Friday, June 05, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

স্বাধীনতার মাসে বাংলাদেশের সংকল্প

পাকিস্তান বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক নিয়ে বিশেষ তদবির দেখাচ্ছে তবে তারা কোনোভাবেই ক্ষমা চাওয়ার পক্ষে নয়

আপডেট : ২৬ মার্চ ২০২৩, ০৮:১০ পিএম

স্বাধীনতার আলো উৎসারিত করা মার্চ মাস বাংলাদেশের কাছে আবেগের। বাঙালির উৎকণ্ঠার। শোণি-সংগ্রামের মাধ্যমে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বাংলাদেশ এক রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের ঘোষণা রাখে। কবি শামসুর রাহমানের ভাষায় “পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে জলন্ত ঘোষণার ধ্বনি-প্রতিধ্বনি তুলে, মতুন নিশান উড়িয়ে, দামামা বাজিয়ে” বঙ্গবন্ধুর বিমূর্ত ভাবনার অবয়ব নিয়ে জন্ম নেয় বাংলাদেশ। অর্ধ শতাব্দী পেরিয়ে, বাংলাদেশের দুর্নিবার এগিয়ে যাওয়া বিশ্বের কাছে এক আশ্চর্য নিদর্শন। উন্নয়নের ধারা এই ব-দ্বীপে আছড়ে পড়েছে। সামাজিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতি বিশেষ লক্ষণীয়। নিম্ন আয়ের দেশ থেকে এগিয়ে গিয়েছে দেশ। বেড়েছে মাথাপিছু আয়। স্বাধীনতার পর মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে আশ্চর্যজনকভাবে। তবে স্বাধীনতার ৫৩ বছর পরেও, বাংলাদেশে রয়ে গেছে নানা প্রতিবন্ধকতা। নানা প্রতিকূলতা।

বাংলাদেশের জনসংখ্যা ক্রমবর্ধমান। স্বাধীনতার সময় বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল সাত কোটি যা এখন ১৭ কোটিরও বেশি। জনসংখ্যাকে সম্পদে পরিণত করা দেশের আশু লক্ষ্য হওয়া উচিৎ। জনসংখ্যার বিস্ফোরণের ফলে পাকিস্তানের দুর্গতি দুনিয়াজুড়ে এখন আলোচনার বিষয়। দেশের সকল শ্রেণীর এবং প্রান্তের মানুষের জন্য জীবিকার ব্যবস্থা এবং জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সরকারের প্রাধান্য দেওয়া উচিত। মাথাপিছু আয়ের হিসাবে বাংলাদেশ পাকিস্তান ভারতকে ছাড়িয়ে গেলেও দেশ এখনও চিকিৎসা ব্যবস্থায় অনেক অনেক পিছিয়ে। বাংলাদেশের চিকিৎসা ক্ষেত্রে এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রস্তুতে স্বাবলম্বী হওয়া উচিত। কোভিড চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা নানা দুর্দশাগুলো।

গণতন্ত্রের অন্যতম বড় সাফল্য হলো সুষ্ঠু এবং অবাধ নির্বাচন। বাংলাদেশে নির্বাচন আসন্ন। তাই সরকারের অন্যতম প্রধান কর্তব্য হবে দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে আরও সুদৃঢ় করা, গণতন্ত্রের পরিসরকে আরও বিস্তৃত করা। সম্প্রতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন যুক্তরাজ্যের প্রতিমন্ত্রী আন্নে মারি ট্রেভলিয়ানকে যে ভাষায় বাংলাদেশের নির্বাচন, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার নিয়ে আশ্বাস দিয়েছেন তা প্রশংসনীয়। যুক্তরাজ্যের ফরেন কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিসের প্রতিমন্ত্রী আন ম্যারি ত্রিভেলিয়নের সঙ্গে আলাপচারিতায় তিনি বলেন যে, যুক্তরাজ্য প্রয়োজনে বাংলাদেশের কাছে গণতন্ত্র এবং মানবাধিকার বিষয়ে পরামর্শ নিতে পারে। যুক্তরাজ্যের এই প্রতিমন্ত্রীকে, কমনওয়েলথ ভুক্ত একটি প্রগতিশীল দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মন্তব্য বাংলাদেশের উন্নয়ন ও তার নিজের অস্মিতার অনেক কথাই বলে। স্বাধীনতা দিবসের উদযাপন লগ্নে বাংলাদেশের উচিত নতুন লক্ষ্য স্থির করা। স্বাধীন বাংলাদেশ অবশ্যই স্বাধীনচেতা বাঙালির জন্ম দেবে। স্বাধীন বাংলাদেশ তার জনগোষ্ঠীর বৈচিত্র্য রক্ষায় বদ্ধপরিকর হবে। স্বাধীন বাংলাদেশ বিজ্ঞানের দিশায় মেপে নেবে ভবিষ্যতের আলো।

