সুদানে যুদ্ধের কারণে হাতেগোনা কিছু হাসপাতাল ছাড়া প্রায় সব নাগরিক সেবাই বন্ধ। যেগুলো খোলা আছে, তাদের সেবা দেওয়ার পুরোপুরি সামর্থ্য নেই। ফলে এক দুঃসহ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন দেশটির নাগরিকরা। সবচেয়ে বেশি বিপদে আছেন প্রসূতি ও অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন আছে এমন মানুষেরা। এ পরিবেশের মধ্যেই সম্প্রতি হাসপাতালে মোবাইল ফোনের আলোতে এক প্রসূতির সিজারিয়ান অপারেশন করেছেন দেশটির একদল চিকিৎসক। জন্ম নিয়েছে ফুটফুটে এক শিশু।
এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি।
চিকিৎসক দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন প্রসূতি বিশেষজ্ঞ ডা. হাওয়াইদা আহমেদ আল-হাসান। তিনি বলেন,“ সিজারিয়ান অপারেশনের সময় বিদ্যুৎ ছিল না। ওই সময় আমরা মোবাইল ফোনের আলোতেই কাজ চালিয়ে যাই ও সফল হই।”
ওই সিজারিয়ান অপারেশনের একটি ভিডিও ধারণ করেছেন এ চিকিৎসক।
ভিডিওতে দেখা যায়, গ্লাভস হাতে ওই চিকিৎসক প্রসূতির বুকে ও পেটে চাপ দিচ্ছেন। তার সঙ্গে উপস্থিত অন্যরা যার যার মোবাইলে আলো জ্বালিয়ে প্রসূতির দিকে ধরে রেখেছেন। সেই আলোতেই ডা. হাসান অপারেশন চালিয়ে যাচ্ছেন।
এপ্রিলে সুদানের রাজধানী খার্তুমে সংঘাত শুরুর পরে যে কয়জন অল্প সংখ্যক চিকিৎসক এখনও সেবা দেওয়া চালিয়ে যাচ্ছেন তারমধ্যে একজন ডা. হাসান।
বিবিসির কাছে তিনি ওই অপারেশনের ভিডিওটি পাঠিয়েছেন। যেখানে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও তাদের সেবাদান পরিচালনার এক দৃশ্য উঠে এসেছে।
ডা. হাওয়াইদা আহমেদ আল-হাসান বলেন, “পরিস্থিতি সত্যিই খারাপ। আমরা দিনের পর দিন হাসপাতালে রয়েছি। আমরা সময় জানি না। দিন না রাত আমরা জানি না।”
হাসপাতালে অল্প কয়েকজন মেডিকেল স্টাফ রয়েছে। বিদ্যুৎ থাকে না। জেনারেটর চালানোর জন্য আমাদের কাছে পেট্রোল নেই, যোগ করেন তিনি।
ঝুঁকি নিয়েই অপারেশন
যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেই অনেক প্রসূতির চিকিৎসা প্রয়োজন। হাসপাতালের প্রসূতি বিভাগে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেই। তবুও আমরা নিয়মিত সেবা দিয়ে যাচ্ছি।
এই অপারেশনটি করার সময় বিদ্যুৎ ছিল না। কিন্তু সেটি দ্রুত শেষ করার প্রয়োজন ছিল। ফলে এভাবেই অপারেশন চালিয়ে যাই।
তিনি বলেন, “পরিস্থিতি এতোটা খারাপ ছিল যে সাধারণ অ্যানেস্থেশিয়া ও বিশেষজ্ঞের অনুপস্থিতিতেই সেটি করতে হয়েছে।”
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) অনুসারে, খার্তুমের প্রতি ছয়টি হাসপাতালের মধ্যে মাত্র একটি সম্পূর্ণ ক্ষমতায় কাজ করছে।
জাতিসংঘ জনসংখ্যা সংস্থা বলছে, যুদ্ধের কারণে দেশটিতে ২১৯,০০০ জন গর্ভবতী নারী ঝুঁকিতে রয়েছেন।
যুদ্ধ শুরুর পরপরই সংস্থাটি জানিয়েছিল, পরের সপ্তাহগুলোতে সেখানে অন্তত ২৪,০০০ নারীর সন্তান জন্মদানের সম্ভাবনা রয়েছে।
বাশায়ের আল-ফাদিল ছিলেন সেই নারীদের একজন। খার্তুমে সংঘর্ষ শুরু হওয়ার মাত্র কয়েকদিন পর তার সিজারিয়ান অপারেশন হয়।
মোবাইল ফোনের আলোতে জন্ম নেওয়া শিশু ওমায়মা/সংগৃহীতবিবিসি সম্প্রতি তার সঙ্গে ভিডিও কলে যুক্ত হয়। ওই সময় তাকে নিজের এক সপ্তাহ বয়সী শিশুকন্যা ওমায়মাকে কোলে তুলে আদর করতে দেখা যায়।
