চীনের উত্তর অঞ্চলে হিউম্যান মেটানিউমোভাইরাস বা এইচএমপিভি ভাইরাস আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ায় বিশ্বজুড়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এশিয়াসহ বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশে ইতোমধ্যে এইচএমপিভি সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে।
তবে জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা বলছেন, এইচএমপিভি নতুন কোনো ভাইরাস নয়। তাদের ধারণা, অনেক আগে থেকেই এ ভাইরাসের অস্তিত্ব ছিল পৃথিবীতে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন সিডিসি বলছে, ২০০১ সালে নেদারল্যান্ডসে প্রথম এই ভাইরাস শনাক্ত হয়।
এদিকে বাংলাদেশ সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক তাহমিনা শিরীন জানিয়েছেন, এইচএমপিভি ভাইরাসটিতে প্রতিবছরই বাংলাদেশে দু-চারজন রোগী আক্রান্ত হচ্ছেন। এ বছরও দেশে একজন এইচএমপিভি আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছেন।
এর আগে তিনি জানিয়েছিলেন, ২০১৭ সালে বাংলাদেশে এই ভাইরাসের উপস্থিতি প্রথম শনাক্ত হয়। সর্বশেষ ২০২৩ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে দুজনের শরীরে এটি শনাক্ত হয়।
জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুই বা তার বেশি মানুষের মধ্যে সরাসরি সংযোগের মাধ্যমে এই ভাইরাস ছড়ায়। এছাড়া সংক্রমিত স্থান স্পর্শ করলে তা থেকেও ভাইরাসটি ছড়ানোর ঝুঁকি থাকে।
করোনাভাইরাস মোকাবিলায় যেসব সতর্কতা নেওয়া হয়েছিল, একই ধরনের পদক্ষেপে এইচএমপিভি ভাইরাস প্রতিরোধ করা সম্ভব মত বেশিরভাগ বিশেষজ্ঞের। তাই এক্ষেত্রে বাইরে গেলেই মাস্ক পরার প্রতি জোর দিচ্ছেন জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা।
শুধু ভাইরাস থেকে বাঁচতে নয়, শীতের সময়ে হাঁচি, কাশি, জ্বর, ফ্লু এড়াতে মাস্ক ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকেরা।
বাজারে নানা ধরনের মাস্ক পাওয়া যায়। কোনোটি কাপড়ের, কোনোটি আবার তিন স্তরের। অনেকের মনেই প্রশ্ন সংক্রমণ ঠেকাতে কোন মাস্ক বেশি কার্যকরী?
চিকিৎসকরা বলছেন, শ্বাসজনিত সংক্রমণ এইচএমপিভি ঠেকাতে কাপড়ের মাস্ক ন্যূনতম সুরক্ষা দিতে পারে। কাশি, হাঁচির সময় নির্গত বায়ুবাহিত কণা বড় হলে সেটি কাপড়ের মাস্ক ঠেকাতে পারে, তবে সূক্ষ্ম কণা নয়।
অসুস্থ ব্যক্তির হাঁচি, কাশির সময় নির্গত সূক্ষ্ম কণা প্রতিরোধের জন্য সার্জিক্যাল মাস্ক কার্যকর। তবে সবচেয়ে ভাল সুরক্ষা কবজ হতে পারে “এন নাইনটি ফাইভ”। বায়ুবাহিত ভাইরাস ও কণা ৯৫% পর্যন্ত আটকে দিতে পারে মাস্কটি। অত্যন্ত জনবহুল স্থানে যেতে হলে বা অসুস্থ ব্যক্তির কাছাকাছি যেতে হলে এই ধরনের মাস্ক উপযুক্ত।
মাস্ক পরার নিয়ম
মাস্ক শুধু পরলেই হবে না, তা মুখে ঠিকমতো বসছে কি-না সেটিও দেখা দরকার। কাপড়ের মাস্ক হোক বা সার্জিক্যাল মাস্ক কিংবা এন নাইনটি ফাইভ হোক; নাক এবং মুখগহ্বর দুটোই যেন ঢাকা থাকে সেটি নিশ্চিত করতে হবে।
মাস্ক খুব বেশি শক্ত হয়ে নাকে, মুখে বসলে শ্বাস নিতে কষ্ট হবে। তাই এটি যেমন আলগা হবে না, তেমনই খুব চেপে যেন না বসে সেটিও খেয়াল রাখতে হবে। সার্জিক্যাল মাস্ক পরার পর মুখের দু’পাশে ফাঁক থাকলে সেখান দিয়েও ভাইরাস হানা দিতে পারে।
চিকিৎসক বলছেন, বাড়তি সুরক্ষার জন্য এন নাইনটি ফাইভ পরা যেতে পারে, তা না পেলে সার্জিক্যাল মাস্ক পরতে হবে। তবে তার ওপরে কাপড়ের মাস্ক পরার প্রয়োজন নেই।
মাস্কের ব্যবহারবিধি
ধুলো, ধোঁয়া, রোগ সংক্রমণের হাত থেকে বাঁচতে মাস্ক ব্যবহার করলেও, পরিচ্ছন্নতা ভীষণ জরুরি। চিকিৎসকেরা সতর্ক করছেন, বার বার মাস্কে হাত দিলে, অপরিচ্ছন্ন মাস্ক দিনের পর দিন ব্যবহার করলে হিতে বিপরীত হতে পারে। মাস্ক ধরলে তারপর হাত সাবান দিয়ে ধোয়া বা স্যানটাইজ়ার ব্যবহার করা জরুরি। পাশাপাশি, ব্যবহারের পর মাস্ক যেখানে-সেখানে ছুড়ে ফেললে হবে না। প্লাস্টিক বা কাগজে মুড়ে ময়লা ফেলার নির্দিষ্ট জায়গায় তা ফেলতে হবে।
এইচএমপিভি থেকে বাঁচতে আরও যা করবেন
- ২০ সেকেন্ড ধরে সাবান-পানি দিয়ে ঘন ঘন হাত ধোয়া
- হাত দিয়ে নাক-মুখ স্পর্শ না করা
- আক্রান্তদের থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা। জনসমাগমস্থল এড়িয়ে চলা
- হাঁচি কাশি দেওয়ার সময় মুখ টিস্যু দিয়ে ঢেকে নেওয়া এবং ব্যবহৃত টিস্যুটি সঙ্গে সঙ্গে মুখবন্ধ করা ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে হাত সাবান পানিতে ধুয়ে ফেলা
- যদি টিস্যু না থাকে তাহলে কনুই ভাঁজ করে সেখানে মুখ গুঁজে হাঁচি দেওয়া
- রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে পুষ্টিকর খাবার খাওয়া। পাশাপাশি পর্যাপ্ত পানি ও শ্বাসপ্রশ্বাসের ব্যায়াম করা
- সর্দিকাশি, জ্বর হলেও অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া।



