব দেয়। মূলত শুধুমাত্র কৈশোর আর যৌবনই নয়; জীবনের প্রতিটি পর্যায়েই সুস্থ শরীর কাম্য। তাই খাবার নিয়ে অঙ্ক কষার ঝামেলা এড়াতে রোজার প্রতি মনোনিবেশ করা যেতে পারে।

এককভাবে ক্যালোরি গণনার প্রতি গুরুত্বারোপ না করে রক্তে শর্করার ভারসাম্যের ব্যাপারেও সতর্ক থাকা জরুরি। তবে বিরামহীন আহার থেকে বিরত থাকার পর রোজা ভাঙার পর খাওয়া যেন মাত্রাতিরিক্ত না হয়ে যায়। রোজার স্বাস্থ্যসম্মত ফলাফল পেতে হলে এখানেও দিতে হবে পরিমিত বোধের পরিচয়।

About

Popular Links