Friday, June 05, 2026

সেকশন

English
Dhaka Tribune

হায় মার্কো, এতটাও নিষ্ঠুর হয় ভাগ্য!

রয়েস আবার কখনও বুন্দেসলিগা জেতার সুযোগ পাবেন নাকি, সেটি ফুটবল বিধাতাই ভালো জানেন

আপডেট : ২৮ মে ২০২৩, ০৬:৪৩ পিএম

বিড়ালের ভাগ্যে যেমন একদিন শিঁকে ছেঁড়ে, তেমনি এ মৌসুমেও বরুশিয়া ডর্টমুন্ডের হয়ে মার্কো রয়েসের বুন্দেসলিগা জেতার স্বপ্ন পূরণ হবে বলেই মনে হচ্ছিল। শেষ রাউন্ডের আগে বায়ার্নের চেয়ে ২ পয়েন্ট এগিয়ে থেকে শিরোপায় বরুশিয়া এক হাত দিয়েই রেখেছিল। দলের বিপদে সর্বদা পাশে থাকা রয়েসও ক্লাবের হয়ে দারুণ কিছু অর্জন করতেন।

একটি লিগ শিরোপা বরুশিয়ার জেতা উচিত অন্তত রয়েসের জন্যই। তিনি এর যোগ্য দাবিদার।

কিন্তু মৌসুমের শেষ ম্যাচে এসে বরুশিয়া ডর্টমুন্ড নিজেই ভজকট পাকিয়ে ফেলল। মেইঞ্জের বিপক্ষে প্রথমে দুই গোলের ব্যবধানে পিছিয়ে গিয়ে আর পরে পেনাল্টি মিসের মাশুল দিয়ে শেষ পর্যন্ত ২-২ গোলে ড্র করে পয়েন্ট হারায়। অন্যদিকে, শেষ মুহূর্তের গোলে কোলনকে ২-১ গোলে হারিয়ে ডর্টমুন্ডের সমান পয়েন্ট অর্জন করে বায়ার্ন। কিন্তু গোল ব্যবধানে এগিয়ে থাকায় শিরোপা ওঠে বাভারিয়ানদের হাতেই। 

মৌসুমের দ্বিতীয় ভাগের অধিকাংশ সময় সুবিধাজনক অবস্থানে থেকেও নিজেদের ভুলে পা হড়কে বুন্দেসলিগা শিরোপা জেতার সুযোগ হাতছাড়া করল বরুশিয়া ডর্টমুন্ড।

তীরে এসে তরী ডুবে যাওয়ায় হতাশ ডর্টমুন্ড শিবির/এএফপি

শৈশবের ক্লাবের হয়ে মার্কো রয়েসের বুন্দেসলিগা ট্রফি উঁচিয়ে ধরার স্বপ্নও ভেঙে গেল কাঁচের মতো। ক্যারিয়ারের গোধুলীলগ্নে বায়ার্ন মিউনিখের একচ্ছত্র দাপটে রয়েস আবার কখনও বুন্দেসলিগা জেতার সুযোগ পাবেন নাকি, সেটি ফুটবল বিধাতাই জানেন। কিন্তু ৩৩ বছর বয়সী এ জার্মান ফরোয়ার্ড সত্যিই বুন্দেসলিগা জিততে না পারলে হয়ত অবসরের পর স্টিভেন জেরার্ড, জেমি ক্যারাঘার, গর্ডন ব্যাঙ্কস, গ্যারি লিনেকার, ববি মুরের মতো কখনও লিগ না জেতা কিংবদন্তির তালিকায় তার নামটা লেখা হবে।

ক্লাব ফুটবল হোক কিংবা জাতীয় দল- জার্মান ফুটবল বরাবরই দলগত খেলার জন্য বিখ্যাত। যুগে যুগে জার্মানিতে অনেক তারকা ফুটবলার এলেও খুব কম খেলোয়াড়ই এককভাবে মহাতারকা হয়ে উঠেছেন। তবুও দলগত সাফল্যকেই প্রাধান্য দেওয়া জার্মানিতে কখনও কখনও একক দক্ষতায় আলো ছড়ানো উজ্জ্বল নক্ষত্ররা জন্মায়।

এমনই এক জার্মান নক্ষত্রের নাম মার্কো রয়েস। আর তিন দিন পরই ৩৪-এ পা দিতে যাওয়া এ জার্মান ফুটবলারের মূল পজিশন অ্যাটাকিং মিডফিল্ড বা উইং। ফুটবল মাঠে রয়েসের প্রধান শক্তির জায়গা ভার্সেটাইলিটি, দ্রুতগতি, দুর্দান্ত শুটিং এবং সঠিক সময়ে যথাযথ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা।

এক কথায় একজন মহাতারকা হয়ে ওঠার মতো সব উপাদানই রয়েসের মধ্যে ছিল। কিন্তু মার্কো রয়েস কি সত্যিই মহাতারকা হয়ে উঠতে পেরেছেন? কিংবা আরও নির্দিষ্টভাবে বললে- ক্যারিয়ারের শুরুতে রয়েসকে ঘিরে যে প্রত্যাশা ছিল, পড়ন্ত বেলায় এসে পেছনে ফিরলে কি সত্যিই সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে বলে মনে হয়?

