হান্সি ফ্লিকের ছোঁয়ায় বার্সেলোনার সব ফুটবলারের মধ্যেই এসেছে দারুণ ইতিবাচক পরিবর্তন। তবে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়েছেন যিনি, তিনি রাফিনিয়া। মৌসুম শুরুর আগে ক্লাবটি যাকে বিক্রি করে দেবে বলে চর্চা চলছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, যিনি নিজেই কাতালুনিয়া ছেড়ে অন্যত্র ঠিকানা খুঁজছিলেন, সেই রাফিনিয়াই এখন বার্সেলোনার একাদশের মধ্যমণি; দলের সবচেয়ে পরিশ্রমী ও ফলপ্রসূ খেলোয়াড়।
লা লিগা, কোপা দেল রে হোক কিংবা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, বার্সার আক্রমণভাগের অপরিহার্য নামে পরিণত হয়েছেন ২৮ বছর বয়সী এই ব্রাজিলীয়। নিজে গোল করে এবং সতীর্থদের দিয়ে গোল করিয়ে ইউরোপীয় ফুটবলের সমালোচকদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছেন এই ফরোয়ার্ড। আগামী ব্যালন ডিওরের জন্যেও তাকে যোগ্যতমদের তালিকার উপরের দিকে স্থান দিচ্ছেন অনেকে। এরই মাঝে একের পর এক রেকর্ড ছুঁয়ে চলেছেন তিনি।
গত রাতে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের কোয়ার্টার ফাইনালের প্রথম লেগে ঘরের মাঠে বরুসিয়া ডর্টমুন্ডকে ৪-০ গোলে বিধ্বস্ত করে সেমিতে এক পা দিয়ে রেখেছেন হান্সি ফ্লিকের শিষ্যরা। এই ম্যাচে একটি গোল ও দুটি অ্যাসিস্ট করে দলের জয়ে দারুণ ভূমিকা রাখেন রাফিনিয়া। এতে করে ইউরোপের এলিট ক্লাবগুলোর ফ্ল্যাগশিপ এই টুর্নামেন্টের চলতি আসরে তার গোলসংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১২টি। ১১ ম্যাচে ১২ গোল করার পাশাপাশি ৭টি অ্যাসিস্টও করে ফেলেছেন তিনি। আর এতেই বার্সেলোনার আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি লিওনের মেসির পাশে লিখিয়েছেন নিজের নাম।
চ্যাম্পিয়ন্স লিগে চলতি মৌসুমে এখন পর্যন্ত মোট ১৯টি গোলে অবদান রেখে ফেলেছেন রাফিনিয়া, যা ২০১১-১২ মৌসুমে মেসির গড়া রেকর্ডের সমান। সেবার ১৪টি গোল ও ৫টি অ্যাসিস্টের সাহায্যে এই কীর্তি গড়েন মেসি। তার এক যুগেরও বেশি সময় পর সেই রেকর্ডে ভাগ বসালেন রাফিনিয়া। অবশ্য সামনের ম্যাচে মেসিকে টপকে বার্সার ফুটবলার হিসেবে এই রেকর্ডটি নিজের করে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে তার সামনে।

তবে এটিই চ্যাম্পিয়ন্স লিগের এক মৌসুমে সর্বোচ্চ গোলে অবদান রাখার রেকর্ড নয়। রাফিনিয়া-মেসির ওপরে আরও তিনটি সংখ্যা রয়েছে, যার মধ্যে দুটিই ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর এবং একটি বায়ার্ন মিউনিখের জার্সিতে গড়েছিলেন রবের্ট লেভানডোভস্কি।
২০১৫/১৬ মৌসুমে রিয়াল মাদ্রিদের জার্সিতে ১৪ গোল ও ৬ অ্যাসিস্টে ২০ গোলে অবদান রাখেন রোনালদো। এরপর ২০১৯/২০ মৌসুমে ২১ গোলে অবদান রেখে (১৫ গোল, ৬ অ্যাসিস্ট) ওই রেকর্ড ছাড়িয়ে যান লেভানডোভস্কি। তবে তার সেই অসামান্য অর্জনও রোনালদোর সর্বোচ্চ গোলে অবদান রাখার রেকর্ড ভাঙতে ব্যর্থ হয়। ২০১১/১২ মৌসুমে ১৭ গোল ও ৫ অ্যসিস্টে মোট ২২ গোলে অবদান রেখে ইতিহাস হয়ে আছেন পর্তুগিজ মহাতারকা।

তবে দুর্দান্ত রাফিনিয়ায় সিআর সেভেনের সেই রেকর্ড এবার নড়বড়ে হয়ে গেছে। রোনালদোকে ছুঁতে আর তিনটি গোলে অবদান রাখা দরকার রাফিনিয়ার। কোয়ার্টারের ফিরতি লেগ এখন তার সামনে। এছাড়া ৪-০ গোলে এগিয়ে থাকায় ফিরতি লেগে অঘটন না ঘটলে সেমিফাইনালের দুটি ম্যাচও খেলতে পারেন এই ব্রাজিলীয়। ফলে ফাইনাল নিশ্চিতের আগেই তিনি বসতে পারেন রোনালদোর পাশে। তবে তিন ম্যাচ নয়, গতরাতের মতো আরেকটি পারফরম্যান্স উপহার দিলেই এক ম্যাচেই তা সত্যি হয়ে যেতে পারে।
গোলে অবদান রাখার এই রেকর্ডের পাশাপাশি এক মৌসুমে সর্বোচ্চ গোল করার রেকর্ডেও উল্লেখযোগ্য স্থানে উঠে এসেছেন রাফিনিয়া। ১১ ম্যাচে ১২ গোল নিয়ে তিনি গোলসংখ্যার বিচারে এই তালিকার ষষ্ঠ স্থানে এবং গোলদাতা হিসেবে রয়েছেন চতুর্থ স্থানে।
২০১১/১২ মৌসুমে ১৪ গোল করে তার উপরে রয়েছেন লিওনেল মেসি। এছাড়া ২০১৭/১৮ মৌসুমে ১৫ গোল করা রোনালদো রয়েছেন চতুর্থ স্থানে। ২০১৯/২০ মৌসুমে তার চেয়ে কম ম্যাচ খেলে ১৫ গোল করে তৃতীয় স্থানে রয়েছে লেভানডোভস্কির নাম। তবে ২০১৫/১৬ মৌসুমে ১৬ গোল এবং ২০১৩/১৪ মৌসুমে ১৭ গোল করে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের এই রেকর্ড নিজের দখলেই রেখেছেন ক্রিস্টিয়ানো।

