Thursday, June 04, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

বন্যাদুর্গতদের কাছে সাহায্য পৌঁছে দেওয়ার কিছু উপায়

ব্যক্তি পর্যায় থেকে এই পদক্ষেপগুলো গ্রহণ সম্ভব হলে তা বৃহৎ পরিসরে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে

আপডেট : ২৩ আগস্ট ২০২৪, ০৪:৪০ পিএম

ভৌগলিক দিক থেকে নিম্নাঞ্চল ও মৌসুমি বৃষ্টিপাতের কারণে ফি বছর বন্যাপ্লাবিত হয়ে পড়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল। প্রতিবার দুর্যোগের সময় বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা এবং সম্পদের ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ আগের থেকে বহুগুণে বেড়ে যায়। এ অবস্থায় নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য, খাবার, ভিটে-বাড়ি হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়ে বন্যাদুর্গত মানুষগুলো। এ অবস্থায় তাদের সহায়তায় প্রত্যেকেরই নিজ নিজ সামর্থ্যানুযায়ী সক্রিয় অংশগ্রহণ জরুরি। তাই চলুন, বন্যাদুর্গতদের কাছে সাহায্য পৌঁছে দেওয়ার কার্যকর উপায়গুলোর ব্যাপারে বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক-

বন্যাদুর্গতদের সাহায্যে যে কার্যকর পদক্ষেপগুলো নেওয়া যেতে পারে

আকস্মিক বন্যায় দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ১৫টির বেশি জেলা বিপর্যস্ত/সংগৃহীত

  • স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে অংশ নেওয়া

একদম প্রান্তিক পর্যায়ে কাজ করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে মোক্ষম ভূমিকা রাখতে পারে স্বেচ্ছাসেবকরা। এই বিপর্যস্ত সময়ে দুর্যোগের প্রতিক্রিয়াস্বরূপ বিভিন্ন সেবামূলক কাজের চাপ থাকে অনেক বেশি। এগুলোর মধ্যে রয়েছে- যাতায়াতের অযোগ্য জায়গা থেকে মানুষকে উদ্ধার কাজ, অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপন এবং চিকিৎসা সেবা দেওয়া। এর সঙ্গে আরও রয়েছে খাদ্য, পানি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সরবরাহগুলো সুসংগঠিত এবং বিতরণ করা। এরকম চাপের মধ্যে আলোকবর্তিকা হয়ে আবির্ভূত হয় স্বেচ্ছাসেবকরা, যাদের মাধ্যমে সংস্থাগুলো অসহায় মানুষদের কাছে আরও বেশি সাহায্য পৌঁছাতে পারে।

এছাড়াও স্বেচ্ছাসেবীরা অবকাঠামো পুনর্নির্মাণের কাজেও সহায়তা করতে পারে। এছাড়াও বন্যা থেকে বেঁচে যাওয়া লোকদের মানসিক সমর্থন এবং মনোবল বাড়াতেও স্বেচ্ছাসেবীদের যথেষ্ট করণীয় রয়েছে।

  • জরুরি সামগ্রী সরবরাহ

বন্যা পরবর্তী পরিস্থিতিতে অপুষ্টি ও ডিহাইড্রেশন স্বাভাবিক বিষয়। এগুলো প্রতিরোধে সাহায্য করতে পারে অপচনশীল খাদ্য সামগ্রী ও বিশুদ্ধ খাবার পানি বিতরণ।

কাটা-ছেঁড়া বা জখমের চিকিৎসা এবং রোগের প্রাদুর্ভাব রোধ করার জন্য ফার্স্ট এইড কিট, ওষুধ এবং স্বাস্থ্যবিধি পণ্যগুলো অতীব জরুরি। এই সরবরাহগুলো অবশ্যই স্কুল-কলেজ বা স্থানীয় বহুতল ভবনগুলোর মতো অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে পৌঁছানো উচিত। মূলত তাৎক্ষণিক ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত এই স্থাপনাগুলোতে আশ্রিতদের প্রত্যেকের চাহিদা পূরণের জন্য সরবরাহগুলো সুসংগঠিত বিতরণ আবশ্যক।