রয়েসের অর্জনের ঝুলি কিন্তু কম ভারি না। ব্যক্তিগত অর্জনের কথা বললে তিনবার বুন্দেসলিগার বর্ষসেরা খেলোয়াড় এবং দুবার জার্মানির বর্ষসেরা ফুটবলার হয়েছেন। বরুশিয়া ডর্টমুন্ডের হয়ে দুবার ডিএফবি পোকাল (জার্মান কাপ) এবং তিনবার ডিএফএল সুপার কাপ (জার্মান সুপার কাপ) জয়ের স্বাদ পেয়েছেন। কিন্তু এগুলোও কি রয়েসের সামর্থ্যের জানান দিচ্ছে?

বরুশিয়া দর্শকরা হতাশ নন। দলের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানালেন তারা/এএফপি

ফুটবলে মার্কো রয়েসের হাতেখড়ি জন্মস্থান ডর্টমুন্ডের ক্লাব পোস্ট এসভি ডর্টমুন্ডে। কিন্তু সেখানকার একাডেমিতে তিনি ছিলেন মাত্র দুই বছর। এরপর রয়েস চলে আসেন বরুশিয়া ডর্টমুন্ডের একাডেমিতে। সেখানে প্রায় ১০ বছর কাটালেও ক্লাবটির মূল দলে তার জায়গা হয়নি। শেষ পর্যন্ত ১৬ বছর বয়সে তিনি বরুশিয়া ডর্টমুন্ড ছেড়ে তৃতীয় বিভাগের ক্লাব রট ওয়েইস অ্যাহলেনের অনুর্ধ্ব-১৯ দলে যোগ দেন।

দুই মৌসুম পরেই রয়েস ক্লাবের মূল দলে জায়গা করে নেন। সেখানে আরও দুই বছর কাটিয়ে ২০০৯ সালে তিনি যোগ দেন বরুশিয়া মনশেনগ্লাডবাখে। ফুটবলে রয়েসের উত্থানের শুরুটাও এখানেই। মনশেনগ্লাডবাখের জার্সিতেই বুন্দেসলিগায় নিজের প্রথম গোলের দেখা পান রয়েস, সেটিও এসেছিল ৫০ মিটারের দুরন্ত গতির এক স্প্রিন্টের মাধ্যমে।

বরুশিয়া মনশেনগ্লাডবাখের হয়ে মার্কো রয়েস নিজের সেরা সময়টা কাটান ২০১১-১২ মৌসুমে। এ মৌসুমে তিনি ক্লাবের হয়ে প্রথম ১৩ ম্যাচেই ১০ গোল করেন, যার মধ্যে ছিল বুন্দেসলিগায় তার প্রথম হ্যাটট্রিকও। ওই মৌসুমে তিনি বরুশিয়া মনশেনগ্লাডবাখের হয়ে বুন্দেসলিগায় ১৮ গোল এবং ১২ অ্যাসিস্টের মাধ্যমে তাদের চ্যাম্পিয়ন্স লিগের টিকেট নিশ্চিত করেন।

রয়েসের এমন উত্থানে বরুশিয়া ডর্টমুন্ডেরও টনক নড়ে। ১৬ বছর বয়সে যে রয়েসকে বরুশিয়া তাদের একাডেমি থেকে ছেড়ে দিয়েছিল, সেই রয়েসকেই দলে পেতে তারা ১৭ মিলিয়ন ইউরো খরচ করে। নিজের দলবদল নিয়ে রয়েস বলেছিলেন, “পরবর্তী মৌসুমে আমি সামনের দিকেই দেখতে চাই। আমি এমন একটি ক্লাবে খেলতে চাই যারা লিগ টাইটেলের জন্য লড়বে এবং চ্যাম্পিয়ন্স লিগে খেলার যোগ্যতা অর্জন করবে। ডর্টমুন্ডে সেই সুযোগ আছে।”

এরপরের গল্পটা যেন বরুশিয়া ডর্টমুন্ড আর মার্কো রয়েসের ভালোবাসার উপাখ্যান। প্রথম মৌসুমেই রবার্ট লেভানডফস্কি আর মারিও গোটজের সঙ্গে মিলে বিধ্বংসী এক আক্রমণত্রয়ী গড়ে তুলেছিলেন রয়েস। সেই ত্রয়ী ক্লাবকে নিয়ে গেছিল ২০১২-১৩ মৌসুমের উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে। যদিও শেষ পর্যন্ত স্বদেশি পরাশক্তি বায়ার্ন মিউনিখের কাছে হেরে স্বপ্নভঙ্গ হয়। তবে রয়েসকে ঘিরে অনাগত ভবিষ্যতে দারুণ কিছুর স্বপ্নই বুনেছিল সবাই।

