দেশে প্রতি বছর ৩০ লাখ মেট্রিক টন ই-বর্জ্য তৈরি হয়। এর মধ্যে ১০.৫ কেজি টন স্মার্ট ডিভাইস থেকে; ১.৭ লাখ টন নষ্ট টেলিভিশন থেকে; ২৫ লাখ টনের বেশি জাহাজ ভাঙা শিল্প থেকে ই-বজ্র তৈরি হচ্ছে। প্রতি বছরই এটি ৩০% করে বাড়ছে।
এভাবে চলতে থাকলে ২০২৫ সাল নাগাদ কোটি টনের ই-বর্জ্যের ভাগাড়ে পরিণত হবে বাংলাদেশ। তাই সংকট সমাধানে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাসহ রিফার্বিশ ইলেকট্রনিক্স পণ্য আমদানি বন্ধে আইনি কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
শনিবার (৩ মে) বিকেলে রাজধানীর প্যানপ্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ে বাংলাদেশ আইসিটি জর্নালিস্ট ফোরামের (বিআইজএফ) এক গোলটেবিল আলোচনায় এই অভিমত ব্যক্ত করেন বিশেষজ্ঞরা।
“ই-বর্জ্যের কার্বণ ঝুঁকিতে বাংলাদেশ: কারণ ও উত্তরণের পথ” শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় মূল উপস্থাপনা তুলে ধরেন কানাডিয়ান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার প্রকৌশল ও বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. সৈয়দ আখতার হোসেন।
তিনি বলেন, “ই-বর্জ্য থেকে লেড (সীসা), মার্কারি ও ক্যাডমিয়ামের মতো বিভিন্ন ক্ষতিকর পদার্থ মানব শরীরে প্রবেশ করছে। কিন্তু ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে আমরা শিক্ষার কোন ব্যবস্থা করতে পারিনি। প্রাথমিকভাবে আগামী ১৪ অক্টোবর থেকে ‘ই বর্জ্য দিবস' উদযাপনের দাবি জানাচ্ছি যেন সারা বিশ্ব জানে যে, আমরাও এ বিষয়ে কাজ করছি।”
ই বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করা যায় উল্লেখ করে বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক রওশন মমতাজ বলেন, “ইলেকট্রনিক পণ্য ব্যবহারের পর সেটা ই বর্জ্যে পরিণত হয় বলে আমি মানতে চাই না। আমি এগুলোকে সম্পদ হিসেবে দেখি। ইলেকট্রনিক পণ্যে স্বর্ণের মতো পুনরায় ব্যবহারযোগ্য (রিসাইক্লিং) অনেক মূল্যবান ধাতু থাকে। কিন্তু আমাদের দেশে সেগুলো থাকে না, বাইরে চলে যায়। আমরা দেখেছি জাপান অলিম্পিকের গোল্ড মেডেলে ইলেকট্রনিক পণ্য থেকে প্রাপ্ত স্বর্ণ ব্যবহার করা হয়েছে। কাজেই আমাদের দেশে এ ধরনের যে ডিভাইসগুলো থাকে সেগুলোকে বাইরে না পাঠিয়ে দেশেই রিসাইক্লিং প্ল্যান্ট তৈরি করা উচিত। এ বিষয়ে বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ এগিয়ে আসতে পারে।”
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রেজাউল করিম বলেন, “সময়ের সঙ্গে আমরা স্মার্ট বাংলাদেশের দিকে যাচ্ছি। এই পথচলায় ইলেকট্রনিক ডিভাইসগুলোকে চাইলেও বাদ দিতে পারব না। যে কোনো বর্জ্যই স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এই বর্জ্য মোকাবিলায় আমাদের সমন্বিত প্রচেষ্টা থাকতে হবে। তবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় একটি সংস্থাকে সুনির্দিষ্টভাবে দায়িত্ব নিতে হবে। আমি মনে করি এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর কাজ করতে পারবে। ই-বর্জ্য হলেও সেগুলো পরিবেশের প্রতি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তাই পরিবেশ অধিদপ্তর চাইলে যথাযথ আইন প্রয়োগ করতে পারে। এ ক্ষেত্রে তাদের আলাদা লোকবল প্রয়োজন হলে সেটা দেওয়া যেয়ে পারে।”
অধ্যাপক লাফিফা জামাল বলেন, “আজকের ইলেকট্রনিক্স পণ্যেই আগামী দিনের ই-বর্জ্য। ল্যাপটপ-কম্পিউটারের চেয়ে কি-বোর্ড, মাউস থেকে ই-বজ্য বেশি হচ্ছে। তাই এগুলো কোথায় ফেলতে হবে তা নির্ধারণ করতে হবে। ২০২২ সালের ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিধিমালা অনুযয়ী, এসব পণ্য যারা উৎপাদন করবেন তাদেরই ফিরিয়ে নেয়ার বিধান থাকলেও তা প্রতিপালিত হচ্ছে না। তাই এ বিষয়ে সচেতনতা গড়ে তোলা দরকার।”
