Thursday, June 04, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

মণিপুরের হিংসা

দুই গোষ্ঠীর মধ্যে সশস্ত্র সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে দেড় শতাধিক মানুষের। ষাট হাজারের বেশি মানুষ ঘর ছেড়ে পালিয়েছেন অন্যত্র

আপডেট : ২১ জুলাই ২০২৩, ০২:৫৫ পিএম

বাংলাদেশের সীমান্তঘেঁষা উত্তর-পূর্ব ভারতীয় রাজ্য মণিপুরে হিংসার লেলিহান শিখা ক্রমশ ভারতকে ছেয়ে  নিছে অসহনীয়-অস্বস্তিকর এক কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলীতে। জমি এবং ক্ষমতার দখল নিয়ে মণিপুরের দুই প্রতিদ্বন্দ্বী জনগোষ্ঠী মেইতি এবং কুকিদের মধ্যে পুরনো বিরোধ ক্রমেই দাঁত-নখ বের করেছে।  

হিংসার এই কালো ধোঁয়া, ভারতের সংসদে বাদল অধিবেশন চলাকালীন দেশীয় রাজনীতিকে এবং সামগ্রিক স্থিতাবস্থা কে ক্রমাগত ঘোলাটে করছে। সম্প্রতি, ইন্টারনেটে দুই কুকি নারীকে নগ্ন প্যারেড করানো এবং যৌন নির্যাতনের একটি ভয়ঙ্কর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিবাদ তোলে। 

ভারতের  প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মণিপুরের ঘটনাকে যেকোনো সভ্য জাতির জন্য লজ্জাজনক আখ্যা দিয়ে এর উপযুক্ত শাস্তির ঘোষণা করেন।

বাংলাদেশ ছাড়াও মণিপুরের সীমান্ত আছে মিয়ানমারের সঙ্গে। এই মেইতি এখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনবসতি। তারপরেই আছে কুকি এবং নাগারা, যারা মূলত সংখ্যালঘু হিসেবে পরিগণিত হয়। দুই গোষ্ঠীর মধ্যে সশস্ত্র সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে দেড় শতাধিক মানুষের। ষাট হাজারের বেশি মানুষ ঘর ছেড়ে পালিয়েছেন অন্যত্র। মে মাস থেকে দুই গোষ্ঠীর বিবাদ ভয়াবহ আকার ধারণ করে সামরিক এবং আধা সামরিক বাহিনীসহ পুলিশ পরিস্থিতি সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। অবশ্য পুলিশের নিষ্ক্রিয় ভূমিকাও প্রশ্নের মুখে। 

অস্থিরতার মাত্রা এতই যে পুলিশের অস্ত্রাগার লুট হয়, চার্চ ভেঙে দেওয়া হয়, চুরমার হয় মন্দিরও। এর সঙ্গে সঙ্গে উঠে আসছে ধর্মীয় রাজনীতি। তবে মণিপুরের এই সহিংসতার ঘটনা কোনোভাবেই ধর্মকেন্দ্রিক না। এই সংঘাত জাতিতত্ত্বকেন্দ্রিক।  

দেশের ভেতরে এবং বাইরে ভারতবিদ্বেষী কিছু গোষ্ঠী এই ঘটনাকে ধর্মীয় দাঙ্গার তকমা দেওয়ার অভিসন্ধি নিয়ে আছেন।

মূলত "উপজাতি" অধিকার নিয়ে দাবিদার মেইতিদের সঙ্গে মণিপুরে কুকি এবং প্রভাবশালী মেইতি সম্প্রদায়ের মধ্যে গভীর শত্রুতা দিন দিন তিক্ত হয়ে উঠছে। কুকি এবং মেইতি উভয়ের জীবন ও সম্পত্তির ক্ষতি ভয়াবহ মাত্রা নিয়েছে। 

কুকিরা বীরেন সিংয়ের নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন। মণিপুর রাজ্য পুলিশ, এবং সশস্ত্র বাহিনী সবাই নাকি নিস্ক্রিয়। তাদের দাবি, মেইতিরা কুকি গ্রাম ধ্বংস করে এবং কুকি সম্প্রদায়ের ওপর আক্রমণ চালায়।

