সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে সম্প্রতি সাধারণ মানুষের মুখে মুখে ফিরছিল একটি নাম- আদম তমিজী হক। ফেসবুকে একাধিক লাইভ ভিডিওতে এসে তিনি ঘটান নানান বিতর্কিত কর্মকাণ্ড, বলেন আপত্তিকর কথাবার্তা। যার পরিপ্রেক্ষিতে মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে, কে এই আদম তমিজী হক?
শুরু করা যাক তার ব্যক্তিগত পরিচয় দিয়ে। আদম তমিজী একজন ব্যবসায়ী। শিল্পগোষ্ঠী “এটি হক লিমিটেড”-এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর তিনি। তার বাবা ব্যারিস্টার তমিজী হক ছিলেন হক গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের প্রতিষ্ঠাতা। ১৯৪৭ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে দেশের বিস্কুট এবং ব্যাটারি শিল্পে শক্তিশালী অবস্থান রয়েছে হক গ্রুপের।
বাবার মৃত্যুর পর হক গ্রুপের নেতৃত্বে আসেন আদম। প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং ডিরেক্টরের দায়িত্ব বুঝে নেন তিনি।
এদিকে, আদম প্রভাব খাটিয়ে একাই তাদের মৃত বাবার সম্পত্তিতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন বলে অভিযোগ করেন তার বোন। এটি নিয়ে একটি বেসরকারি টেলিভিশনে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনও প্রচারিত হয়।

আদম তমিজী হকের জন্ম ১৯৭৬ সালের ২৯ ডিসেম্বর ঢাকার ইস্কাটনে। পরিবারের ইচ্ছায় তিনি ছোটবেলায় বিদেশে পড়তে যান। তবে পড়াশোনা শেষ করে দেশেই ফিরে আসেন। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব মিডলসেক্স থেকে তিনি স্নাতক সম্পন্ন করেন। দেশে ফিরে মনোনিবেশ করেন পারিবারিক ব্যবসায়।
২০১১ সালে ম্যানেজিং ডিরেক্টর পদটি বাগিয়ে আদম তমিজী হয়ে ওঠেন এটি হক লিমিটেডের সর্বেসর্বা। তার ব্যক্তিগত ওয়েবসাইটের তথ্য বলছে, আদমের নেতৃত্ব, পরিকল্পনা এবং জনমুখী কার্যকলাপের কারণে ব্যবসার পরিসর বাড়ে বহুগুনে।
২০১৭ সালে “মানবিক বাংলাদেশ” নামে একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কিছু জনকল্যাণমূলক কাজ করে আদম তমিজীর রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রবেশের প্রচেষ্টা শুরু। ওই বছরের নভেম্বরে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের তৎকালীন মেয়র আনিসুল হকের মৃত্যুর পর বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী উত্তর সিটিতে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। আদম তমিজীও ছিলেন তাদের মধ্যে একজন।
রাজনীতিতে আসার কারণ জানতে চাইলে তিনি একাধিক গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দাবি করেন, রাজনীতি নিয়ে তার পড়াশোনা আছে এবং দীর্ঘদিন ধরে এই অঙ্গনে প্রবেশের অভিপ্রায় তার।
আদমকে বলতে শোনা যায়, তিনি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আওয়ামী লীগের সঙ্গে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট। তার বাবা ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ।
“একজন ব্যবসায়ী হিসেবে সাধারণ মানুষকে বিভিন্নভাবে সহায়তার ইচ্ছা আছে আমার। বৃহৎ পরিসরে তাদের জন্য কাজ করার ইচ্ছা থেকে আমার রাজনীতিতে আসা। বঙ্গবন্ধুর আদর্শে, প্রধানমন্ত্রীর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে জনগণের সেবা করার ইচ্ছা আছে আমার,” বলেন আদম তমিজী।
২০১৭ সালে আদম তমিজী হক আওয়ামী লীগের কোনো কমিটিতে ঠাঁই পাননি। তবে দলটির সহযোগী সংগঠন তাঁতী লীগের ঢাকা উত্তর সিটি কমিটি অনুমোদন পেলে সেখানে উপদেষ্টা হিসেবে নাম আসে তার।

তবে লেগে ছিলেন আদম তমিজী। আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে অব্যাহত যোগাযোগ ২০২০ সালে তাকে ঢাকা উত্তর সিটি শাখা কমিটিতে জায়গা পেতে সহায়তা করে। তবে দলীয় কর্মকাণ্ডে খুব বেশি সক্রিয় ছিলেন না আদম তমিজী। বরঞ্চ মানবিক বাংলাদেশ নামের প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে জনসেবামূলক কাজেই তাকে বেশি দেখা গেছে।
সম্প্রতি আদম তমিজী অভিযোগ করেন সরকারের এক প্রতিমন্ত্রী তার গাজীপুরের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দখলের পাঁয়তারা করছেন। প্রতিষ্ঠান বাঁচাতে তাকে বিদেশ থেকে বাংলাদেশে চলে আসতে হয়।
এরপর আদম তমিজী একাধিকবার ফেসবুক লাইভে এসে তার বাংলাদেশি পাসপোর্ট পোড়ান এবং নারী নেতৃত্ব, আওয়ামী লীগ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেন।
বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জেরে তাকে তাৎক্ষণিকভাবে দলীয় পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় এবং আওয়ামী লীগের ঢাকা উত্তর শাখা তাকে বহিষ্কার করে। সংগঠনটি আদম তমিজীর এসব কর্মকাণ্ডের কারণ খুঁজতে তদন্তেরও ঘোষণা দেয়।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা বলেন, দল তার কাছ থেকে এক হাজার কোটি টাকা নিয়েছে এমন অভিযোগ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও ভিত্তিহীন।



