দীর্ঘ ৫৪ বছর পর আবারও চাঁদের কাছাকাছি পৌঁছেছে মানুষ। প্রায় ২,৫২,৭৬০ মাইল পথ অতিক্রম করে এবং চাঁদের পাশ দিয়ে ঘুরে পৃথিবীতে ফিরছেন “আর্টেমিস ২” মিশনের নভোচারীরা।
শুক্রবার (১০ এপ্রিল) যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় রাত ৮টা ৭ মিনিটে সান ডিয়েগো উপকূলের কাছে সমুদ্রে অবতরণের কথা রয়েছে ওরিওন মহাকাশযানটির।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাদের ফিরে আসতে প্রায় চার দিন সময় লাগবে। তবে ফেরার পথে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করা, যেখানে বাতাসের ঘর্ষণে ক্যাপসুলের বাইরের তাপমাত্রা ১৬০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত হতে পারে।
এর আগে, ১ এপ্রিল ১০ দিনের মিশন শুরু করেন নভোচারীরা। নাসার “আর্টেমিস ২” মিশনের মহাকাশযান ওরিওন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার নাসার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে যাত্রা শুরু করে। এই মিশনে অংশগ্রহণ করেছেন রিড ওয়াইজম্যান, ভিক্টর গ্লোভার, ক্রিস্টিনা কোচ ও জেরেমি হ্যানসেন।
এই মিশন মূলত একটি পরীক্ষামূলক অভিযান। নভোচারীরা চাঁদে অবতরণ করেননি; বরং মহাকাশযানের প্রযুক্তি, নেভিগেশন এবং জীবনধারণ ব্যবস্থা পরীক্ষা করা হয়েছে। মিশন সফল হলে পরবর্তী অভিযানে চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে মানুষ পাঠানোর পথ আরও সহজ হবে বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
নাসার নভোচারী ক্রিস্টিনা কোচ জানিয়েছেন, চাঁদের দিকে গভীরভাবে তাকিয়ে থাকিয়েছিলাম। এই মুহূর্তটা খুব অল্প সময়ের ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই মনে হয়েছিল আমি যেন সেই চাঁদের ভূদৃশ্যের ভেতরে চলে গেছি।
নভোচারী ভিক্টর গ্লোভার (প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নভোচারী) বলেছেন, “জানালা দিয়ে দেখা সেই দৃশ্য ছিল অত্যন্ত আবেগঘন অভিজ্ঞতা। মনে হয়েছিল, যেন কল্পনায় চাঁদের পৃষ্ঠে হাঁটছি।”
চাঁদের ফার সাইডে (দূরবর্তী অংশ) যা দেখলেন নভোচারীরা
চাঁদের 'ফার সাইড' অংশটি পৃথিবী থেকে কখনো সরাসরি দেখা যায় না। কিন্তু ৪,০৭০ মাইল উপর দিয়ে যাওয়ার সময় ওরিয়নের লেন্সে ধরা পড়েছে এই অংশ। এখানে অসংখ্য ক্রেটার, প্রাচীন আগ্নেয়গিরির চিহ্ন এবং উল্কাপাত,মহাজাগতিক রশ্মির আঘাতের চিহ্ন দেখতে পাওয়া যায়। প্রায় ছয় থেকে সাত ঘণ্টা ধরে নভোচারীরা এই অঞ্চল পর্যবেক্ষণ করেন। এ সময় পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন থাকে, যা কমিউনিকেশন ব্ল্যাকআউট নামে পরিচিত।
মিশনের আরেকটি বড় আকর্ষণ ছিল বিরল সূর্যগ্রহণের দৃশ্য। নভোচারীদের দৃষ্টিতে চাঁদ সূর্যকে ঢেকে দেওয়ার পরে প্রায় এক ঘণ্টা স্থায়ী পূর্ণগ্রহণ দেখা যায়, যা পৃথিবীতে সাধারণত কয়েক মিনিটের বেশি স্থায়ী হয় না। এ সময় সূর্যের বাইরের স্তরের গঠন স্পষ্টভাবে দেখা যায় এবং একই সঙ্গে মঙ্গল, শুক্র ও শনি গ্রহও দৃশ্যমান হয়।
মিশনের গুরুত্ব
এই মিশনের লক্ষ্য ছিল চাঁদে মানুষের উপস্থিতি এবং পরবর্তীতে মঙ্গল গ্রহে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি। চাঁদের ফার সাইড থেকে সংগ্রহ করা তথ্য, ছবি চাঁদ ও পৃথিবী সম্পর্কে মানুষের ধারণা বদলে দেবে। শুধু তাই নয়, নতুন গবেষণায় ব্যাপক ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করছেন বিজ্ঞানীরা।
এই মিশনটি শুধু একটি উড়ান নয়, বরং মানব মহাকাশযাত্রার ইতিহাসে এক মাইলফলক। ১৯৭২ সালের 'অ্যাপোলো ১৩' এর পর এই প্রথম কোনো নভোচারী দল চাঁদের কক্ষপথের বাইরে গিয়ে এত দূরে পৌঁছেছেন। ওরিয়ন মহাকাশযানটি চাঁদের পৃষ্ঠ থেকে মাত্র ৬,৫৪৫ কিলোমিটার দূরত্বে পৌঁছে চাঁদের অদেখা অংশের অসাধারণ ছবি তুলেছে এবং পৃথিবী থেকে সর্বোচ্চ ২,৫২,৭৫৬ মাইল দূরত্বে গিয়ে 'অ্যাপোলো ১৩' এর রেকর্ড ভেঙেছে।
ফেরার প্রস্ততি
সব কিছু ঠিক থাকলে শুক্রবার (১০ এপ্রিল) এই মহাকাশযান ফিরে আসবে। নাসা এই ঘটনাটি সরাসরি সম্প্রচার করবে। পৃথিবীতে ফেরার পথে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ধাপ হবে বায়ুমণ্ডলে পুনঃপ্রবেশ, যখন ক্যাপসুলটি ঘণ্টায় ২০ হাজার মাইলের বেশি গতিতে বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করবে এবং তাপমাত্রা ১,৬০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি হতে পারে। বায়ুমণ্ডল অতিক্রম করার পর ক্যাপসুলটি প্যারাশুট খুলে ধীরে নেমে উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ করবে।