শিষ্যদের স্বান্ত্বনা জানাচ্ছেন ডর্টমুন্ড কোচ/এএফপি

কিন্তু রয়েসকে ঘিরে প্রত্যাশা অনুযায়ী প্রাপ্তি মিলেছে খুব সামান্যই। গত ১১ মৌসুমে বরুশিয়া ডর্টমুন্ডের জার্সিতে সব ধরনের প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৩৮৭ ম্যাচে মাঠে নেমে নিজে ১৬১ গোল করার পাশাপাশি সতীর্থদের দিয়ে ১২১টি গোল করিয়েছেন এ জার্মান ফরোয়ার্ড। মার্কো রয়েস বুন্দেসলিগার সেই বিরলতম ফুটবলারদের একজন, যার নামের পাশে ১০০টির বেশি গোল-অ্যাসিস্ট দুটোই রয়েছে। কিন্তু ভাগ্যকে পাশে পেলে রয়েসের ব্যক্তিগত পরিসংখ্যান আর প্রাপ্তির ঝুলি হয়তো আরও ভারি হতো।

ক্যারিয়ারের প্রায় পুরোটা সময় জুড়েই লড়াই করেছেন চোটের সঙ্গে। গোটা ক্যারিয়ারে মাংসপেশি, গোড়ালি, হাঁটু, উরু, লিগামেন্টের চোট আর অন্যান্য সাধারণ অসুস্থতা মিলিয়ে অন্তত ৬০ বার তাকে মাঠের বাইরে যেতে হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে তিনি ১৪০টিরও বেশি ম্যাচ দর্শক হিসেবে ছিলেন। তবে চোট কাটিয়ে যখনই মাঠে ফিরেছেন, তখনই নিজের সক্ষমতার জানান দিয়েছেন রয়েস।

ফুটবলে খুব কম খেলোয়াড়ই কোনো ক্লাবেরই প্রতীক বা প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠতে পারেন। আধুনিক ফুটবলের পেশাদারিত্ব আর প্রতিযোগিতার যুগে তো সেটি আরও কঠিন। কিন্তু মার্কো রয়েস এ যুগেও সেটি করে দেখিয়েছেন। বরুশিয়া ডর্টমুন্ড আর রয়েস যেন পরস্পরের সমার্থক। ক্যারিয়ারে অসংখ্য কঠিন মুহূর্ত এলেও কখনও ক্লাব ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাবেননি।

বর্তমান সময়ে কোনো ক্লাবের হয়ে বেশিদিন সাফল্যহীন থাকলে সফলতার সন্ধানে অন্য দলে পাড়ি দিতে দ্বিধা করেন না। মার্কো রয়েস এখানেও ব্যতিক্রম। বরুশিয়া ডর্টমুন্ডে খেলার সময়ে লেভানডফস্কি, গোটজে, হেনরিখ মিখতারিয়ান, ইলকায় গুন্ডোগান, ম্যাটস হামেলস, পিয়েরে এমেরিক অবামেয়াং, ক্রিস্টিয়ান পুলিসিচ, জের্দার সাঞ্চো, আর্লিং হাল্যান্ডের মতো ফুটবলারকে সতীর্থ আর টমাস টুখেল-ইয়ুর্গেন ক্লপের মতো ম্যানেজারদের কোচ হিসেবে পেয়েছেন। সময়ের পরিক্রমায় সবাই অন্য ক্লাবে চলে গেলেও অনুগত সেনানীর মতো রয়েস রয়ে গেছেন বরুশিয়াতেই।

বহু সতীর্থ আর কোচই ক্লাব পাল্টানোর পর বড় সাফল্যের স্বাদ পেয়েছেন। কিন্তু রয়েস সেটি না পেলেও রয়েসের কোনো দুঃখ নেই। বরং সমর্থকদের ভালোবাসায় প্লাবিত হয়ে পেয়েছেন দ্য “প্রিন্স অব ডর্টমুন্ড” খেতাব। ক্যারিয়ারে কখনও অন্য কোনো বড় ক্লাবে খেলার প্রস্তাব আসেনি, তা নয়। কিন্তু রয়েসের কাছে সব সময় বরুশিয়া ডর্টমুন্ডই আগে প্রাধান্য পেয়েছে।

রয়েস যতই অর্জনকে প্রাধান্যের দ্বিতীয় সারিতে রাখুন না কেন, একজন খেলোয়াড়ের সফলতা মাপা হয় শিরোপা দিয়েই। সেখানে তিনি বেশ পিছিয়ে। এক যুগের চেয়েও বেশি দীর্ঘকালের পেশাদার ক্যারিয়ারে রয়েসের কখনোই বুন্দেসলিগা বা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতা হয়নি। ২০১৫ সালে বার্সেলোনায় যোগদানের সুযোগ এলেও তা পায়ে ঠেলে রয়েস জানিয়েছিলেন, তিনি বরুশিয়া ডর্টমুন্ডের হয়ে বুন্দেসলিগা জিততে চান। কিন্তু একতরফা জার্মান লিগে বায়ার্ন মিউনিখের দাপটে সেই স্বপ্ন এবারও পূরণ হলো না।

   

About

Popular Links

x