বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আমাদের একজন শিক্ষক একদিন কোনো এক প্রসঙ্গে বললেন, “আমার বাবা বলতেন, রবীন্দ্রনাথ অনেক মুসলমানের চেয়ে ভালো মানুষ ছিলেন।” ক্লাস শেষে বন্ধুদেরকে জিজ্ঞেস করলাম, স্যারের এই বক্তব্যের মধ্যে কোনো অসংবেদনশীলতা ছিল কি-না? ব্যক্তিগতভাবে ওনাকে আমরা সহজ সরল মানুষ হিসেবেই জানতাম। তাই ওনার কথার মধ্যে কোনো অসংবেদনশীলতা থাকতে পারে সেইটা হয়ত বন্ধুদের মাথায় আসেনি। আমাদের যাপিত জীবনে কথিত ভালো মানুষেরা, সহজ সরল মানুষেরা এমনকি আমরা যাদেরকে উচ্চমাত্রার সংবেদনশীল মানুষ হিসাবে জানি, তাদের কথাও যে আমাদের অনুভূতিতে আঘাত করতে পারে সেটা ভাববার মনন আমাদের গড়ে উঠেনি। আর সে কারণেই কথিত গণঅভূত্থ্যানের পর দেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর কোনো নির্যাতন, নিপীড়ন হচ্ছে কি-না সেটা আমরা বিচার করছি, রীতিমত রায় ঘোষণা করছি তাদের বাড়িঘরে, উপাসনালয়ে হামলা হয়েছে কী হয় নাই এই সংক্রান্ত ফেসবুকীয় তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে। কী বিচিত্র আমাদের দেশ! কী বিচিত্র এদেশের মানুষের মনন! একটু গভীরে গিয়ে ভাববার, একটু সুক্ষভাবে চিন্তা করবার সময় আমাদের নেই। হোক সেটা ব্যক্তির ক্ষেত্রে, ঘটনার ক্ষেত্রে কিংবা কোনো আদর্শের ক্ষেত্রে।
আজ থেকে বহুবছর আগে মোতাহের হোসেন চৌধুরী তার “সংস্কৃতি কথা” প্রবন্ধে বলেছেন, লোকটা ভালো কী মন্দ সেটার চেয়ে আমাদের কাছে বিবেচ্য বিষয় হলো, লোকটার গায়ে কোন দলের মার্কা। মার্কাটি আমার দলের হলে তার সাত খুন মাফ। ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে, উপাসনালয়ে হামলা, ভাঙচুর হয়েছে কী হয় নাই, তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা লুটপাট হয়েছে কী হয় নাই শুধু এগুলোর প্রেক্ষিতে যদি আপনি, আমি, আমরা তর্কে লিপ্ত হই, তাহলে আওয়ামলীগ, বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় পার্টির কর্মী সমর্থকদের সাথে আপনার, আমার, আমাদের কোনো পার্থক্য নেই। তাহলে আমরা কীভাবে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখব?
১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর ঢাকা শহরে বিশাল শোভাযাত্রা বের হয়েছিল। ঢাকার আশেপাশের জেলা থেকে হিন্দু-মুসলিম সব সম্প্রদায়ের মানুষ সেই শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারী হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষটিকেই পরের দিন তিনি যে রিক্সায় চড়ে বাসায় ফিরছিলেন, সেই রিক্সাওয়ালাই বলা শুরু করেন, “এই দেশটা তো এখন আমগোই। আপ্নেরা যারা আছেন, তাগোও কোনো ডর নাই। বুক পাইত্যা দিয়া আগলাইয়া রাহুম।না আপ্নাগো কোনো ক্ষতি হইতে দিয়্যুম না।”
১৯৭১ সালে এই দেশে হিন্দু-মুসলিম, বৌদ্ধ-খ্রিস্টান কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ভারত থেকে দেশে ফিরে বাড়ি থেকে লুট হয়ে যাওয়া মালামাল প্রতিবেশীর বাড়ির উঠানে দেখে ফেরত চাইতে গিয়ে শুনেছেন, “গণিমতের মাল আবার ফেরত কীসে? আইছ, নিজের ভিটায় উঠতে পারছ…আর কী চাও?” তখনও প্রতিবেশিদের কেউ কেউ আগায়ে আসছিলেন, “তোমাদের আর ভয় নাই। আমরা আছি।”
২০২৪ সালে এসেও এই সমাজের সবচেয়ে নাজুক অবস্থার মধ্যে যাদের নিত্য বসবাস সেই মাদ্রাসা ছাত্ররাই এসে এদেশেরই নাগরিককদের বলছে, “ভয় নাই। আপনাদের মন্দিরের নিরাপত্তা আমরাই রক্ষা করব।”
ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানসিক যে বেদনা সেইটা বুঝতে হলে আমাদেরকে বুঝতে হবে ১৯৪৭ সালে হিন্দু রিক্সা আরোহীকে, রিক্সাওয়ালা যে অভয় দিয়েছিলেন, সেই সময় আরোহীর মনের অবস্থা কেমন হয়েছিল, বুঝতে হবে স্বাধীন দেশে একজন হিন্দুর বাপ-দাদার ব্যবহৃত কোনো সম্পদ প্রতিবেশীর বাড়িতে প্রকাশ্য জায়গায় দেখেও সেটা ফেরত না নিতে পারার কারণে তার বা তাদের মনের অবস্থা কেমন হয়েছিল, বুঝতে হবে ২০২৪ সালে এসে যে ছেলেটার নিজের জীবনই অনিশ্চিত সেই ছেলেটাই যখন এসে অভয় দেয়, আপনাদের কোনো ভয় নেই সেই সময় অভয়প্রাপ্ত মানুষগুলোর মনের অবস্থা কেমন হয়।
