এ বছর ভারতের জি-২০ সভাপতিত্বে এবং আতিথেয়তায়, ২২-২৪ মে কাশ্মিরে জি-টোয়েণ্টি শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলো। পর্যটনবিষয়ক জি-২০ এর এই সম্মেলনে যোগ দিতে, বিশ্বের ২৭টি দেশ থেকে প্রায় ৬০ জনের বেশি প্রতিনিধি আসেন ভূস্বর্গে।
এক সময়ের বিচ্ছিন্নতাবাদী এবং উগ্রবাদীদের দাপটে থাকা, কাশ্মিরকে জি- টোয়েন্টি শীর্ষ সম্মেলনের কেন্দ্রস্থল করার তাৎপর্য একাধিক। উদ্দেশ্য ছিল এই অঞ্চলে স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনার বিষয়টি দুনিয়ার কাছে দেখানো। পাশাপাশি কাশ্মিরের পর্যটন প্রদর্শন করা ছিল এ মহাসমাবেশের প্রধান উদ্দেশ্য।
তবে এই কাশ্মির ইস্যুকে কেন্দ্র করে ঘোরতর বিরোধিতা করে পাকিস্তান। পাশাপাশি চীন, সৌদি আরব এবং তুরস্ক কাশ্মিরে এই মহাসমাবেশ বয়কট করে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান বলেছিলেন, “কাশ্মিরে ভারত তার স্বায়ত্ত্বশাসিত মর্যাদা প্রত্যাহার করার পরে যে পদক্ষেপ নিয়েছে তা সমস্যাগুলোকে আরও জটিল করেছে।”
জি-২০ সভাপতিত্ব ভারতের আগামীর এক অনন্য অধ্যায়। এই সভাপতিত্ব ভারতের কাছে এক দীর্ঘ-প্রতীক্ষিত মুহূর্ত। তার জন্য বছরজুড়ে নেওয়া হয়েছে নানা পরিকল্পনা। ভারতের সভাপতিত্বে প্রায় ৫০টি নগরে নানা বিষয়ে সভা ও সম্মেলন আয়োজিত হচ্ছে। সভাপতিত্বে থাকাকালীন ভারত সরকার তার বুদ্ধিবৃত্তিক, প্রশাসনিক, অবকাঠামোগত এবং সামাজিক মূলধনকে উন্নত করেছে। শিক্ষাবিদ, সুশীল সমাজ, ব্যবসা, থিঙ্ক ট্যাঙ্ক, শ্রমিক ইউনিয়ন এবং বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায়সহ নানা সংগঠনের সঙ্গে পরামর্শ করে ভারত সরকার জি-২০ সম্মেলন নানাভাবে সমৃদ্ধ করছে।
১৯৯০ সালের শেষের দিকের আর্থিক সঙ্কট পূর্ব এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে আঘাত করলে জন্ম নেয় এই জি-২০। এই গোষ্ঠীর সদস্য হলো- আর্জেন্টিনা, অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, কানাডা, চীন, ফ্রান্স, জার্মানি, জাপান, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ইতালি, মেক্সিকো, রাশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, সৌদি আরব, দক্ষিণ কোরিয়া, তুরস্ক, যুক্তরাজ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন।
জন্মলগ্ন থেকে এই গোষ্ঠীর মূল লক্ষ্য ছিল মধ্যম আয়ের দেশগুলোকে সম্পৃক্ত করে বিশ্বব্যাপী আর্থিক স্থিতিশীলতা সুনিশ্চিত করা। জি-২০ দেশগুলো বিশ্বব্যাপী শক্তির ৮০% খরচ করে এবং বৈশ্বিক মোট দেশজ উৎপাদনের ৮৫% অবদান রাখে। এই দেশগুলোতেই বিশ্বের ৬০% মানুষ বসবাস করে।
ভারতের জি-২০ সভাপতিত্বে এ বছরের জন্য সম্প্রতি ঘোষিত থিম, “বসুধৈব কুটুম্বকম” বা “এক পৃথিবী, এক পরিবার, এক ভবিষ্যত”। এটি মূলত সংস্কৃত শাস্ত্র থেকে নেওয়া হয়েছে, যা জীবনের বিভিন্ন রূপ- মানুষ, প্রাণী, উদ্ভিদ এবং অণুজীব এবং তাদের স্থানের মধ্যে একটি আন্তঃসম্পর্কের কথা বলে।
খাদ্য নিরাপত্তাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া ব্যতীত ভারত তার সভাপতিত্বে জি-২০ তে নানাবিধ বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়েছে। যেমন: বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য পরিকাঠামো, স্বাস্থ্য অর্থায়ন এবং পরিষেবা সরবরাহের ডিজিটাইজেশন, ডিজিটাল অবকাঠামো এবং শিক্ষা, জীবিকার ক্ষেত্রে প্রযুক্তি সক্ষম উন্নয়ন, দুর্যোগ স্থিতিস্থাপকতা, নানা প্রকার অর্থনৈতিক অপরাধের বিরুদ্ধে যুদ্ধ; বহুপাক্ষিক সংস্থার সংস্কার, নীল অর্থনীতির সুবিধা এবং সর্বোপরি জলবায়ু: অর্থায়ন এবং গ্রিন হাইড্রোজেন মিশন, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) বাস্তবায়নের ত্বরান্বিত গতি। সঙ্গে সঙ্গে শক্তি নিরাপত্তা এবং নারীর ক্ষমতায়নের উপরও বিশেষ জোর দেওয়া হবে।
গত বছরের সম্মেলনের জন্য ইন্দোনেশিয়ার অগ্রাধিকারগুলো ছিল বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য স্থাপত্য, ডিজিটাল এবং অর্থনৈতিক রূপান্তর এবং ক্লিন এনার্জি ট্রানজিশন। তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ভারত ইঙ্গিত দিয়েছে, এটি “জীবন পরিবর্তনের জন্য ডিজিটালাইজেশন”-কে অগ্রাধিকার দেবে। ভারতের সঙ্গে রাশিয়ার সুসম্পর্ক জি-২০ এর অনেক দেশের কাছেই অস্বস্তিদায়ক।
কাশ্মিরের জি-২০ পর্যটন সম্মেলন কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সাফল্য। যদিও রাষ্ট্রনেতাদের সম্মেলন হবে সেপ্টেম্বরে। তবে কাশ্মিরের এই জি-২০ শীর্ষ সম্মেলন দেখিয়েছে কাশ্মির বদলে গেছে। ভারত সরকার এই অঞ্চলে স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে।
গত বেশ কয়েক বছর ধরে এই উপত্যকা টানা কোনো ধর্মঘট, রাস্তায় বিক্ষোভ বা অঘোষিত ইন্টারনেট বন্ধের সাক্ষী হয়নি। যদিও মানবাধিকার লঙ্ঘন, নির্বিচারে গ্রেপ্তার, রাজনৈতিক নিপীড়ন সহ নানা বিষয় নিয়ে ভারতকে বিদ্ধ করেছে পাকিস্তান ও পশ্চিমা দেশের একাংশ। এই সভাপতিত্বের মাধ্যমে ভারত জাতীয় অগ্রাধিকারগুলোকে তার বৈশ্বিক আকাঙ্ক্ষার সাথে সারিবদ্ধ করার একটি অনন্য সুযোগ পেয়েছে।
অয়নাংশ মৈত্র, ভারতীয় সাংবাদিক, গবেষক
প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।



