Tuesday, May 21, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

গণ্ডগ্রাম পাথালিয়ার কৃষ্ণার স্ট্রাইকার হয়ে ওঠার গল্প

খেলতে না পেরে জেদি কৃষ্ণা খাওয়া-দাওয়াই ছেড়ে দিয়েছিলেন। শেষমেষ অনুমতি দিতে বাধ্য হয়েছেন বাবা-মা

আপডেট : ০৮ মার্চ ২০২৪, ১২:৪৮ পিএম

ছোটবেলা থেকেই ফুটবলপ্রেমী কৃষ্ণা। সারাক্ষণ পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে মেতে থাকতেন ফুটবল নিয়ে। দিনের বেশিরভাগ সময় খেলার জন্য বাড়ির বাইরে থাকায় জুটত মায়ের বকাঝকা। পড়াশোনায় অমনোযোগী মেয়েটি ছেলেদের সঙ্গে ফুটবল নিয়ে মেতে থাকায় প্রতিবেশীরা নানান কথা বলত। অতিষ্ঠ হয়ে বল কেড়ে নিয়ে কেটে ফেলতেন তার মা। একাধিকবার বন্ধ করে দিয়েছেন খেলা। 

থেমে যাননি কৃষ্ণা। খেলতে না পেরে জেদি কৃষ্ণা খাওয়া-দাওয়াই ছেড়ে দিয়েছিলেন। শেষমেষ খেলার অনুমতি দিতে বাধ্য হয়েছেন বাবা-মা।

টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রাম উত্তর পাথালিয়ার কৃষ্ণা এখন বাংলাদেশ নারী জাতীয় দলের স্ট্রাইকার। পরিণত হয়েছেন সারাদেশের তরুণ নারী ফুটবলারদের আইকনে।

পরিবারের সঙ্গে কৃষ্ণা রানী সরকার/ঢাকা ট্রিবিউন

কৃষ্ণার বাবা বাসুদেব সরকার একজন কৃষক। আর মা নমিতা রানী গৃহিণী। দুই ভাই-বোনের মধ্যে বড় কৃষ্ণার জন্ম ২০০১ সালের ১ জানুয়ারি। ফুটবলে আনুষ্ঠানিক হাতেখড়ি ২০১০ সালে উপজেলা পর্যায়ে বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব আন্তঃপ্রাথমিক ফুটবল টুর্নামেন্টে। সেবার কৃষ্ণার নেতৃত্বে উত্তর পাথালিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় উপজেলা পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হয়। ওই টুর্নামেন্টে কৃষ্ণা সেরা খেলোয়াড় কৃষ্ণার খেলায় মুগ্ধ হন সূতি ভি.এম.পাইলট মডেল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের শরীরচর্চা বিষয়ের শিক্ষক গোলাম রায়হান বাপন।
 
তার অসাধারণ নৈপূণ্য দেখে শিক্ষক গোলাম রায়হান নিজ উদ্যোগে কৃষ্ণার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এরপর কৃষ্ণাকে তার স্কুলে বিনা বেতনে ভর্তি করান। সেখান থেকেই ফুটবল চর্চার অবাধ সুযোগ পান কৃষ্ণা।

কৃষ্ণার ফুটবল নৈপূণ্য আর বিশেষ ভূমিকায় জাতীয় স্কুল ও মাদ্রাসা ফুটবল প্রতিযোগিতা ২০১১, ২০১২ এবং ২০১৩ সালে পরপর তিনবার জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। জাতীয় পর্যায়ে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৪ বালিকা ফুটবল দল গঠন করা হলে কৃষ্ণাসহ একই স্কুল থেকে আরও দুই কিশোরী স্কোয়াডে জায়গা করে নেন।

২০১৫ সালে অনুষ্ঠিত এএফসি অনূর্ধ্ব-১৪ আঞ্চলিক ফুটবলে কৃষ্ণার নেতৃত্বে প্রথমবারের মতো শিরোপা জেতে বাংলাদেশ। পরের বছর ফের এই টুর্নামেন্টের শিরোপা ঘরে তোলে বাংলাদেশ। তবে বয়সসীমার কারণে পরেরবার দলে ছিলেন না কৃষ্ণা। একই বছর ঢাকায় হওয়া এএফসসি অনূর্ধ্ব-১৬ ফুটবলের বাছাইয়ে গ্রুপপর্বে চ্যাম্পিয়ন হয়ে চূড়ান্ত পর্বে উত্তীর্ণ হয় বাংলাদেশের মেয়েরা। সেই দলের অধিনায়ক ছিলেন কৃষ্ণা রানী সরকার। একই সঙ্গে সেই আসরে ৮ গোল করে দলকে সামনে থেকেই নেতৃত্ব দেন ফুটবলের এ বিস্ময় কন্যা।

দলকে অজস্র সুন্দর মুহূর্ত উপহার দিয়েছেন কৃষ্ণা/ঢাকা ট্রিবিউন

২০১৭ সালে কৃষ্ণার নেতৃত্বেই থাইল্যান্ডে এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ ফুটবলের মূল পর্বে খেলার গৌরব অর্জন করে লাল-সবুজ জার্সিধারীরা। ওই বছরের প্রথম দিকে ভারতে অনুষ্ঠিত সাফ টুর্নামেন্টে রানার্সআপ হয় বাংলাদেশ। যে দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন কৃষ্ণা।
২০২২ সালে নেপালের সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে স্বাগতিক নেপালকে ৩-১ গোলে হারিয়ে শিরোপা জিতে ইতিহাস গড়ে বাংলাদেশ। দেশের হয়ে তিন গোলের মধ্যে দুটোই করেন কৃষ্ণা রানী সরকার।

কৃষ্ণার মা নমিতা রানী সরকার বলেন, “একসময় টাকার অভাব ও গ্রামের মানুষের কটূকথার কারণে মেয়েকে ফুটবল খেলতে বারণ করতাম। কৃষ্ণার ইচ্ছার কাছে সেইসব মানুষের মুখ বন্ধ হয়ে গেছে। সে এখন দেশের গৌরব।”

বিশ্ব নারী দিবস প্রসঙ্গে কৃষ্ণা রানী সরকার ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, “নারীদের জন্য আলাদা কোনো দিবস নেই। প্রতিদিনই নারীদের দিবস। প্রথম অবস্থায় পরিবার থেকে কোনো সাপোর্ট পাইনি। বকাঝকাও খেতে হয়েছে। পাশাপাশি এলাকার মানুষের কাছ থেকে কটাক্ষও শুনতে হয়েছে। তবে আমি নিয়মিত ফুটবল খেলা চালিয়ে গিয়েছি।”

এই স্ট্রাইকার আরও বলেন, “পরিবার আর্থিক অবস্থা খারাপ হওয়ায় নিজের খরচ নিজেকেই বহন করতে হয়েছে। এখন আমিই পরিবারের যাবতীয় খরচ বহন করছি।”

About

Popular Links