বাড়িঘরে, উপাসনালয়ে হামলা, ভাংচুর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে লুটপাট এগুলি হয়ে গেলেও এক ধরনের স্বস্তি মেলে, যাক…আর বোধহয় কেউ আসবে না। আমাদের প্রাপ্যটুকু আমরা পেয়ে গেছি। কিন্তু ঠিক পাশের বাড়ির ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের পরিবারটির শঙ্কা কাটে না, পাড়ার অন্য পরিবারগুলির শংকা কাটে না। পরিস্থিতি যতদিন না একটা স্থিতিশীল অবস্থায় আসে, প্রতিদিন হয়ত তাদের মনে হতে থাকে আজকে আমাদের পালা। এই যে সার্বক্ষণিক মানসিক শংকার মধ্যে বসবাস, শুধুমাত্র ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে নিজেকে দ্বিতীয় শ্রেণির কিংবা তারও নিচে নিজের অবস্থান ভাবার যে যন্ত্রণা সেইটা না বুঝতে পারলে আমরা শুধুমাত্র ফেসবুকীয় তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই গলাবাজি করব। কিন্তু যে তিমিরে ছিলাম সেখান থেকে আমাদের মুক্তি মিলবে না।
এইটা তো গেল বিশেষ সময়ের কথা। এমন অনেক এলাকা আছে যেখানে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে ওয়াদা করতে হয় যে তারা কাকে ভোট দিবে। ভোটে যাকে ওয়াদা করেছিলেন, সেই প্রার্থী জয়লাভের পরও শুনতে হয়, তারা নাকি ওয়াদা ভঙ্গ করেছে। আমার জানামতে, একটা ইউনিয়ন পরিষদের ভোটের সময় তারা যে ওয়াদার বরখেলাপ করেন নাই, সেইটা প্রমাণ করতে গিয়ে ব্যাল্ট পেপারের মাঝাখানে একটা করে তুলসির পাতা দিয়ে দিয়েছিলেন। কতবড় মানসিক চাপ থেকে একটা গ্রামের একটা বিশেষ সম্প্রদায়ের মানুষ এমন একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারে সেইটা না বুঝলে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মনোবেদনা আমরা কোনোদিনই বুঝব না।
আদিবাসী ছাত্রছাত্রীরা বলেছেন, বৈসাবি’র সময় এ বছর পাহাড়ে কোনো সাংবাদিকেরা ঢুকতে পারবেন না। কেন বলেছেন, কোন মনোবেদনা থেকে, ক্ষোভ থেকে বলেছেন সেইটা না বুঝলে আমরা কথিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আদিবাসীদের ঔদ্ধত্য নিয়ে সমালোচনা করব এবং পাশাপাশি কবে যাব পাহাড়ে, আহারে আহারে স্ট্যাটাস দিতে থাকব। কিন্তু তাদের নাগরিক অধিকার নিশ্চিতে একটি বাক্যও মন থেকে উচ্চারণ করতে পারব না। কারণ বাংলাদেশের সকল নাগরিক আইনের চোখে সমান এই বোধ আমাদের রাজনীতিবিদ এবং নাগরিকদের মধ্যে আজও জাগ্রত হয় নাই। তাই আমরা জানান দিয়ে সহ-নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যতটা আগ্রহী, তার বা তাদের জন্য কেন আলাদাভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে সেই প্রশ্ন তুলতে আমরা ততটাই নিঃস্পৃহ।
আমাদের এই আচরণ এবং মানসিকতার জন্য আমরা নিজেরা দায়ী নই। কারণ, আমরা বেড়ে উঠেছি এই চর্চার মধ্য দিয়ে। তাই তো বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সহজ সরল শিক্ষক তার বাবার জবানীতে নির্ধিধায় এই কথা বলেন যে, “রবীন্দ্রনাথ অনেক মুসলমানের চেয়ে ভাল মানুষ ছিলেন”। এই কথার মানে কী দাঁড়ায়? অমুসলিমরা কি ভালো মানুষ হয় না? রবীন্দ্রনাথ ব্যতিক্রম ছিলেন। তিনি অনেক মুসলমানের চেয়ে ভালো মানুষ ছিলেন, এই কথার মানে হল গড়পড়তা মুসলমানরাই ভালো। কিছু মুসলমানের স্ট্যান্ডার্ড সেই লেভেলে না। রবীন্দ্রনাথ তাদের নিরিখে ভালো। আরও গভীরে গেলে গড়পড়তা সেই ভালো মুসলমানদের লেভেলে পৌঁছাতে হলে তো রবীন্দ্রনাথেকে ছাড়িয়ে যেতে হবে। এই মনন নিয়ে আর যাই হোক মানব সমাজের কল্যাণ সাধিত হবে না, সেটা নিশ্চিত করে বলা যায়। তাই আসুন আগে আমাদের মনন বদলাই, ভাবনা বদলাই, দৃষ্টিভঙ্গি বদলাই। সেটা তো শুধু এই আহ্বানেই হবে না। কিন্তু আলাপটা তো শুরু হোক। বদলানোর রাস্তাও নিশ্চয় পেয়ে যাব।



