Thursday, June 04, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দক্ষ গ্র্যাজুয়েট তৈরি করতে ব্যর্থ হচ্ছে কেন?

`সমস্যাটি আমরা যতটা ভাবছি তার থেকেও অনেক বেশি মারাত্মক'

আপডেট : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ০২:৫৩ পিএম

বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়। সরকারি, বেসরকারি এবং জাতীয়। যদিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং বুয়েটকে বাংলাদেশের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে বিবেচনা করা হলেও ২০২১ সালের কিউএস বিশ্ব বিশ্ববিদ্যালয় র‌্যাঙ্কিংয়ে সামান্যই   উন্নতি করেছে প্রতিষ্ঠান দুটি।

গত বছরের মতোই উভয় বিশ্ববিদ্যালয়কে ৮০১-১০০ রেঞ্জের মধ্যে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছিল। গবেষণা, উচ্চ শিক্ষা এবং কর্পোরেট চাকরির ক্ষেত্রে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকরা (গ্রাজুয়েট) সরকারি ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকদের তুলনায় এগিয়ে থাকলেও শুধুমাত্র এটিই কি যথেষ্ট? এখানে সমস্যা কোথায়? কেন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দক্ষ স্নাতক তৈরি করতে ব্যর্থ হচ্ছে?

ত্রুটিপূর্ণ নিয়োগ ব্যবস্থা

সরকারি (পাবলিক) বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের পদ্ধতি সাম্প্রতিক সময়ে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া বেশ কিছু আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক ত্রুটিতে জর্জরিত। উদাহরণস্বরূপ- রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে নিয়োগ। এটি হতাশাজনক যে, শিক্ষক নিয়োগের জন্য বিশাল ও বিস্তৃত নিয়ম অনুপস্থিত। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, সিন্ডিকেট বোর্ডের মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া ঠিক করার সুযোগ এখনও রয়েছে।

অন্যদিকে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়-অধিভুক্ত কলেজগুলোতে শিক্ষক নিয়োগ করা হয় বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন দ্বারা পরিচালিত “বিসিএস পরীক্ষা” নামে একটি কঠোর পদ্ধতির মাধ্যমে। অথচ, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো সুনির্দিষ্ট নিয়োগ ব্যবস্থা অনুপস্থিত। তার বদলে, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে সহকারী অধ্যাপক পদে নিয়োগের জন্য পিএইচডি ডিগ্রি সম্পন্ন করতে হয়। তবে কেউ জাতীয় এবং সরকারি উভয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি না করেও তার চাকরির মেয়াদ ব্যবহার করে অধ্যাপক হতে পারেন।

অপর্যাপ্ত লাইব্রেরি সুবিধা

একাডেমিক অধ্যয়নের জন্য ব্যবহার করার পরিবর্তে, শিক্ষার্থীরা চাকরির ইন্টারভিউয়ের প্রস্তুতি নিতে লাইব্রেরি ব্যবহার করেন। বর্তমান শিক্ষা এবং নিয়োগ ব্যবস্থার মধ্যে সামঞ্জস্যের অভাব এই দুর্দশার জন্য প্রাথমিকভাবে দায়ী। চাকরির বাজারে একাডেমিক অধ্যয়ন অনেক ক্ষেত্রেই কোনো কাজে আসছে না।

এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, লাইব্রেরি ব্যবহারকারীরা সেখানের সুবিধা নিয়ে হতাশ। পর্যাপ্ত বই পাওয়া যায় না, ই-লাইব্রেরি পরিষেবা নিষ্ক্রিয়, শিক্ষার্থীদের ইডিইউ (.edu) মেল বা বিশিষ্ট জার্নালগুলোতে অ্যাক্সেস না থাকা ইত্যাদি নানা অসুবিধা তাদের সহ্য করতে হয়। এভাবে কীভাবে শিক্ষার্থীরা প্রাসঙ্গিক প্রকাশনা করতে সক্ষম হবেন?

