Friday, June 05, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

পেট্রোডলার নকশার কাতার বিশ্বকাপ

প্রশ্ন আসে কোন আফিমে বুঁদ হয়ে আমরা আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল হল্লা করি? যেখানে আসলে চলছে টাকার খেলা, ক্ষমতার খেলা, বন্দিত্বের দীর্ঘ মেয়াদ আর নতুন বিশ্ব অর্থনীতির মেরুকরণ

আপডেট : ২৮ নভেম্বর ২০২২, ০৪:৪৮ পিএম

তেল-গ্যাসে ধনী দেশ কাতার। দেশটিতে আয়োজিত চলমান বিশ্বকাপ নিয়েও চলছে একের পর তেলেসমাতি। সমালোচনা হচ্ছে বহু কিছু নিয়ে। আগের যেকোনো বিশ্বকাপের সঙ্গে এর তুলনা চলে না। মাঠের খেলার চেয়ে আড়ালের “খেলাই” যেন এ বিশ্বকাপের প্রধান বৈশিষ্ট্য।

বিশ্ব ফুটবল দূরে থাক, এশিয়াতেও কাতার কোনো ফুটবল পরাশক্তি নয়। দেশটির ফুটবলে একমাত্র সাফল্য বলতে গ্রাহ্য হয় ২০১৯ সালের এশিয়া কাপ জেতা। তাও দেশের মাটিতে। দলটি একাধিকবার ফিফার তোপে পড়েছে ভিনদেশি খেলোয়াড় দিয়ে টিম সাজানোর কারণে। 

এমনকি এবারের বিশ্বকাপের প্রাথমিক ২৬ জনের দলে বিদেশি ফুটবলার আছেন ১০ জন। অনেকে মনে করেন, আয়োজক না হলে বিশ্বকাপের মতো আসরে খেলার যোগ্যতা নেই কাতারের।

আর এই যে বিশ্বকাপের আয়োজক হওয়া, এ নিয়ে অভিযোগ আর বিতর্কের শেষ নেই। অভিযোগ উঠেছে, আয়োজক হওয়ার জন্য দুর্নীতির আশ্রয় নেওয়ার। তদন্ত চলেছে ঘুষ লেনদেন নিয়ে। প্রমাণ মিলেছে বিশ্বকাপের বিশাল সব অবকাঠামো নির্মাণে অভিবাসী শ্রমিকদের বিপুল মৃত্যুর খবরের। মানবাধিকার লঙ্ঘন ব্যাপক কাণ্ড নিয়ে আইএলও এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতো সংস্থার আপত্তি গায়ে মাখেনি কাতার। 

খেলা চলাকালীন সময়েও অভিযোগ এড়াতে পারেনি দেশটি।


আরও পড়ুন- আয়োজক হয়েও যেসব কারণে সবার আগে ছিটকে গেল কাতার


নিউইয়র্ক টাইমসের তথ্যমতে, এখনও সহস্রাধিক শ্রমিক বিশ্বকাপ ভেন্যুগুলোতে আছেন। আর তারা এখনও মজুরি পাননি।

তবে কি কাতারের পয়সার অভাব? পরিসংখ্যান তা বলে না। বরং দেখা যাচ্ছে অতীতের সকল রেকর্ড ভেঙে বিশ্বকাপ আয়োজনের জন্য দেশটি বিনিয়োগ করেছে প্রায় ৩০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। 

অর্থনীতিবিদদের ভবিষ্যৎ দেখার চোখে এ খরচ তুলেও আনতে যাচ্ছে কাতার। দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনে এবার যুক্ত হবে আগের চেয়ে প্রায় ১৮০ বিলিয়ন ডলার।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ফুটবলের দিকে এমন তোড়জোড় প্রথম শনাক্ত করা যায় এ দশকের প্রায় শুরুর দিকে। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ, লা লিগা ও ফ্রেঞ্চ লিগের মতো আসরে দল কিংবা দলের শেয়ার কিনতে আরব শেখরা তখন থেকে মরিয়া।


আরও পড়ুন- কাতার বিশ্বকাপ ফ্যান ভিলেজের কাছে অগ্নিকাণ্ড


জীবিত কিংবদন্তি লিওনেল মেসিকে পর্যন্ত কাতারের প্রতিষ্ঠানের জার্সি পরিহিত অবস্থায় আমাদের দেখতে হয়েছে। পেট্রোডলার মূলত এক্ষেত্রে ট্রোজান হর্সের কাজ করেছে। দুর্গের ভেতরে কৌশলে ঢুকে প্রাসাদ পতন ঘটিয়েছে। এর চূড়ান্ত প্রকাশ বা ফল আমরা দেখতে পাচ্ছি কাতার বিশ্বকাপে। 

