যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য হিসেবে বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করেছেন ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত আইনপ্রণেতা রাশিদা তালিব। এই নিয়ে টানা পঞ্চমবারের মতো (পঞ্চম মেয়াদে) মার্কিন নিম্নকক্ষের সদস্য নির্বাচিত হয়ে এক অনন্য নজির গড়লেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) প্রকাশিত নির্বাচনী ফলাফলে দেখা যায়, ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী হিসেবে রাশিদা মিশিগানের ১২তম কংগ্রেসীয় আসন থেকে প্রতিদ্বন্দিতা করে ৭২ শতাংশেরও বেশি ভোট পেয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী জেমস হুপার পেয়েছেন মাত্র ২৪ শতাংশের কিছু বেশি ভোট।
ইতিহাসের পাতায় একমাত্র ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত মার্কিন কংগ্রেস সদস্য রাশিদা তালিব মার্কিন আইনসভায় ফিলিস্তিনিদের অধিকারের পক্ষে সবচেয়ে সোচ্চার কণ্ঠস্বর হিসেবে পরিচিত। গাজায় ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপ ও গণহত্যার কড়া সমালোচনা করে সহকর্মীদের তোপের মুখে পড়লেও নিজের রাজনৈতিক অবস্থান থেকে কখনো পিছপা হননি তিনি।
১৯৭৬ সালের ২৪ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের ডেট্রয়েট শহরের এক দরিদ্র ও খেটে খাওয়া অভিবাসী ফিলিস্তিনি পরিবারে রাশিদার জন্ম। ১৪ ভাই-বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। তাঁর বাবা পূর্ব জেরুজালেম এবং মা ফিলিস্তিনের একটি ছোট্ট শহর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। মা-বাবা দুজনই ফোর্ড মোটর কোম্পানির কারখানায় কাজ করতেন। শৈশবে দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে বড় হওয়া রাশিদা বাড়িতে আরবি ভাষায় কথা বলতেন; ইংরেজি ছিল তাঁর দ্বিতীয় ভাষা।
পরিবারের প্রথম সদস্য হিসেবে হাইস্কুলের পাঠ চুকিয়ে ১৯৯৮ সালে ওয়েইন স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতক এবং ২০০৪ সালে ওয়েস্টার্ন মিশিগান ইউনিভার্সিটি থেকে আইন বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করেন রাশিদা।
আইন শিক্ষা শেষে ডিয়ারবর্নে ‘আরব কমিউনিটি সেন্টার ফর ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল সার্ভিসেস’ (অ্যাকসেস)-এ যোগ দিয়ে আরব ও কর্মজীবী শ্রেণির মানুষের অধিকার আদায়ে কাজ শুরু করেন রাশিদা। শৈশবে মুসলিম পরিচয়ের কারণে মাকে হিজাব পরা নিয়ে হেনস্তার শিকার হতে দেখা এবং নিজ সম্প্রদায়ের ওপর হওয়া বৈষম্য তাঁকে মানবাধিকার রক্ষার কাজে উদ্বুদ্ধ করে।
২০১৬ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিবাসনবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে রিপাবলিকানদের নির্বাচনী সভায় প্রকাশ্যে প্রতিবাদ জানিয়ে নজরে আসেন তিনি। পরবর্তীতে ২০১৮ সালে নির্বাচিত হয়ে কংগ্রেসে প্রবেশ করা প্রথম দুই মুসলিম নারীর একজন হিসেবে (অপরজন ইলহান ওমর) ইতিহাস গড়েন রাশিদা।
নিজের দুই ছেলের মুসলিম পরিচয় অক্ষুণ্ন রাখা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর লক্ষ্যেই রাজনীতিতে আসার সিদ্ধান্ত নেন জানিয়ে এক সাক্ষাৎকারে রাশিদা বলেছিলেন, “ইতিহাস তৈরির জন্য আমি ভোটে দাঁড়াইনি; দাঁড়িয়েছি অবিচারের বিরুদ্ধে কথা বলতে এবং আমাদের সন্তানদের অধিকারের কথা স্মরণ করিয়ে দিতে।”
২০১৯ সালে কংগ্রেস সদস্য হিসেবে শপথগ্রহণের সময় ঐতিহাসিক রেকর্ড গড়ে ১৭৩৪ সালের কোরআনের অনুবাদিত অনুলিপিতে হাত রাখেন রাশিদা। পরনে ছিল ঐতিহ্যবাহী ফিলিস্তিনি পোশাক ‘থোব’। স্বাধীনচেতা ও আপসহীন এই নারী আইনপ্রণেতা এবারও মিশিগানের ১২তম আসনে বড় ব্যবধানে বিজয়ী হয়ে নিজ যোগ্যতার প্রমাণ দিলেন।