স্থানীয় সংস্থা বা এলাকার সংগঠনগুলোর সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে এই কার্যক্রমগুলো পরিচালনা করা উচিত। এতে করে যাদের সবচেয়ে বেশি সাহায্য প্রয়োজন সর্বপ্রথম তাদের কাছে পৌঁছানোর সম্ভাবনা বাড়বে।

  • তাৎক্ষণিক উদ্ধার অভিযান

বন্যায় আটকে পড়া লোকদের উদ্ধারে যেহেতু পানি পেরিয়েই যেতে হয়, তাই এখানে সাধারণত নৌকাই বেশি ব্যবহৃত হয়। এই নৌকাগুলোর মাধ্যমে উদ্ধারকারীরা জলমগ্ন রাস্তা পেরিয়ে ভাসমান লোকদের কাছে পৌঁছাতে পারে। তবে দ্রুত পৌঁছাতে এবং কম সময়ে বেশি সংখ্যক এলাকার লোকদের উদ্ধার কাজে স্পিডবোট ব্যবহার করা উচিত। যাতায়াতের একদম অযোগ্য স্থানগুলোর ক্ষেত্রে সর্বোত্তম উপায় হচ্ছে হেলিকপ্টার। এর মাধ্যমে বিপজ্জনক জায়গা থেকে অনায়াসেই অসহায় মানুষদের তুলে নেওয়া যেতে পারে।

চট্টগ্রামে প্লাবিত বসত বাড়ি/ঢাকা ট্রিবিউন

  • প্রাণিসম্পদ উদ্ধার ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা

গ্রামাঞ্চলের অধিকাংশ পরিবারেরই জীবন-জীবিকার প্রধান উপায় হচ্ছে গবাদিপশু। বন্যার সময়ে এই প্রাণীসম্পদের ক্ষতি পরিবারগুলোর খাদ্য নিরাপত্তা ও আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই এই গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের রক্ষার্থে অর্থায়ন কিংবা প্রাণীগুলোর উদ্ধার কাজে সরাসরি যোগদান করা উচিত।

এরই ধারাবাহিকতায় পশুর খাদ্য, পশুচিকিৎসা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পরিষেবার প্রসঙ্গও আছে। কেননা এর ওপর বন্যা পরবর্তীতে তাদের সুস্বাস্থ্যের বিষয়টি নির্ভর করছে। এমনকি অল্প কিছু আর্থিক অনুদানও পরিবারগুলোর স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে পাওয়ার ক্ষেত্রে অনেক সাহায্যে আসতে পারে।

  • প্রসিদ্ধ এনজিওগুলোতে অর্থ দান

দেশব্যাপী বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা বিভিন্ন দুর্যোগে ব্যাপক পরিসরে ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। তারা দীর্ঘ সময় ধরে অভিজ্ঞতার সঙ্গে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসা সেবার মতো প্রয়োজনীয় সামগ্রী বিতরণ করে আসছে। এমনকি তারা অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র ও স্যানিটেশন অবকাঠামোও স্থাপন করে থাকে।

এই কার্যক্রমগুলোর সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণ ছাড়া শুধুমাত্র অর্থদানও করা যেতে পারে। এই অর্থ সংস্থাগুলোর জরুরি দ্রব্য, ওষুধ ক্রয় ও পরিবহন, স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় সাধন এবং জরুরি সহায়তা দানকারী দল গঠনে সাহায্য করতে পারেন। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় দ্রুত পৌঁছানো, তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদী উভয় ধরনের প্রয়োজন মেটানো নিশ্চিত করতে এই সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