কাতার, সৌদি আরব ও ইউনাইটেড আরব আমিরাত যৌথভাবে এ তৎপরতায় ছিল। যে দেশগুলো মূলত এক পরিবারকেন্দ্রিক, চরম মাত্রায় কর্তৃত্ববাদী জননিপীড়ক শাসন ব্যবস্থা ও জগাখিচুড়ি ধরনের শরিয়া আইনের জন্য পরিচিত।

এবারের বিশ্বকাপ আয়োজনে সৌদির নতুন মূলনায়ক বাদশা সালমানের উপস্থিতি কারও চোখ এড়ায়নি। ঘোরতর পুঁজির দাপটের সঙ্গে এই মধ্যপ্রাচ্য শাসকরা মিশিয়েছে ইসলাম ধর্মকেও। স্টেডিয়ামে অ্যালকোহল নিষিদ্ধ ও সমকামিতা বিরোধিতা এর উদাহরণ। 

যদিও গেইমস ভিলেজের আঙিনাটুকুর বাইরে ভোগবাদী যথেচ্ছতার কোনো কমতি নেই। শুধুমাত্র ইংল্যান্ড দলের খেলোয়াড়দের স্ত্রী ও বান্ধবীদের মদ্যপানের বিপুল অর্থ খরচ নিয়ে সংবাদ এসেছে এর মধ্যে। অর্থাৎ সবই চলছে এবং চলবে কিন্তু তার মোড়ক হিসেবে ব্যবহৃত হবে ধর্ম।


আরও পড়ুন- কাতারে লাইভের সময় আর্জেন্টাইন নারী সাংবাদিকের ব্যাগ ছিনতাই


মাত্র কয়েকদিন আগে কাতার ও চীন তেল বাণিজ্য নিয়ে নতুন সমঝোতায় পৌঁছেছে। অবস্থা এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে ট্রল হচ্ছে ভবিষ্যতে উত্তর কোরিয়াও ফিফার বদান্যতায় বিশ্বকাপের আয়োজক হয়ে উঠতে পারে।

যে ফুটবল বিশ্বকে এক করে। বর্ণবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়। জুলুমের বিরুদ্ধে দ্রোহ জাগায় মাঠ কিংবা গ্যালারি থেকে সে ফুটবল যেন আপস করল কাতারে এসে।

নারীর জন্যও ফিফা বিশ্বকাপ উৎকট বৈষম্যের এক নজির। যেখানে বিশ্বকাপজয়ী দল একাই প্রাইজ মানি হিসেবে পেতে যাচ্ছে প্রায় ৪২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সেখানে ২০১৯ সালে অনুষ্ঠিত নারী বিশ্বকাপ ফুটবলের সব ম্যাচ মিলিয়ে প্রাইজ মানি ছিল প্রায় ৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

তখন প্রশ্ন আসে কোন আফিমে বুঁদ হয়ে আমরা আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল হল্লা করি? যেখানে আসলে চলছে টাকার খেলা, ক্ষমতার খেলা, বন্দিত্বের দীর্ঘ মেয়াদ আর নতুন বিশ্ব অর্থনীতির মেরুকরণ।    

ফুটবলের এসব সত্য জেনে বল খুঁজে আর কী লাভ? বরং নজরুলের ভাষায় উচিত জবাব হোক আমাদের,

“লাথি মার ভাঙরে তালা”


লেখক, ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা হাসান শাওনের জন্ম, বেড়ে ওঠা রাজধানীর মিরপুরে। পড়াশোনা করেছেন মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি বাঙলা কলেজ, বাংলাদেশ সিনেমা ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে। ২০০৫ সাল থেকে তিনি লেখালেখি ও সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত। কাজ করেছেন সমকাল, বণিক বার্তা, ক্যানভাস ম্যাগাজিন ও আজকের পত্রিকায়।


২০২০ সালের ১৩ নভেম্বর হাসান শাওনের প্রথম বই “হুমায়ূনকে নিয়ে” প্রকাশিত হয়।

   

About

Popular Links

x