পরিযায়ী পাখিদের অন্যতম আবাসস্থল মৌলভীবাজারের হাকালুকি হাওড়ে বিষ দিয়ে ২৭টি পাখি হত্যা করা হয়েছে।
শনিবার (৬ জানুয়ারি) জুড়ী উপজেলায় হাওড়ের নাগুয়া ও চাতলাবিলে ২৭টি পরিযায়ী পাখিকে পানিতে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। মৃত হাঁসজাতীয় পাখিগুলোকে উদ্ধার করে স্থানীয়দের সহযোগিতায় মাটিচাপা দেন আইইউসিএনের প্রোগ্রাম অ্যাসিস্ট্যান্ট সুলতান আহমদ।
আইইউসিএন প্রতিনিধি সুলতান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট করলে বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের নজরে আসে।
আইইউসিএন প্রোগ্রাম অ্যাসিস্ট্যান্ট বলেন, “প্রথমে কয়েকটা পাখি দেখে মৃত্যুর কারণ এভিয়ান ফ্লু মনে হয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মৃত পাখির সংখ্যা বাড়তে থাকে। খুঁজতে খুঁজতে বিষ প্রয়োগের সত্যতাও মেলে। সর্বমোট ২৭টি মৃত পাখি ফেলাম কয়েক ঘণ্টায়।”
অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসন ব্যবস্থা না নেওয়ায় স্থানীয় পাখি শিকারি চক্রগুলো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হাওড় এখন শুকনো। শীতপ্রধান দেশগুলো থেকে আসা পাখিরা বিলে বিলে খাবার খুঁজে বেড়াচ্ছে। আর এই সুযোগে দুর্বৃত্তরা জাল দিয়ে ফাঁদ পেতে ও সেদ্ধ করা ধানের সঙ্গে এক ধরনের বিষ মিশিয়ে ‘‘বিষটোপ’’ তৈরি করে বিভিন্ন বিলের পাড়ে ছিটিয়ে দিচ্ছে। পাখিরা খাবার ভেবে প্রতিনিয়ত এসব টোপ খেয়ে মারা যাচ্ছে।

পেশাদার পাখি শিকারিরা এসব পাখি স্থানীয় হাটবাজার ও বাড়ি বাড়ি ফেরি করে চড়া দামে বিক্রি করে বলেও অভিযোগও রয়েছে।
আইইউসিএন, বাংলাদেশের প্রোগ্রাম অ্যাসিস্ট্যান্ট সুলতান আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা চারজন হাকালুকি হাওড়ে পাখি দেখতে গিয়েছিলাম। এর মধ্যে কিছু পাখিকে মরে পড়ে থাকতে দেখি। দ্রুত পাখিগুলোকে পানি থেকে উদ্ধার করে মাটিচাপা দেই। এরপর একটু সামনে এগিয়ে গিয়ে দেখি আরও কিছু হাঁস মরে পড়ে আছে। প্রথমে ১৬টি হাঁস মৃত পাই। বিল থেকে ফেরার পথে অন্য পাড়ে আরও ১১টি মৃত হাঁস পাই।”
আশপাশে আরও খোঁজাখুজি করতে গিয়ে একপর্যায়ে “কার্বোটাফ” লেখা একটি বিষের প্যাকেট পাই। তখন ধারণা হয়, বিষটোপ দিয়ে এই হাঁসগুলো মারা হয়েছে। মৃত পাখিগুলো উত্তুরে খুন্তেহাস, পিয়াং হাস, উত্তুরে ল্যাঞ্জাহাঁস এই তিন প্রজাতির।
তিনি আরও বলেন, “স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি ওই এলাকায় বহুদিন ধরে পরিযায়ী হাঁস শিকার হয়ে আসছে। বিষগুলো ভোররাতে প্রয়োগ করা হয়। হাঁসগুলো বিষ খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়লে শিকারীরা ধরে জবাই করে। এভাবে শিকার করা পাখিগুলো বিক্রি করা হয় সিলেট-মৌলভীবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করা হয়।