Tuesday, June 30, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

এসডিজি: গালভরা প্রতিশ্রুতি নয়, আমাদের প্রয়োজন কোটি ডলারের কাজ

ঢাকা ট্রিবিউনের জন্য ড. বিওন লম্বোগের লেখা এই বিশেষ নিবন্ধে এসডিজির প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কোন বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত তা আলোকপাত করা হয়েছে

আপডেট : ০৪ জুলাই ২০২৩, ০৩:৫৮ পিএম

মুদ্রাস্ফীতি, উচ্চ সুদের হারের প্রভাব, কোভিড মহামারির দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব এবং ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার মতো ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতসহ বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি বর্তমান বিশ্ব। এই পরিস্থিতিতে ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) অর্ধেক সময় পার হয়েছে। এসডিজিতে ১৬৯টি লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রতি দিয়েছেন বিশ্বনেতারা।

বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ ক্ষুধা, দারিদ্র্য এবং রোগমুক্তি জলবায়ু পরিবর্তন, দুর্নীতি এবং যুদ্ধ বন্ধ করার মতো প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এছাড়া মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করা কিংবা জৈবিক উপায়ে কৃষিপণ্য উৎপাদনের মতো প্রতিশ্রুতি রয়েছে।

তবে দুঃখজনক হলো, এসডিজির প্রস্তাবিত সময়ের অর্ধেক পার হয়ে গেলেও অর্জনের ক্ষেত্রে আমরা অর্ধেকের কাছাকাছিও নেই। তাই এখন আমাদের দ্রুত কার্যকরী সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

প্রথমেই আমাদের সবচেয়ে কার্যকর কৌশল নিয়ে আলোচনা প্রয়োজন। বৈশ্বিক পরিস্থিতির বিবেচনায় কোন খাতে খরচ সবচেয়ে ফলপ্রসূ তা নির্ধারণ করতে আমাদের কোপেনহেগেন কনসেনসাসের বিশেষজ্ঞরা উগান্ডা থেকে টোঙ্গা এবং উজবেকিস্তানসহ সারাবিশ্বের প্রায় সকল সরকারের সঙ্গে আলোচনা করেছে। কোন নীতিতে ব্যয় করা প্রতিটি টাকার বিপরীতে সর্বোচ্চ সুবিধা পাওয়া যাবে সে বিষয়ে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে আলোচনা করা হয়।

দ্বিতীয়ত, আমাদের বৈশ্বিক প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে হবে এবং বিশ্বব্যাপী বৈষম্যের অবসান ঘটাতে হবে। যেহেতু সর্বত্র সম্পদের অভাব রয়েছে, তাই আমাদের প্রথমে সেরা জিনিসগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

দুর্ভাগ্যবশত, অনেক বিশ্ব নেতা এখনও বিশ্বাস করেন যে এসডিজি অর্জনের পথে এগিয়ে যাওয়ার উপায় হলো এই বছরের শেষের দিকে জাতিসংঘে ১৬৯টি প্রতিশ্রুতির প্রত্যেকটির বাস্তবায়ন অগ্রগতি তুলে ধরা। তারপর পরামর্শ অনুয়ায়ী অগ্রাধিকার চিহ্নিত করা।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, নির্ধারিত সময়ে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সুযোগ নেই। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তেনিও গুতেরেস ৫০০ বিলিয়ন ডলারের বার্ষিক এসডিজি উদ্দীপনা প্যাকেজের আহ্বান জানিয়েছেন। তবে ধনী দেশগুলো ইতোমধ্যে বৈদেশিক সাহায্যে ব্যয় করছে তার কয়েকগুণ। 

এমনকি যদি বিশ্বব্যাপী করদাতারা অনুরোধকৃত অর্ধ ট্রিলিয়ন ডলার পরিশোধ করতে রাজি হন, তারপরও এটি চাহিদার তুলনায় ২০ গুণ খুব কম হবে। সমস্ত প্রতিশ্রুতি অর্জনের জন্য বছরে প্রায় ১৫-২০ ট্রিলিয়ন ডলার খরচ হবে বলে অনুমান করা হয়েছে। বর্তমানে, এক চতুর্থাংশেরও কম অর্থায়ন করা হয় এবং সেই ব্যয়ের বেশিরভাগই হয় ধনী দেশগুলোতে। অথচ উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে বেশি সহায়তা প্রয়োজন দরিদ্র দেশগুলোতে।

এর ফলে ১০-১৫ ট্রিলিয়ন ডলারের বার্ষিক ঘাটতি দেখা দেয়, যা বিশ্বের প্রতিটি সরকার থেকে ১৩ ট্রিলিয়ন ডলার ট্যাক্স গ্রহণের সমতুল্য। এই আর্থিক ব্যবধান ঘোচানো সম্ভব না

বক্তৃতা এবং ট্রিলিয়ন-ডলারের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে এসে বাস্তব এবং দক্ষ, বিলিয়ন-ডলারের কার্যকরী বাস্তবায়ন দরকার। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোযোগ দেওয়ার এখনই সময়।

বাস্তবতা হলো, এসডিজিরকিছু প্রতিশ্রুতির সাশ্রয়ী ও শক্তিশালী সমাধান নেই। তবে কিছু বিষয় রয়েছে যেখানে বিনিয়োগ অবিশ্বাস্যভাবে কার্যকর এবং বছরে কয়েক বিলিয়ন ডলারের জন্য আশ্চর্যজনক অগ্রগতি প্রদান করতে পারে।

