Friday, June 05, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

মিথ বনাম বাস্তবতা: যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ পুরুষের ব্যক্তিত্বের জন্য অবমাননাকর

শারীরিক ও মানসিক যত্নের পাশাপাশি পুরুষের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যের যত্নের প্রয়োজনীয়তাও স্বাস্থ্য ব্যতীত ভিন্ন কিছু নয়

আপডেট : ১৭ অক্টোবর ২০২৪, ০২:৫৪ পিএম

জীবন পরিক্রমার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় প্রজনন, যা নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য ও পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। আমাদের সমাজ-সংস্কৃতি ও প্রচলিত ভাবধারণার প্রভাবে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যের (SRHR) বিষয়টি সাধারণত দৃষ্টির আড়ালেই থেকে যায়। তার ওপর অধিকাংশ পুরুষ একে শুধু নারীদের বিষয় মনে করে এতে আরও অনধিকার চর্চা করতে চান না। উল্টো, লজ্জা ও প্রচলিত পুরুষতান্ত্রিক শক্তিশালী ভাবমূর্তির চাপে এ নিয়ে কথা বলাকে একপ্রকার “অ-পুরুষোচিত” কিংবা পুরুষের জন্য অমর্যাদাকর  হিসেবে গণ্য করা হয়। কিন্তু সব পুরুষ মাত্রই মানুষ, এবং কোনো মানুষই দৈহিক, মানসিক ও জৈবিক চাহিদার উর্ধ্বে নয়। শারীরিক ও মানসিক যত্নের পাশাপাশি পুরুষের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যের যত্নের প্রয়োজনীয়তাও স্বাস্থ্য ব্যতীত ভিন্ন কিছু নয়। সুতরাং, প্রজনন স্বাস্থ্যের অধিকার, সেবা ও যত্ন- কোনোটিই পুরুষদের ব্যতিরেকে হতে পারেনা।

পুরুষতান্ত্রিকতার গোলকধাঁধা

আপাতদৃষ্টিতে পুরুষতান্ত্রিকতার সাথে যৌন স্বাস্থ্য সংযুক্তির বিষয়টি অসংগতিপূর্ণ মনে হলেও আদতে এটিই সত্য এবং সবচেয়ে মুখ্য ভূমিকা পালনকারী একটি নিয়ামক। যৌন স্বাস্থ্যে পুরুষতান্ত্রিকতার প্রাসঙ্গিকতা এবং এর যৌক্তিকতা এ পর্যন্ত নানা গবেষণায় উঠে এসেছে। যেমন, বিশেষজ্ঞদের মতে; পুরুষতান্ত্রিক আদর্শের কারণে পুরুষদের মধ্যে যে আচরণগত কাঠামো দেখা যায়, তা বিভিন্ন যৌন রোগ ও স্বাস্থ্য সমস্যার সাথে সরাসরি সম্পর্কিত, যেমন এইচআইভি।এর কারণও খুব স্পষ্ট। আমাদের সমাজব্যবস্থায় হাজার বছর ধরে প্রচলিত এবং প্রোথিত শক্তিশালী পুরুষ মূর্তি। পুরুষতান্ত্রিকতার সামষ্টিক অবচেতনে “ম্যাসকুলিনিটি” বা “পৌরুষ”-এর যে প্রথাগত ভাবমূর্তি রয়েছে, তা বরাবরই বেশ কঠোর, শক্তির প্রতীক, আবেগহীন। এই ভাবমূর্তি সম্পূর্ণ ভুল না হলেও জীবনের এক পর্যায়ে ত্রুটিপূর্ণ হয়ে ওঠে যদি পুরুষ ভাবার আগে তাদের মানুষ ভাবা না হয়। দেখা যায়, এই কঠোর ভাবমূর্তি বজায় রাখার চাপে তাদের সংবেদনশীলতা, দুর্বলতা এবং তাদের চরিত্রের কোমল দিকগুলো আলোচনার বাইরে থেকে যায় বা এগুলো প্রদর্শনে ব্যাপকভাবে অনুৎসাহিত করা হয়। অর্থাৎ, যা কিছুই নারীর বিপরীত, তা মাত্রই পুরুষ এবং যা-ই নারীসুলভ কিংবা নারী সম্পর্কিত, তা মাত্রই পুরুষের ইস্পাত কঠিন ব্যক্তিত্বের সাথে সাংঘর্ষিক। ফলে নিজেকে সামাজিকভাবে স্বীকৃত “পুরুষ” সংজ্ঞার ছাঁচে ফেলতে গিয়ে তাদের সেই মানবিক ও সংবেদনশীল দিকগুলো দমিয়ে রাখতে অভ্যস্ত হতে হয়। আর যেহেতু বহুকাল ধরে প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কিত বিষয়গুলো নারীকেন্দ্রিক বিষয় হিসেবেই কেবল দেখা হয়, তাই পুরুষরা স্বভাবতই এসবের ব্যাপারে কথা বলতে লজ্জা ও কুণ্ঠাবোধ করেন।