ডিএনসিআরপি উপ-পরিচালক মঞ্জুর মোহাম্মাদ শাহরিয়ার বলেন, “ব্যাটারিচালিত গাড়ি থেকে দেশে ভয়াবহমাত্রায় সিসা ছড়াচ্ছে। তাই সবার আগে উৎপাদকদের দায়বদ্ধতার মধে্য আনতে হবে। এ বিষয়ে নীতি নির্ধারকদের চাপের মুখে রাখতে বিআইজেএফ সমাজের আয়না হিসেবে পরিচিত গণমাধ্যম কর্মীদের নিয়ে চাপ সৃষ্টি করতে হবে।”
র্যাবের আইন ও মিডিয়া শাখার পরিচালক খন্দকার আলী মঈন খন্দকার আল মঈন বলেন, “সব স্টেক হোল্ডারদের সমন্বিত উদ্যোগ নিলে ই-বর্জ্য ঝুঁকি কমানো সম্ভব। তবে এক্ষেত্রে জনসচেতনতার বিকল্প নেই। দেশে ব্যাগেজ পণ্যের চাহিদা রয়েছে। আমরা আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। কিন্তু দেখা যাচ্ছে একই ব্যক্তিকে চার বারও আটক করার পর তিনি একই ব্যবসা করছেন। আপনারা তথ্য দিলেই তদন্ত করে এই অভিযান অব্যাহত রাখবো।”
স্মার্ট টেকনোলজিস (বিডি) লিমিটেড ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম বলেন, “ই-বর্জ্যকে ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ই-রিসোর্স এ রূপান্তর ব্যবসায়িক ভায়াবল না। আমাদের ইন্টারনাল ই-ওয়েস্ট ব্যবস্থাপনা নিয়ে ভাবছি। তখন বাইরের দেশ থেকে ই-বর্জ্য বাংলাদেশে ডাম্পিং করা হচ্ছে। পাকিস্তান ভিত্তিক কিছু ব্যবসায়ী বাংলাদেশের কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এই কাজ করছে। প্রতি মাসে ১৫-১২ হাজার রিফারবিশ ল্যাপটপ বাজারে ঢুকছে। এতে করে সরকার ৩০-৩১ কোটি টাকার মতো রাজস্ব পেতো।”
স্বাগত বক্তব্যে ই-বর্জ্যের ক্ষতিকর দিক তুলে ধরার পাশাপাশি ভবিষ্যত প্রজন্মকে এর ভয়াবহতা থেকে রক্ষায় বিআইজেএফ”র নেওয়া এই উদ্যোগ আগামীতে আরও জোরদার করা হবে বলে জানান বিআইজেএফ সভাপতি নাজনীন নাহার।
গোলটেবিল বৈঠকে সার্ক সিসআই”র নির্বাহী সদস্য শাফকাত হায়দারের সঞ্চালনায় অন্যান্যদের মধ্যে আরও বক্তব্য দেন- বিটিআরসির স্পেকট্রাম বিভাগের উপ-পরিচালক প্রকৌশলী মো. মাহফুজুল আলম, পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন, র্যাব-এর আইন ও মিডিয়া শাখার পরিচালক খন্দকার আলী মঈন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কেন্দ্রীয় ডিজিটাল কমার্স সেলের উপসচিব সাঈদ আলী, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের (ডিএনসিআরপি) উপ-পরিচালক (ঢাকা বিভাগ) মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার, বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদের সিইআরএম পরিচালক রওশন মমতাজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রোবোটিক্স অ্যান্ড মেকাট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. লাফিফা জামাল।
এছাড়া আলোচনায় অংশ নিয়ে ই-বর্জ্য নিয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেন বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির সাবেক সভাপতি শহীদ উল মুনির, গ্লোবাল ব্র্যান্ড প্রাইভেট লিমিটেড চেয়ারম্যান আব্দুল ফাত্তাহ, স্মার্ট টেকনোলজিস (বিডি) লিমিটেড ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম, জেআর রিসাইক্লিং/সলিউশন ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ হোসেন জুয়েল, এইচপি বাংলাদেশ বিজনেস ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজার (ভোক্তা পিএস) কৌশিক জানা, আসুস বাংলাদেশ এর কান্ট্রি প্রোডাক্ট ম্যানেজার আসাদুর রহমান সাকি, লেনোভো ভারত এর আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক (বাণিজ্যিক ব্যবসা) সুমন রায়, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার নাজমুস সালেহীন, ইউসিসির হেড অব সেলস শাহীন মেল্লা, স্মার্ট টেকনোলজিসের সেলস ডিরেক্টর মুহাহিদ আল বেরুনী সুজন।