হান্সি ফ্লিকের বার্সেলোনার চলতি মৌসুমে যা দাপট, তাতে তারা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে উঠে গেলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। এতে করে পোয়াবারো হবে রাফিনিয়ারও; আরও চার চারটি ম্যাচ খেলার সুযোগ পাবেন তিনি। আর এই সময়ে যদি দুটি গোল করেন, তবে সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় মেসির পাশে পঞ্চম স্থানে বসবেন, তিনটি গোল করলে রোনালদো ও লেভানডোভস্কির সঙ্গে বসবেন তৃতীয় স্থানে, আর চার ম্যাচে পাঁচটি বা তার বেশি গোল করে ফেললেই রোনালদোকে ছুঁয়ে, তাকে ছাড়িয়ে যাবেন বার্সেলোনার ব্রাত্য থেকে আদৃত হয়ে ওঠা এই ফুটবলার।
তবে শুধু এই রেকর্ডের সামনেই যে তিনি রয়েছেন, তা নয়। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি রেকর্ড গড়ে ইতিহাসের পাতায় ঢুকে পড়েছেন চলতি মৌসুমে বার্সেলোনাকে বহু ম্যাচে পথ দেখানো রাফিনিয়া। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ইতিহাসে এক মৌসুমে ১০টির বেশি গোল ও পাঁচটির বেশি অ্যাসিস্ট করা একমাত্র খেলোয়াড় তিনি।
এছাড়া, বার্সেলোনার হয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে ব্রাজিলীয় গোলদাতাদের তালিকায় তিনি রয়েছেন চতুর্থ স্থানে। সর্বোচ্চ ২১ গোল নিয়ে এই তালিকায় সবার উপরে নেইমার, ১৬ গোল নিয়ে দ্বিতীয় রিভালদো এবং ১৪ গোল নিয়ে তৃতীয় স্থানে রোনালদিনিয়ো।
গতরাতের তিনটিসহ সব মিলিয়ে চলতি মৌসুমে ক্লাবের হয়ে ৫০ গোলে অবদান রাখার মাইলফলকও স্পর্শ করেছেন রিও গ্রান্দে দো সুলে জন্ম নেওয়া এই ফুটবলার। এখন পর্যন্ত ৪৫ ম্যাচ খেলে ২৮টি গোল ও ২২টি অ্যাসিস্ট করেছেন তিনি, যা এক মৌসুমে তার ক্যারিয়ার সর্বোচ্চ। তবে জাতীয় দলের হয়ে আরও তিনটি গোলে অবদানের হিসাবে (২ গোল ও ১ অ্যাসিস্ট) ধরলে সংখ্যাটি দাঁড়ায় ৫৩-তে।

বার্সেলোনা ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলা রাফিনিয়ার কাঁধে যে ভরসার হাত রেখেছিলেন ফ্লিক, সেই আস্থার প্রতিদান তিনি দিয়ে চলেছেন অদম্য উৎসাহে। কোচ বলেছিলেন, রাফিনিয়াকে নিয়ে ‘বিশেষ পরিকল্পনা’ রয়েছে তার। আর ‘বিশেষ’ থেকে ‘প্রধান’ হয়ে উঠে তার কথার মান রেখে চলেছেন এই উইঙ্গার। চোট পেয়ে দলের সব অধিনায়ক যখন মাঠের বাইরে, তখন সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে কাণ্ডারি হয়ে উঠেছেন তিনি।
নতুন বছর পড়ার পর এখনও একটি ম্যাচও হারেনি বার্সেলোনা। ২০২৫ সালে খেলা ২৩ ম্যাচের ১৯টিই জিতেছে কাতালান জায়ান্টরা। অপরাজিত থেকেই মৌসুমের বাকিটা শেষ করার প্রত্যয় জানিয়েছেন ফ্লিক। ফলে সম্ভাব্য সব শিরোপাই যে জিততে চান তিনি, সে লক্ষ্যের কথা ঘুরিয়ে হলেও জানিয়ে দিয়েছেন।
ফ্লিকের কথা আমলে নিলে আরও ১৩ ম্যাচ খেলবে বার্সেলোনা। আর অপরাজিত থেকেই মৌসুম শেষ করলে স্প্যানিশ সুপার কাপের পর কোপা দেল রে, লা লিগা ও চ্যাম্পিয়ন্স লিগও ঘরে তুলে কোয়াড্রাপল জিতবে তার দল। আর এমন কীর্তি গড়ে ফেললে ফ্রান্স ফুটবলের আসন্ন ব্যালন দ’র অনুষ্ঠানে হয়তো সোনার বল উঁচিয়ে ধরবেন মাঠজুড়ে দাপিয়ে বেড়ানো রাফিনিয়াই।