এই মার্চ মাস বাংলাদেশের কাছে আবেগের, মহাবিষাদের তথাপি গর্বের। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর জেনারেল নিয়াজির এবং ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সেনা বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীর হাতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আত্মসমর্পণ করে।

একান্ত এক সাক্ষাৎকারে ভারতীয় সেনার সাবেক গোয়েন্দা আধিকারিক জানান, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের মানুষের যুদ্ধ। তাতে ভারত শুধুমাত্র সহযোগিতা করে। পূর্ববঙ্গে চালানো পাকিস্তানের নির্মম গণহত্যার ৫০ বছর পরেও, গণহত্যার বৈশ্বিক স্বীকৃতি এখনও মেলেনি। বাংলাদেশে ২৫ মার্চ বাঙালি গণহত্যা দিবস হিসেবে পালন করে এলেও, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের গণহত্যা নিয়ে কোনোরকম উচ্চবাচ্য হয় না। ২০২২ সালের অক্টোবর মাসে যুক্তরাষ্ট্রে, দুই মার্কিন কংগ্রেসমান স্টিভ শাবট এবং রো খান্না হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভসে বাংলাদেশে গণহত্যার বিষয়টি স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য জোরদার দাবি তোলেন। এই দুই মার্কিন রাজনীতিবিদ, গণহত্যা নিয়ে বাংলাদেশের কাছে পাকিস্তানের অবিলম্বে ক্ষমা চাওয়ার দাবিও তোলেন।

পাকিস্তান বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক নিয়ে বিশেষ তদবির দেখাচ্ছে তবে তারা কোনোভাবেই ক্ষমা চাওয়ার পক্ষে নয়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান পাকিস্তানের পূর্ব পাকিস্তানের উপর চালানো অমানবিক অত্যাচারের কথা একাধিকবার তুলে ধরেন। তবে ক্ষমতায় থাকাকালীন কোনো প্রধানমন্ত্রীই সামরিক বাহিনীকে এড়িয়ে ক্ষমা চাইতে আসেনি। বাংলাদেশের উপর অত্যাচার নিয়ে হামিদুর রহমান কমিশনেরও কোনো তথ্যনির্ভর সুরাহা হয়নি।

মুক্তিযুদ্ধের তথ্য নিয়ে বিকৃতি চলছে সমানে। সম্প্রতি, খুলনা প্রেসক্লাবে এক আলোচনায়, সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এবং মুক্তিযোদ্ধা সামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক তার বক্তব্যে জিয়াউর রহমান কীভাবে বঙ্গবন্ধু হত্যার নেতৃত্ব দেন তা উল্লেখ করেন। ক্রমে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক অপশক্তি কিভাবে বঙ্গবন্ধুর ধর্ম-নিরপেক্ষ দেশ ভাবনাকে পরাজিত করে তাও জানান বিচারপতি চৌধুরী।

৫৩ বছরে পা রাখা বাংলাদেশ এখন অনেক সাবলীল। স্বাবলম্বী। স্বাধীনতা দিবসের উদযাপন লগ্নে বাংলাদেশের উচিত নতুন লক্ষ্য স্থির করা। স্বাধীন বাংলাদেশ অবশ্যই স্বাধীনচেতা বাঙালির জন্ম দেবে। স্বাধীন বাংলাদেশ তার জনগোষ্ঠীর বৈচিত্র্য রক্ষায় বদ্ধপরিকর হবে। স্বাধীন বাংলাদেশ বিজ্ঞানের দিশায় মেপে নেবে ভবিষ্যতের আলো। দেশের উজ্জ্বল এক চেহারা দেখতে, বাংলাদেশের উচিৎ স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থানসহ সামাজিক ক্ষেত্রগুলোতে লক্ষ্য এবং বিনিয়োগ আরও জোরদার করা।


অয়নাংশ মৈত্র ভারতীয় সাংবাদিক ও গবেষক।


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।

   

About

Popular Links

x