অতঃপর ভোগান্তি…

তবে প্রশ্ন হচ্ছে, একটি ঐতিহ্যের ধারক নিয়মতন্ত্রের চাপ কেনোই-বা কারো যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ক অতি গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞানের প্রয়োজনীয়তা ও উপকারিতার চেয়ে বেশি হবে? আদৌ কি এটি কোনো মঙ্গল বয়ে আনে? মঙ্গল বয়ে না আনলেও দুর্ভোগ ঠিকই বয়ে আনে। কেবল অবহেলার কারণেই বিভিন্ন যৌনরোগের ফলে পুরুষরা গড়ে ৫ মিলিয়ন বছর আয়ু হারাচ্ছে। আবার প্রজনন স্বাস্থ্য যে শুধু মাতৃস্বাস্থ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ তা নয়। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, বিশ্বব্যাপী সন্তানহীনতার অর্ধেক সমস্যা পুরুষের বন্ধ্যাত্বের কারণে হতে পারে। ইউএস সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) এর অনুমান মতে বিশ্বের প্রায় ১০% পুরুষ বন্ধ্যা। প্রোস্টেট ক্যান্সার, পুরুষদের মধ্যে বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে বেশি আক্রান্তকারী ক্যান্সার প্রায়শই চল্লিশোর্ধ পুরুষদের মধ্যে দেখা যায়। অন্যদিকে, টেস্টিকুলার ক্যান্সার ২০-৩৫ বছর বয়সী অল্প বয়স্ক পুরুষদের মধ্যে বেশি প্রচলিত। অনেক সময় দেখা যায়, এই সমস্যাগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নিরাময়যোগ্য হয় যদি তার প্রাথমিক পর্যায়ে সময়মতো যৌক্তিক চিকিৎসা নেওয়া হয়। এই জায়গায়ই যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য অধিকার নিয়ে জানার গুরুত্বটা চলে আসে। পুরুষের প্রজনন ক্যান্সারে বেঁচে থাকার হার সাধারণত ৯৫%, তবে মূল শর্ত হল দ্রুততম এবং প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তকরণ এবং চিকিৎসা। সুতরাং পুরুষদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে জানার, নিজের অধিকার গুলো বোঝার ও সময়মতো পরিষেবা গ্রহণের অপরিহার্যতার অন্ত নেই। বরং প্রথাগত চিন্তার বেড়াজালে যখন তারা তাদের অধিকার ও সমস্যা নিয়ে সোচ্চার হতে পারে না, সেটা তাদের ভোগান্তিকে আরও বাড়িয়ে তোলে।