  • ক্ষতিকারক পোকামাকড় এবং সাপ নির্মূল অভিযান

প্লাবনকালে বেড়ে যায় মশা ও অন্যান্য ক্ষতিকর কীটপতঙ্গের উপদ্রব। আর এর রেশ ধরে পরবর্তীতে বাড়তে থাকে ডেঙ্গু জ্বর এবং ম্যালেরিয়ার মতো রোগের ঝুঁকি। এমতাবস্থায় মশার ফাঁদ, মশা তাড়ানোর উপকরণ এবং রোগ-ব্যাধি সম্পর্কে দরকারি শিক্ষা উপকরণ স্বাস্থ্য ঝুঁকিগুলো উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে। 

এছাড়াও, বিষধর সাপের উপস্থিতি বন্যাগ্রস্ত অসহায় মানুষদের আরও একটি হুমকি। বিশেষ করে বাস্তুচ্যুত ও ভাসমান জনগোষ্ঠীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে থাকে। তাই এমন একটি নিবেদিত দল থাকা প্রয়োজন যাদের উদ্দেশ্যই হবে সাপ খুঁজে বের করে তা নিধন করা। একই সঙ্গে এরা জনসাধারণকে সাপবিরোধী বাধা স্থাপন এবং সাপে কাটার প্রাথমিক চিকিৎসাও শেখাবে।

কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলায় দুই লাখের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে/ঢাকা ট্রিবিউন

  • গণসচেতনতা সৃষ্টি

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও এলাকাভিত্তিক মাইকিংয়ের মতো অফলাইন পদ্ধতিগুলোর মাধ্যমে বৃহৎ পরিসরে বন্যাকালীন জরুরী প্রয়োজনগুলো প্রচার করা যায়। এখানে বিশেষ করে বিশুদ্ধ পানির অভাব, চিকিৎসা সরবরাহ, বা অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র-এর বিষয়গুলোর উপর গুরুত্বারোপ করা উচিত। এর ফলে বিভিন্ন সংস্থানগুলোর পাশাপাশি ব্যক্তি পর্যায় থেকেও দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের অবস্থা সৃষ্টি হবে।

সচেতনতামূলক প্রচারাভিযানগুলো অনুদান এবং স্বেচ্ছাসেবী কাজকেও উৎসাহিত করতে পারে। সেই সাথে বিশ্বব্যাপী সংহতি বোধের অনুকূলে সরকার ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোও সাহায্যে এগিয়ে আসতে পারে। এই গণসচেতনতার পরিপ্রেক্ষিতে নিকট ভবিষ্যতে দুর্যোগের বিষয়ে এমনকি উপযোগী নীতি নির্ধারণের দিকে ধাবিত হওয়ারও সম্ভাবনা থাকে।

  • বন্যার পানি অপসারণ এবং পরিচ্ছন্নতা অভিযান

স্থলভাগে জলাবদ্ধতা দূর করতে এলাকাভিত্তিক দ্রুত পানি নিষ্কাশনের জন্য উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন পানির পাম্প বসানো যেতে পারে। এই পাম্প কলেরা এবং আমাশয়ের মতো পানিবাহিত রোগের বিস্তার রোধে সহায়তা করে। এছাড়া নানা ধরণের জীবাণু প্রতিরোধে এই পানি নিষ্কাশনের পাশাপাশি এলাকার প্রতিটির বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখাও অপরিহার্য।

  • স্বাস্থ্য এবং স্যানিটেশনে অর্থ সহায়তা

বন্যার পানি খাবার ও ব্যবহার্য পানির উৎসের সঙ্গে মিশে সেগুলো দূষিত করে। তাই পোর্টেবল টয়লেট এবং পানি বিশুদ্ধকরণ ব্যবস্থা গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। বন্যাগ্রস্ত অঞ্চলগুলোর প্রতিটিতে এমন স্যানিটেশন বসাতে প্রয়োজন অর্থের। আর এখানে অর্থ সহায়তার মাধ্যমে বন্যার্তদের পাশে দাঁড়ানো যায়।

