Wednesday, July 22, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

তরুণদের মধ্যে যে কারণে ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ছে

ফাস্ট ফুড, প্রক্রিয়াজাত খাবার, ধূমপান, এবং মদ্যপান ক্যান্সারের অন্যতম কারণ

আপডেট : ২০ জানুয়ারি ২০২৫, ০৬:৩৮ পিএম

দৈনন্দিন জীবনযাত্রার পরিবর্তনের কারণেই বাড়ছে ক্যান্সারে আক্রান্তের সংখ্যা। তার মধ্যে স্তন, ফুসফুস, মুখ, পাকস্থলী, বৃহদন্ত্রের ক্যান্সারের রোগীর সংখ্যা ক্রমে বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যান্সার সোসাইটির একটি সমীক্ষা দাবি করেছে, কমবয়সিদের মধ্যেই ক্যান্সার বেশি ডালপালা মেলছে। এর অন্যতম বড় কারণ হলো জীবনযাপনে অসংযম। বয়স বাড়লে তবেই ক্যান্সার হয়, এই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। ক্যান্সারে আক্রান্ত মানুষদের গড় বয়স হিসাব করে দেখা যাচ্ছে, প্রতি পাঁচজনে এমন এক জন আছেন যার ক্যান্সার ধরা পড়েছে ৩৫ বছরের নিচে।

ভারতীয় ক্যান্সার চিকিৎসক শুভদীপ চক্রবর্তী সতর্ক করে বলেছেন, কমবয়সিরা মেয়েরাই বেশি স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত। তার কথায়, “দেশে নারীদের মধ্যে স্তন ক্যান্সারের হার ক্রমশ বাড়ছে। এর মধ্যে গ্রামীণ এলাকার একটি বড় অংশও রয়েছে। স্তন ক্যান্সারের পাশাপাশি নারীদের মধ্যে এখন আরও তিনটি ক্যান্সারের প্রকোপ ভালো মাত্রায় দেখা যাচ্ছে। তা হলো, জরায়ুমুখ, জরায়ু ও ডিম্বাশয়ের ক্যান্সার।” দীর্ঘদিন ধারে পেট ফুলে যাওয়া, মোটা হওয়া, হজমের গোলমাল, ঋতুস্রাবের পরে রক্তপাত, অনিয়মিত ঋতুস্রাবের মতো সমস্যা দেখা গেলে তা উপেক্ষা করেন নারীরা। অসচেতনতাই ক্যান্সার বৃদ্ধির অন্যতম বড় কারণ বলে মনে করছেন চিকিৎসক। তা ছাড়া, এখন অধিকাংশ নারীই গর্ভধারণ করছেন অনেক দেরিতে। প্রথম সন্তান আসছে ৩৪ থেকে ৩৫ বছর বয়সে, যা স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। তা ছাড়া, এখনকার অনেক মেয়েই সন্তানকে স্তন্যপান করাতে চান না, এই প্রবণতাও স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি অনেকখানিই বাড়িয়ে দেয়।

ক্যান্সার আচমকা হয় না। এর বীজ দীর্ঘ সময় ধরেই রোপিত হতে থাকে শরীরে। এর নেপথ্যে আছে অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভাসও। এখনকার শিশুরাও সুষম খাবারের বদলে প্রক্রিয়াজাত খাবার খেতে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে। এই সব খাবারে এমন রাসায়নিক থাকে, যা ক্যান্সারের আশঙ্কা বাড়িয়ে দেয়। চিকিৎসক জানাচ্ছেন, অনেক নামি ব্র্যান্ডে যে সব প্রক্রিয়াজাত মাংস দিয়ে সসেজ, বার্গার তৈরি হচ্ছে, সেই মাংসের স্বাদ বাড়াতে প্রাণীদের বিশেষ হরমোন ইঞ্জেকশন দেওয়া হয়। এই হরমোন মানুষের শরীরে ঢুকলে মানবশরীরের স্বাভাবিক হরমোনের ভারসাম্য বিগড়ে দিতে পারে। সে কারণেই দেখা যাচ্ছে, এখন সময়ের আগেই ঋতুবন্ধ হচ্ছে নারীদের অথবা ঋতুস্রাব শুরুর সময় এগিয়ে আসছে অনেকটাই। আগে ১২-১৩ বছর বয়সে ঋতুস্রাব শুরু হত, এখন ৮-৯ বছর বয়সি শিশুরও ঋতুস্রাব শুরু হচ্ছে, যা পরবর্তী সময়ে গিয়ে স্তন ও জরায়ুমুখের ক্যান্সারের আশঙ্কা বাড়িয়ে দিচ্ছে।