নেই প্রচারণা, নেই সহযোগিতা

এ কথা অনস্বীকার্য যে অনেক পুরুষই এখন যৌন স্বাস্থ্য নিয়ে আগের চেয়ে অনেক সচেতন এবং প্রথাগত চিন্তা থেকে বেড়িয়ে এসে এসব ব্যাপারে খোলাখুলি আলোচনা করছেন, নিজের স্বাস্থ্যসেবার অধিকার বুঝে নিচ্ছেন এবং পরিষেবাগুলো গ্রহণ করছেন। তবে দীর্ঘকাল ধরে গেঁড়ে বসা পুরুষতান্ত্রিকতার অচলায়তন ভেঙ্গে সামগ্রিকভাবে খুব কম পুরুষই এখন পর্যন্ত এই ছাঁচ থেকে বের হয়ে আসতে  পেরেছেন। ফলে পুরুষ সমাজের সিংহভাগ জনগোষ্ঠী এখনো এসব নিয়ে নিজের মাঝেই এক ধরনের দ্বৈরথের মুখোমুখি হন। তবে এটিও মনে রাখা জরুরি যে, এই মানসিক দ্বৈরথের দ্বায় শুধু পুরুষের একার নয়। যে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা সামগ্রিকভাবে পুরুষের জন্য এই ট্যাবু তৈরি করেছে এবং বাঁচিয়ে রেখেছে, তাদের সবার। বেশিরভাগ জাতীয় নীতিমালা এবং উন্নয়ন কার্যক্রম পুরুষদের এসআরএইচআরকে অন্তর্ভুক্ত করেনা। পাঠ্যক্রমে নারীদের মতো পুরুষদের এসআরএইচআর নিয়ে বিশদ আলোচনা হয় না। ফলে যথাযথ উদ্যোগ, সচেতনতা ও প্রয়াসের অভাবে নিজের শরীরও এর সুস্থতা সম্বন্ধীয় পরিষ্কার ধারণার ঘাটতি পুরুষদের মাঝে থেকে যায়।

প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম

আলোচনায় আনা হয় না দেখেই পুরুষদের এসআরএইচআর সমাজে এখনো ট্যাবু হয়ে আছে। যত বেশি আলোচিত হবে, তত বেশি এ বিষয়ে কুসংস্কার কাটবে। কৈশোরকাল থেকে যদি বয়সভিত্তিক আলোচনার অভ্যাস গড়া তোলা যায়, তবেই একটি ট্যাবুমুক্ত সচেতন প্রজন্ম তৈরির সম্ভবনা রয়েছে। আবার, অপ্রাতিষ্ঠানিক আলোচনার বাইরে স্কুলের বইয়ে এসব নিয়ে আলোচনা বেশ অপ্রতুল ও সীমাবদ্ধ। সেক্ষেত্রে, সামাজিক সংবেদনশীলতা ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট অনুযায়ী প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক আলাপচারিতায় এর অন্তর্ভুক্তির চেষ্টা করা যায়। তাত্ত্বিক শিক্ষার বাইরেও, প্রাত্যহিক জীবনে এর প্রচার ও প্রস্তুতি নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। সেইসাথে তৃণমূল পর্যায়ে নারীদের পাশাপাশি পুরুষদের জন্য এই সচেতনতা ও সেবা পৌঁছে দিতে কাজ করতে হবে। বিশ্বায়নের যুগে সচেতনতা সৃষ্টিতে ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি করে প্রচারণা করা একটি অত্যন্ত কার্যকর, যুগোপযোগী এবং গোপনীয়তা রক্ষাকারী মাধ্যম হতে পারে।

"ইউথ পলিসি ফোরাম ও অধিকার এখানে, এখনই" প্রকল্পের যৌথ প্রয়াসের মিথবাস্টার সিরিজের এটি দ্বিতীয় পর্ব। এই প্রকল্প নিয়ে আরও জানতে ভিজিট করুন www.ypfbd.org।
এই সিরিজে প্রকাশিত কোনো বক্তব্যের জন্য ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।
   

About

Popular Links

x