সদ্য মা হওয়া বাশায়ের আল-ফাদিল বলেন, “এলাকার বেশিরভাগ হাসপাতাল বন্ধ ছিল। এই সংকটের মধ্যে একটি হাসপাতাল খোলা পেয়ে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে হচ্ছিল। সেখানেই ভর্তি হই। তখনও সেখানে রাস্তা থেকে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যাচ্ছিল।”
তিনি বলেন, “আমি এমন কোনো হাসপাতালে খোঁজার চেষ্টা করছিলাম যেটা আমাকে সিজারিয়ানের জন্য ভর্তি করবে। আমি ভাগ্যবান ছিলাম আমার ডাক্তার এবং বন্ধুদের সাহায্যে হাসপাতালটি খুঁজে পেয়েছি।”
প্রসবের দিনের কথা স্মরণ করে ফাদিল বলেন, “তাকে এবং তার স্বামীকে বন্দুকযুদ্ধের মধ্য দিয়ে চলতে হচ্ছিল।”
তিনি বলেন, “আমি কঠিন পরিস্থিতিতে জন্ম দিয়েছি। এমনকি পানির মতো সহজ জিনিসও পাওয়া যায়নি। সন্তান জন্মের পরেও সহিংসতা চলতে থাকার কারণে আমি আমার সন্তানের প্রয়োজনীয় টিকা ও সনদ পাইনি।”
শুধু ফাদিলের অভিজ্ঞতা এমন তা নয়। তার মতো আরও বহু নারীকে একইভাবে দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। এমনকি অনেকের গর্ভপাত হয়েছে।
এক সপ্তাহ বয়সী শিশুকন্যা ওমায়মাকে কোলে তুলে আদর করছে বাবা-মা/সংগৃহীতসংঘর্ষ শুরু হওয়ার কয়েকদিন পর বন্ধ হয়ে যায় সুদানের অন্যতম বড় হাসপাতাল ওমদুরমান ম্যাটারনিটি হাসপাতাল।
সেখানকার একজন কনসালটেন্ট গাইনোকোলজিস্ট ডা. কামিল কামাল বিবিসিকে বলেছেন, “সুদানের বেশিরভাগ প্রসূতি হাসপাতাল এখন পরিষেবার বাইরে। ফলে হাজার হাজার গর্ভবতী নারী বিপজ্জনক জটিলতার মুখোমুখি হয়েছেন।”
“যদিও কোনো সরকারি পরিসংখ্যান নেই, আমরা অনুমান করি বিপুল সংখ্যক গর্ভবতী নারী তাদের বাড়িতে [ব্যথায়] চিৎকার করতে থাকে,” যোগ করেন তিনি।
তিনি বলেন, “আমি নিশ্চিত অনেকে বাড়িতে মারা যাচ্ছে। রক্তক্ষরণ, গর্ভপাতসহ নানা অসুস্থতায় অনেকেই চিকিৎসার সুযোগ পাচ্ছে না।”
এই চিকিৎসকের মতে, “যুদ্ধের বড় মূল্য চোকাচ্ছে সুদানের গর্ভবতী নারীরা।”
সংঘাত শুরু হওয়ার আগেও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, সুদানে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মাতৃমৃত্যু ছিল।
আমরা জীবন বাঁচাতে যাই, তারা আমাদের হত্যা করে
সুদানের এই পরিস্থিতির মধ্যে গর্ভবতী নারীদের সুরক্ষায় বড় ভূমিকা পালন করছেন ধাত্রীরা। তবে চরম অনিরাপত্তায় ভুগছেন তারা।
মাওয়াহেব নামে এক ধাত্রী বলেন, “যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে তিনি প্রায় সাতজন নারীকে নিরাপদভাবে প্রসব করতে সাহায্য করেছেন।”
তিনি বলেন, “অনেকেই কল দিয়ে জানতে চান আমি তাদের প্রসূতিকে সহায়তা করতে পারবো কি না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমি রাজি হয়ে তার বাড়িতে যাওয়ার জন্য রাজি হই। কারণ পরিস্থিতি খুব খারাপ।”
মাওয়াহেব বলেন, “বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক প্রসব হচ্ছে। কোনো সমস্যা বা জটিলতা থাকলে আমি ওই নারীকে আশপাশের হাসপাতালে পাঠাই। কিন্তু আমাদের কাজ করতে হচ্ছে ঝুঁকি নিয়ে। তারা অবিচারে মানুষ হত্যা করছে।”
হাসপাতালে চ্যালেঞ্জ থাকা সত্বেও প্রসূতি বিশেষজ্ঞ ডা. হাসান বলেছেন, “চিকিৎসা কর্মীরা শিশু জন্ম দেওয়াকে ভীষণ প্রাপ্তি মনে করে। তাই এভাবেই কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।”
তিনি বলেন, “আমরা জীবন তৈরি করি, তারা আমাদের হত্যা করে। আমরা দুটি আত্মাকে বেঁচে থাকতে সাহায্য করি - একজন মা এবং একটি শিশু।”