নিউক্লিয়ার মেডিসিনের চিকিৎসকদের বক্তব্য, কমবয়সিদের মধ্যে কোলন, অগ্ন্যাশয়ের ক্যান্সারের ঝুঁকিও বাড়ছে। মুখ ও গলার ক্যান্সার উত্তরোত্তর বেড়ে চলেছে কমবয়সি পুরুষদের। তামাকজাত নানা দ্রব্য, যেমন সিগারেট বা বিড়ি, গুটখা, জর্দা, খৈনি থেকে বাড়ছে মুখ ও গলার ক্যান্সারের ঝুঁকি। মুখ ও গলার ক্যান্সার কিন্তু এক জায়গায় থেমে থাকে না, ধীরে ধীরে লসিকা গ্রন্থি হয়ে ফুসফুসেও ছড়িয়ে পড়ে। দেখা যাচ্ছে, মুখ ও গলা-ঘাড়ের ক্যান্সারে আক্রান্তদের একটা বড় অংশের বয়স ৪০ থেকে ৬০। ১৮-২৫ বছরের ছেলেমেয়েদেরও এই রোগ হচ্ছে।

আরও একটি ক্যান্সার রীতিমতো মহামারির চেহারা নিচ্ছে, তা হল জরায়ুমুখের ক্যান্সার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান বলছে, অত্যধিক নেশার প্রকোপ, ঋতুস্রাবের সময়ে পরিচ্ছন্নতার অভাব, অসুরক্ষিত যৌনজীবন, মুঠো মুঠো জন্মনিয়ন্ত্রক বড়ি খাওয়ার অভ্যাস এর অন্যতম বড় কারণ। সচেতনতার অভাবই এই ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে, অথচ প্রথমে ধরা পড়লে এই রোগ সেরে যেতে পারে পুরোপুরি। প্যাপ স্মিয়ার, এইচপিভি, ভিআইএ, কলপোস্কোপি-র মতো অনেক সহজ পদ্ধতি এসে গিয়েছে। তার পরেও ২৫ পেরোনো নারীদের অধিকাংশই বছরে এক বার এই সব রুটিন পরীক্ষার ব্যাপারে উদাসীন।

অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাত্রার কারণে গত ২০ বছরে পাকস্থলী, বৃহদন্ত্রের ক্যান্সারে আক্রান্তের হার ৮% থেকে বেড়ে ১৬% হয়েছে বলেও জানাচ্ছেন চিকিৎসকেরা।

ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতে হলে জীবনযাপনে সংযম আনতেই হবে। ক্যান্সার থেকে রেহাই পাওয়ার দু’টি উপায় আছে- “প্রিভেনশন অঙ্কোলজি”। এর অর্থ, ক্যান্সারের জন্য দায়ী এমন অভ্যাস, যেমন, ধূমপান, তামাক চিবোনো, মদ্যপান ছাড়তে হবে ও খাদ্যাভ্যাসে বদল আনতে হবে। দ্বিতীয় উপায়টির পোশাকি নাম “আর্লি ডিটেকশন” অর্থাৎ, নিয়মিত চেক-আপ করাতে হবে। যাদের পরিবারে ক্যান্সারের ইতিহাস রয়েছে তাদের আরও অনেক বেশি সচেতন হতে হবে।

ওজন নিয়ন্ত্রণ সবচেয়ে আগে জরুরি। ছোট থেকেই ভুলভাল খাওয়ার অভ্যাস পরবর্তী কালে “মেটাবলিক সিনড্রোম”-এর কারণ হয়ে ওঠে, যা পাকস্থলী, অগ্ন্যাশয়, কোলন ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। সব রকম জাঙ্ক ফুড ও কৃত্রিম রং মেশানো খাবার খাওয়া বন্ধ করে, ফাইবার জাতীয় খাবার যেমন দানাশস্য, বাদাম, বীজ, সবজি ও ফল বেশি করে খেতে হবে। নিয়মিত শরীরচর্চার কোনো বিকল্প নেই। ধূমপান ও মদ্যপানের নেশা ছেড়ে দিলেই ভারো। বয়স ত্রিশ পেরোলে কিছু স্ক্রিনিং টেস্ট করিয়ে রাখা জরুরি। যেমন, নারীদের প্রতি মাসে নিজের স্তন পরীক্ষা, প্রতি বছর ম্যামোগ্রাম টেস্ট, প্যাপ টেস্ট করানো জরুরি। পুরুষদের “পিএসএ টেস্ট” বা “প্রস্টেট দিয়ে অ্যান্টিজেন টেস্ট” করিয়ে রাখা ভালো।

   

About

Popular Links

x