শিক্ষার মানোন্নয়নের এসডিজিতে গুরুত্ববহ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে মনোযোগ দিন। গবেষণায় ধারাবাহিকভাবে শেখার সাশ্রয়ী এবং কার্যকর উপায় দেখানো হয়েছে। শিক্ষামূলক সফ্টওয়্যারসহ ট্যাবলেটগুলো দিনে মাত্র এক ঘণ্টা ব্যবহারে বছরে শিক্ষার্থীর প্রতি খরচ হয় মাত্র ২০ ডলার। প্রচলিত ব্যবস্থায় তিন বছরে যা শিখতে পারে, এই পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীরা মাত্র এক বছরে সেই শিক্ষা অর্জন করবে। এছাড়া গবেষণায় দেখোনো কাঠামোগত শিক্ষণ পদ্ধতিতে শিক্ষার্থী প্রতি বার্ষিক ১০ ডলার ব্যয়ে দ্বিগুণ ফলাফল সম্ভব। বিশ্বের দরিদ্র দেশের প্রায় অর্ধ বিলিয়ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য বার্ষিক ১০ বিলিয়ন ডলারেরও কম বিনিয়োগে নাটকীয় উন্নয়ন সম্ভব। এই খাতে বিনিয়োগ করা প্রতিটি ডলার ৬৫ ডলারের দীর্ঘমেয়াদী উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধি করবে।

ক্ষুধা নিরসনে এসডিজি প্রতিশ্রুতি বিবেচনায় নিন। আমাদের দ্বিতীয় সবুজ বিপ্লব প্রয়োজন। ১৯৬০ এর দশকে অগ্রগতি গুণগত বীজ তৈরি করেছিল যা কৃষকদের কম খরচে বেশি খাদ্য উৎপাদনে সহায়তা করে। এখন, বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলোর জন্য কৃষি গবেষণা ও উন্নয়ন অত্যন্ত প্রয়োজন। এই খাতে বিনিয়োগ অপুষ্টি কমিয়ে দেবে, কৃষকদের আরও বেশি উৎপাদনশীল হতে সাহায্য করবে এবং খাদ্য খরচ কমিয়ে দেবে। এই খাতে বার্ষিক ৫.৫ বিলিয়ন বিনোয়োগের বিপরীতে ১৮৪ বিলিয়ন ডলারের দীর্ঘমেয়াদি রিটার্ন পাওয়া যাবে।

মাতৃকালীন সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা গেলে বছরে এক লাখ ৬৬ হাজার নারী ও ১২ লাখ নবজাতকের মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব। এই খাতে বার্ষিক খরচ ৫ বিলিয়নেরও কম।

আমাদের কোপেনহেগেন কনসেনসাসের বিশেষজ্ঞরা বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতিবিদ ও নোবেল বিজয়ীদের সঙ্গে কাজ  করে ১২টি শক্তিশালী নীতি চিহ্নিত করেছেন যা তুলনামূলকভাবে কম খরচে এসডিজিরি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সহায়তা করবে। আমার নতুন বই “বেস্ট থিংস ফার্স্ট”-এ এই বিষয়ে আরও বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। বার্ষিক মোট ৩৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে উপরে উল্লিখিত বিষয়ে অবিশ্বাস্য পরিবর্তন সম্ভব। এছাড়াও আমরা ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতিবছর যক্ষ্মার হাতে থেকে দশ লাখ মানুষের মৃত্যু ঠৈকাতে পারি, জমির মালিকানার রেকর্ড উন্নত করতে পারি, বাণিজ্য বাড়াতে পারি, ম্যালেরিয়া কমাতে পারি, বৈষম্য কমাতে দক্ষ কর্মীদের অভিবাসন বাড়াতে পারি। টিকাদান উন্নত করা, শিশুর পুষ্টি নিশ্চিত করা এবং উচ্চ রক্তচাপের মতো দীর্ঘস্থায়ী রোগ থেকেও এই সময়ে ১৫ লাখ মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব।

এই নীতিগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে বছরে ৪২ লাখ মানুষের মৃত্যু ঠেকানো যাবে এবং দরিদ্র দেশগুলোতে বছরে ১.১ ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আনবে। অর্থাৎ ব্যয় করা প্রতি ডলারের বিপরীতে ৫২ ডলারের সামাজিক সুবিধা আসবে। এই ১২টি নীতিতে বিনিয়োগ সম্ভবত এই দশকে বিশ্বের সবচেয়ে ভালো কাজ হবে।

 বাংলাদেশে অগ্রাধিকার নিয়ে আমাদের জাতীয় আলোচনা শুরু করা উচিত। আমাদের নিশ্চিত করা উচিত যে বিশ্বের প্রায় সব প্রতিশ্রুতিতে একই রকম কথোপকথন রয়েছে। আসুন এসডিজির প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বাকি সাত বছরের সর্বোত্তম ব্যবহার করি। বিশ্বের জন্য সবচেয়ে অবিশ্বাস্য সুবিধা প্রদান করবে এমন বিষয়ে অগ্রাধিকার দিই।


ড. বিওন লম্বোগ কোপেনহেগেন কনসেনসাসের প্রেসিডেন্ট এবং স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির হুভার ইনস্টিটিউশনের ভিজিটিং ফেলো।


এই নিবন্ধ ঢাকা ট্রিবিউনের জন্য জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. বিওন লম্বোগের লেখা বিশেষ সিরিজের পঞ্চম অংশ। সিরিজের আগের লেখাগুলো পড়ুন যথাক্রমে-

   

About

Popular Links

x