বাড়ছে বিসিএস’র প্রতি আগ্রহ বাড়ছে

ছয় বছরেরও কম সময়ে, বিসিএস পরীক্ষায় আবেদনের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে। ৩৫তম বিসিএস-এ ২ লাখ ৪৪ হাজার আবেদনকারী থাকলেও থেকে ৪১তম বিসিএস-এ আবেদনের সংখ্যা রেকর্ড হারে বেড়ে ৪ লাখ ৭৫ হাজারে পৌঁছেছে। এই সংখ্যা ক্রমবর্ধমান হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। শিক্ষায় সীমিত সরকারি বিনিয়োগের সঙ্গে, স্নাতকরা গবেষণা চালিয়ে যাওয়া বা তাদের নিজস্ব ব্যবসা শুরু করার চেয়ে সরকারি চাকরি পেতে বেশি আগ্রহী।

দৃশ্যতই, আমাদের শিক্ষকরা তাদের শিক্ষার্থীদের শিক্ষাবিদ হতে বা বেসরকারি/উন্নয়ন সেক্টরে ক্যারিয়ার গড়তে বা তাদের উচ্চতর পড়াশোনা করতে অনুপ্রাণিত করতে ব্যর্থ হয়েছেন। তাই বলা যায়, বর্তমান পরিস্থিতি বেশ উদ্বেগজনক।

শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কের জটিলতা

সম্প্রতি সিরাজগঞ্জের রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের হাতে ১৪ শিক্ষার্থীর চুল কেটে ফেলার ঘটনা এবং কুয়েটের এক শিক্ষকের মৃত্যু এখন ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক নিয়ে আমাদের নতুন করে ভাবার সুযোগ দিয়েছে। ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের বেশির ভাগই এখন অস্বস্তি, অবিশ্বাসের এবং আরও স্পষ্ট করে বললে, প্রতিপক্ষের মতো।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক বিভাগেই ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতি রয়েছে। এ ধরনের রাজনীতি সাধারণত রাজনৈতিক দলকে কেন্দ্র করে হয় না; বরং শিক্ষক এবং তাদের নিজস্ব আন্তঃ-অফিসকে কেন্দ্র করে হয়। ফলে অনেক শিক্ষার্থী এখন এ ধরনের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ছে। শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য ভালো ফলাফল অর্জন করা, যেখানে শিক্ষকদের লক্ষ্য প্রতিপক্ষকে বিরক্ত করার জন্য শিক্ষার্থীদের মোতায়েন করা। শিক্ষার্থীরা যেই শিক্ষকদের প্রতি অনুগত বা যেই শিক্ষকের রাজনীতির অংশ, তাদের সঙ্গে একরকম আচরণ এবং অন্য শিক্ষকদের সঙ্গে অবমাননাকর বা অন্যরকম আচরণ করছে।

গবেষণা সংস্কৃতির অনুপস্থিতি

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক বা শিক্ষার্থীর গবেষণার পর্যাপ্ত সুযোগ নেই। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রাথমিক প্রশিক্ষণ, বিভাগীয় পরীক্ষা এবং সিনিয়র স্কেল পরীক্ষার মাধ্যমে পদোন্নতি দেওয়া হয়। এম ফিল, পিএইচডি, পোস্ট ডক্টরেট, জার্নাল প্রকাশনা তাদের পদোন্নতিতে কোনো গুরুত্ব বহন করে না। ফলে তারা গবেষণায় অনাগ্রহী।

তাহলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কী হবে? তারা কি প্রকৃত অর্থে গবেষণা করছেন? ইউজিসি-এর বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯ সালে ৪৬টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে, ১৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা কোনো ধরনের গবেষণা করছেন না। এমনকি ২৪টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এম.ফিল বা পিএইচডি গবেষণার সুযোগ নেই। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা কোনো গবেষণা না করেই কাজ করেন বা পদোন্নতি পান অথবা টাকা দিয়ে জার্নালে লেখা প্রকাশ করেন।

অন্যদিকে, ইউজিসি-এর ৪৭তম বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণায় সবচেয়ে বেশি ব্যয় করেছে, ৬ কোটি টাকার বেশি। অন্যদিকে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ব্র্যাক ২০২০ সালে গবেষণায় সবচেয়ে বেশি (৫৫ কোটি টাকার বেশি) ব্যয় করেছে।

