সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাম্প্রতিক সময়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে নতুন এক ট্রেন্ড- ‘আমি যদি আশির দশকের হতাম, তাহলে কেমন দেখাত?’ বর্তমান সময়ের ছবি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সাহায্যে বদলে আশির দশকের পোশাক, চুলের স্টাইল, মেকআপ, পরিবেশ ও পুরোনো দিনের ছবির আবহ তৈরি করছেন নেটিজেনরা।
সেপ্টেম্বরের শুরুতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এই ট্রেন্ড অল্প সময়েই ইনস্টাগ্রাম পেরিয়ে ফেসবুকেও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। সাধারণ ব্যবহারকারীদের পাশাপাশি তারকারাও নিজেদের আশির দশকের লুকে ছবি তৈরি করে শেয়ার করছেন।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, হঠাৎ আশির দশকের প্রতিই কেন এত আগ্রহ?
আশির দশকের ফ্যাশন ছিল আজকের ‘লেস ইজ মোর’ ধারণার একেবারেই বিপরীত। চওড়া কাঁধ, বড় চুল, উজ্জ্বল রং, ওভারসাইজড ব্লেজার, শোল্ডার প্যাড, বড় কানের দুল, সব মিলিয়ে পোশাক ও সাজসজ্জায় ছিল দৃশ্যমানতার প্রবল আকাঙ্ক্ষা।
বাংলাদেশেও এই দশকে পোশাক ও ফ্যাশনে আসে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। নারীদের পোশাকে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে পোলকা ডট, হল্টার-নেক ব্লাউজ, বড় হুপ কানের দুল ও কাঁধে কুঁচি দেওয়া হাতা। শাড়ির নকশা ও বুননেও আসে নতুনত্ব। জনপ্রিয় হয় ডিজাইনার শাড়ি, নকশিকাঁথার এমব্রয়ডারি ও টাই-ডাই।
পুরুষদের পোশাকেও বাড়তে থাকে পশ্চিমা প্রভাব। শার্ট, ট্রাউজার, ডেনিমের পাশাপাশি পাঞ্জাবি, ফতুয়া, লুঙ্গি ও স্যান্ডো গেঞ্জিও ছিল সমানভাবে পরিচিত। ঢাকার নিউমার্কেট, সায়েন্স ল্যাবরেটরি ও এলিফ্যান্ট রোড হয়ে ওঠে ফ্যাশনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
আজকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইনফ্লুয়েন্সারদের জায়গায় আশির দশকে ছিলেন চলচ্চিত্র তারকা, সংগীতশিল্পী ও টেলিভিশনের জনপ্রিয় মুখেরা। সিনেমা, গান, ম্যাগাজিন ও টেলিভিশন থেকেই তখনকার তরুণরা পোশাক ও চুলের স্টাইলের অনুপ্রেরণা নিতেন।
ভারতে অমিতাভ বচ্চন, শ্রীদেবী, রেখা ও পারভিন ববির মতো তারকারা ফ্যাশনে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিলেন। বাংলাদেশের দর্শকদের কাছেও ববিতা, কবরী, রুনা লায়লা, জাফর ইকবাল ও আজম খানের মতো তারকারা ছিলেন স্টাইল আইকন।
১৯৮২ সালে মুক্তি পাওয়া ‘ডিস্কো ড্যান্সার’ সিনেমার প্রভাবেও ঝলমলে পোশাক, টাইট প্যান্ট, জ্যাকেট ও ডিস্কো-স্টাইলের সাজ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। অন্যদিকে শ্রীদেবী ও রেখার সিনেমার মাধ্যমে শাড়ির সঙ্গে স্টাইলিশ ব্লাউজ, বড় গয়না ও আকর্ষণীয় হেয়ারস্টাইল জনপ্রিয়তা পায়।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রেও জাফর ইকবালের স্টাইল তরুণদের মধ্যে ব্যাপক প্রভাব তৈরি করেছিল। দশকের শেষ দিকে ‘বেদের মেয়ে জোসনা’ সিনেমার অঞ্জু ঘোষের সাজ, রুপার গয়না, বড় টিপ ও গ্রামীণ ঘরানার পোশাকও দেশজুড়ে নতুন ফ্যাশন প্রবণতা তৈরি করে।
তাহলে এখন কেন আশির দশক?
আশির দশকের প্রতি বর্তমান প্রজন্মের আকর্ষণের পেছনে রয়েছে নস্টালজিয়া, রেট্রো ফ্যাশন এবং এআই প্রযুক্তির সহজলভ্যতার মিশ্র প্রভাব।
ফ্যাশনে ইতোমধ্যে ফিরে এসেছে আশির দশকের বেশ কিছু উপাদান। ওভারসাইজড ব্লেজার, শোল্ডার প্যাড, হাই-ওয়েস্টেড জিনস, লেদার জ্যাকেট ও বোল্ড অ্যাকসেসরিজ এখনকার ফ্যাশনেও দেখা যাচ্ছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জেন-জির এমন এক সময়ের প্রতি আকর্ষণ, যে সময় তারা নিজেরা কাটায়নি। অর্থাৎ যে অতীত তাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার অংশ নয়, সেটিকেই কল্পনা করে দেখার আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
এআই হয়ে উঠেছে ‘টাইম মেশিন’
আগে আশির দশকের লুক তৈরি করতে প্রয়োজন হতো পুরোনো পোশাক, নির্দিষ্ট হেয়ারস্টাইল, মেকআপ, ভিনটেজ ক্যামেরা ও উপযুক্ত লোকেশন। এখন সেই কাজ কয়েকটি নির্দেশনাতেই করে দিতে পারে এআই।
একটি বর্তমান ছবি ব্যবহার করে মুহূর্তেই বদলে ফেলা যাচ্ছে পোশাক, চুল, মেকআপ, গাড়ি, ঘরের সাজ এমনকি ছবির রং ও টেক্সচারও। পুরোনো ছবির মতো দানাদার আবহ যোগ করে তৈরি করা যাচ্ছে আশির দশকের একটি কাল্পনিক মুহূর্ত।
ফলে এআই শুধু ছবি তৈরির প্রযুক্তি হিসেবে নয়, অনেকের কাছে অতীতকে কল্পনা করে দেখার এক ধরনের ‘টাইম মেশিন’ হয়ে উঠেছে।
আর এখানেই এই ট্রেন্ডের বিশেষত্ব। আশির দশকের মানুষ হওয়ার অভিজ্ঞতা না থাকলেও আজকের তরুণরা এআইয়ের মাধ্যমে একবার দেখে নিতে পারছেন, সেই সময়ে জন্মালে নিজেকে কেমন দেখাত?
সবকিছু যখন অতিরিক্ত নিখুঁত ও ডিজিটাল হয়ে উঠছে, তখন পুরোনো ছবির দানা, অসম্পূর্ণতা, রঙের ম্লানভাব আর সাদামাটা নন্দনতত্ত্বই যেন নতুন আকর্ষণ তৈরি করছে। ফলে আশির দশকে ফেরার এই প্রবণতা আসলে শুধু ফ্যাশনে ফিরে যাওয়া নয়; বরং প্রযুক্তির হাত ধরে অতীতকে নতুন করে আবিষ্কারের এক অভিনব চেষ্টা।