মেইতিদের দাবি, ভারত স্বাধীনতা লাভের আগে তারা "উপজাতি" হিসেবে স্বীকৃত ছিল। মণিপুর ১৯৪৯ সালে ভারতীয় ইউনিয়নে যোগদান করে। তবে ভারতীয় ইউনিয়নে মণিপুর অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর তারা সেই মর্যাদা হারায়। এটি বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের সঙ্গে সংঘর্ষের দিকে ধাবিত করে, যারা এই "বঞ্চনার" তীব্র বিরোধিতা করেছিল। অন্যান্য উপজাতিরাও মেইতিদের অনুভূত "অন্যায়" সুবিধা নিয়ে অসন্তুষ্ট ছিল। তারা মণিপুরে মেইতিদের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করার দাবি জানিয়েছে। 

প্রকৃতপক্ষে, এমনকি বিধানসভায়ও তাদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। 

মেইতিরা রাজ্যের মোট জনসংখ্যার ৫০%-এরও বেশি। বিধানসভায়ও তাদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। কুকিরা মণিপুরের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৫%। 

এমন পরিস্থিতিতে যদি তাদের বিস্তারিত "উপজাতীয়" মর্যাদা দেওয়া হয়, তাহলে এটি কুকি-নাগা এবং অন্যান্য জাতিগোষ্ঠী শিক্ষা এবং চাকরি ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়বে। 

সম্প্রতি মণিপুর ইস্যুতে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে গৃহীত রেজুলেশন নিয়ে সমালোচনা হয়েছে। ইইউ রেজোলিউশনে বলা হয়েছে যে এটি "মণিপুরে সহিংসতা, জীবনহানি এবং সম্পত্তি ধ্বংসের তীব্র নিন্দা করে" এবং "বিজেপি দলের নেতৃস্থানীয় সদস্যদের দ্বারা নিয়োজিত জাতীয়তাবাদী বক্তব্যকে কঠোর ভাষায় নিন্দা জানায়"। ইইউ সশস্ত্র বাহিনী বিশেষ ক্ষমতা আইন (এএফএসপিএ)  বাতিলের কথা বলেছে । উদ্বেগ দেখিয়েছে ইন্টারনেট বন্ধ নিয়েও।

প্যারিসে একের পর হিংসার ঘটনায় নিস্ক্রিয়  থাকা ইউরোপীয়ান পার্লামেন্ট মণিপুরের ঘটনায় উদ্বেগ দেখানোর পিছনে রয়েছে ভারতবিদ্বেষী গোষ্ঠীর অদৃশ্য হাত। মণিপুরে  ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের কোনো লোকাস স্ট্যান্ডি নেই। 

কুকিরা মণিপুরে মেইতিদের আধিপত্যকে  প্রতিহত করতে সংঘবদ্ধ। তুলে নিয়েছে অস্ত্র । অবৈধ অভিবাসী, মাদক পাচার, আফিম চাষ, এসওও কার্যকলাপ (সশস্ত্র গোষ্ঠী), জমির মালিকানা নিয়ে এই বিবাদ আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। রাজ্যে এবং কেন্দ্র সরকারে রয়েছে বিজেপি। তাই মণিপুরে প্রশাসনিক ব্যর্থতা ঢাকতে,  প্রশ্ন উত্থাপনকারী কণ্ঠস্বরকে  বন্ধ   করা বাদ দিয়ে, সরকারের উচিৎ অবিলম্বে শান্তি ফেরানো।

বৈচিত্র্য ভারতের বাহার, এদেশের অস্মিতা। তাই এই জাতিগত সহিংসতা ভারতের কাছে গুরুতর উদ্বেগের। তবে এটি সম্পূর্ণভাবেই ভারতের অভ্যন্তরীণ সমস্যা। ভারত ও মণিপুর সরকারকে অবিলম্বে শান্তি পুনরুদ্ধার করতে হবে। অন্যথায় ওই নৈরাজ্যের কালো ধোঁয়া গ্রাস করতে পারে মিজোরাম কিংবা পুরো উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলোকে।


অয়নাংশ মৈত্র, ভারতীয় সাংবাদিক ও পররাষ্ট্রনীতি গবেষক।


প্রকাশিত নিবন্ধ লেখকের ব্যক্তিগত মতামত। ঢাকা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ এর জন্য দায়ী নয়।

   

About

Popular Links

x