তাহলে বলা যায়, বাংলাদেশের গবেষণা সংস্কৃতির ভবিষ্যৎ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের হাতে।

মানসম্মত শিক্ষার অভাব

বিবিএসের শ্রমশক্তি জরিপ অনুসারে, আমাদের দেশে শিক্ষিত লোকদের মধ্যে বেকারত্বের হার বেশি (৪৮%)। বিপরীতে, আমাদের দেশে যোগ্য প্রার্থীর অভাবের কারণে অনেক কোম্পানি বিদেশ থেকে কর্মী নিয়োগ করছে। ফলস্বরূপ, সরকারি, বেসরকারি এবং জাতীয় প্রতিষ্ঠানের সরবরাহিত শিক্ষার মান সন্দেহের মুখে পড়ছে।

ইউজিসি উদ্বেগ প্রকাশ করে  জানিয়েছে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষার চেয়ে ব্যবসাকে প্রাধান্য দেওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষার ক্ষতি হতে পারে।

যদিও প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি অ্যাক্ট ২০১০ কিছুদিন আগেই প্রণীত হয়েছিল তবু, হাতে গোনা কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ই তা মেনে চলে। সাম্প্রতিক গবেষণা অনুসারে, ব্র্যাকের মতো কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় তাদের শিক্ষার মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করেছে।

বিআইডিএস-এর একটি সমীক্ষা অনুসারে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়-অধিভুক্ত কলেজ থেকে স্নাতক করা ছাত্রদের ৬৬% বা দুই-তৃতীয়াংশই বেকার। ইউজিসিও এসব কলেজের শিক্ষার মান নিয়ে অসন্তুষ্ট। ফলস্বরূপ, টানা তিন বছর ধরে তাদের সাম্প্রতিকতম বার্ষিক প্রতিবেদনে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকদের মান অপর্যাপ্ত বলা হয়েছ।

এ ক্ষেত্রে নিয়মিত ক্লাস কার্যক্রমের অভাব, শিক্ষক সংকট, প্রশিক্ষিত ও যোগ্য শিক্ষকের অভাব এবং শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের অভাবসহ বেশ কয়েকটি অসুবিধা পাওয়া গেছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকদের বেশিরভাগই পিএইচডি/মাস্টার্স করতে বিদেশে যাওয়ার কথা খুব কমই ভাবেন।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে, শিক্ষকতার মতো একটি মহৎ পেশাকে একটি জাগতিক পেশা হিসেবে দেখা হয়। আমার নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক আমাকে একবার বলেছিলেন, “আমি তোমাদের (শিক্ষার্থীদের) সম্পর্কে চিন্তা করি না, আমি একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, আমি আমার কর্মজীবন সম্পন্ন করেছি। আমার এখন কিছুই দরকার নেই।” 

যখন শিক্ষকরা শিক্ষকতা পেশাকে নিছক সরকারি চাকরি মনে করেন, তখন শিক্ষার্থীদের কথা তারা ভাববেন কী করে? তারা কিভাবে তাদের গাইড করবে? তারা কোনোভাবে তাদের ক্যারিয়ারের অগ্রগতির ওপর জোর তো দেনই না বরং অনেক শিক্ষক বলেন, “তোমরা (শিক্ষার্থীরা) ভবিষ্যতে মুদি ছাড়া আর কিছুই হতে পারবে না।”

জাতির ভবিষ্যৎ যাদের উপর নির্ভর করে তাদেরকে অনুপ্রাণিত করার কী চমৎকার পদ্ধতি!

উল্লিখিত সমস্যাগুলো আমাদের বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করেছে। আমাদের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে রাজনীতিকরণ করা উচিত নয়, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সম্পর্ক প্রতিযোগিতামূলক না হয়ে সহজ করতে হবে এবং সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত লাইব্রেরি সুবিধা প্রয়োজন। সবশেষে, সরকারকে অবশ্যই গবেষণার জন্য আরও অর্থ ব্যয় করতে হবে এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা ভিত্তিক সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করতে হবে।


মো. ওবায়দুল্লাহ এবং মো. সোহরাব হোসেন রাজধানীর সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড সোশ্যাল রিসার্চ-এর গবেষণা সহকারী।



   

About

Popular Links

x