অর্থদানের আরও একটি খাত হচ্ছে মোবাইল হেলথ ক্লিনিকগুলো। এগুলো সাধারণ চিকিৎসা ও টিকাদানের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক সেবা দিয়ে থাকে। এছাড়া সঠিক স্বাস্থ্যবিধি অনুশীলনের প্রসার ঘটানোর জন্য স্বাস্থ্য শিক্ষা কার্যক্রমগুলো অর্থ অনুদানের একটি উপযুক্ত মাধ্যম।

  • তহবিল সংগ্রহের কর্মসূচিগুলোতে অংশগ্রহণ

দাতব্য সংগঠনগুলোর তহবিল সংগ্রহের কর্মসূচিগুলো তহবিল বাড়ানোর পাশাপাশি দুর্যোগ সংকট সম্পর্কে সচেতনতাও বাড়ায়। তহবিলের অর্থ কাজে লাগানো হয় ত্রাণ সামগ্রী কেনা, ব্যবস্থাপনা এবং বিতরণে।

শুধু তাই নয়, এই ইভেন্টগুলো সংঘবদ্ধ পদক্ষেপের প্রসার ঘটায়, যেখানে প্রতিটি ব্যক্তি তার নিজ নিজ জায়গা থেকে সামর্থ্য অনুযায়ী অবদান রাখেন। এই সংস্থাগুলো ছোট পরিসরে অনেক মফস্বল ও গ্রামাঞ্চলেও দেখা যায়। বন্যার্ত অঞ্চলে আগে থেকেই এরকম সংগঠন থাকলে সেখানে তাৎক্ষণিকভাবে সক্রিয় হতে পারেন।

তাছাড়া শহরে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় এবং ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোতে দুর্যোগ পীড়িতদের জন্য তহবিল সংগ্রহের কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়ে থাকে।

  • পরিবেশ পুনরুদ্ধার অভিযান

ভূমি ক্ষয়, গাছপালা ধ্বংস এবং পানির উৎস বিনষ্টের মতো পরিবেশ দূষণগুলো সার্বিক দিক থেকে পরিবেশকে মানুষের বসবাসের অনুপযোগী করে তোলে। এর সঙ্গে সেই পরিবেশের মাঝে থাকা মানুষের স্বাস্থ্যের নিরাপত্তার বিষয়টিও জড়িত। তাই প্রাকৃতিক বাসস্থান পুনরুদ্ধার মানে মানুষের জীবনযাত্রায় স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনা। এই সংস্কারমূলক কার্যক্রমে ক্ষয়-ক্ষতি অনেকাংশে পুষিয়ে নেয়ার সম্ভব হয়। পাশাপাশি দীর্ঘ মেয়াদে এই প্রতিষ্ঠিত পরিকল্পনার বাস্তবায়নের মাধ্যমে আসন্ন বন্যার মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত থাকা যায়।

সারসংক্ষেপ

ব্যক্তি পর্যায় থেকে বন্যাদুর্গত মানুষকে সহায়তার এই পদক্ষেপগুলো গ্রহণ সম্ভব হলে তা বৃহৎ পরিসরে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে স্বেচ্ছাসেবী প্রচেষ্টা, জরুরি সামগ্রী সরবরাহ, অসহায় মানুষ ও প্রাণীসম্পদ উদ্ধার এমনকি স্বল্প পরিমাণে অর্থের অনুদানও ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে।

এছাড়াও, ক্ষতিকর পোকামাকড় নিধন ও পরিচ্ছন্নতা অভিযানের মাধ্যমে পরিবেশ পুনরুদ্ধারে সচেষ্ট হলে বন্যা পরবর্তী হুমকি থেকে মুক্তি মিলবে। একই সঙ্গে এই সম্মিলিত প্রচেষ্টাগুলোকে আরও ফলপ্রসূ করে তুলতে পারে গণসচেতনতা সৃষ্টি।

   

About

Popular Links

x