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, “জুড়ী এলাকায় একটি চক্র আছে তারা বিষ ও জাল দিয়ে পরিযায়ী পাখি ধরছে। তারা সেসব পাখি চড়া দামে স্থানীয় বাজারে পাখি বিক্রি করে। এটা তাদের লাভজনক। পাখি শিকার কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, “স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি ওই এলাকায় বহুদিন ধরে পরিযায়ী হাঁস শিকার হয়ে আসছে। বিষগুলো ভোররাতে প্রয়োগ করা হয়। হাঁসগুলো বিষ খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়লে শিকারীরা ধরে জবাই করে। এভাবে শিকার করা পাখিগুলো বিক্রি করা হয় সিলেট-মৌলভীবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করা হয়।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, “জুড়ী এলাকায় একটি চক্র আছে তারা বিষ ও জাল দিয়ে পরিযায়ী পাখি ধরছে। তারা সেসব পাখি চড়া দামে স্থানীয় বাজারে পাখি বিক্রি করে। এটা তাদের লাভজনক। পাখি শিকার কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে।”

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক শিকারি বলেন, “হাকালুকি হাওড় এলাকায় পরিযায়ী পাখি চড়া দামে বিক্রি করি। অনেকে তাদের কর্তাব্যক্তিদের উপহার হিসেবে দিতে বেশি দাম দিয়ে পাখি কেনেন। অনেকে অগ্রিম অর্ডার দিয়ে রাখেন।”
মৌলভীবাজার বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা মির্জা মেহেদী সরোয়ার বলেন, “হাকালুকি হাওড়ের হাল্লা এলাকায় আমাদের একটা ক্যাম্প আছে। সেখানে আমাদের দুজন স্টাফ আছে। ওরা দেখাশোনা করে।”
তিনি আরও বলেন, “২৭টি ডিএফও স্যার ইতোমধ্যে রেঞ্জ কর্মকর্তা গোলাম ছারওয়ারকে (ওয়াইল্ড লাইফ) তদন্তের জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। প্রকৃত ঘটনা কী, কীভাবে এবং কী কারণে পাখিগুলো মারা গেল ইত্যাদি।”
এইই জীববৈচিত্র্য কর্মকর্তা বলেন, “কার্বোটাফ নামে একটি বিষের প্যাকেট পাওয়া যায় সেখানে। ওই বিষ কেউ পাখি নিধনের উদ্দেশ্য প্রয়োগ করেছে কি-না বা আশেপাশের ফসলে কেউ প্রয়োগ করেছে কি-না, সেসব বিষয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। যদিও কৃষি ফসলে বেশি কার্বোটাফ ব্যবহার হয় তাহলে ঝামেলা।”
বনবিভাগের মৌলভীবাজার রেঞ্জ কর্মকর্তা গোলাম ছারওয়ার (ওয়াইল্ড লাইফ) বলেন, “ঢাকা থেকে আসা গবেষকরা হাকালুকি হাওড়ে পাখি দেখতে গিয়ে নাগুয়া ও চাতলা বিলে ২৭টি হাঁস মৃত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। তাদের ফেসবুক পোস্ট থেকে আমরা বিষয়টি জানতে পেরেছি। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ঘটনাস্থল শনাক্ত করে তদন্ত কার্যক্রম চলছে।’’
এর আগে ২০২২ সালে একই উপজেলায় হাকালুকি হাওড়ের গৌড়কুড়ি বিলে ফাঁদ পেতে অর্ধশতাধিক পাখি নিধন করা হয়। সেবার এলাকাবাসীর সহযোগিতায় ১৫টি পাখিসহ দুই শিকারিকে আটক করে বন বিভাগে হস্তান্তর দেওয়া হয়। লিখিত মুচলেকা নিয়ে ওই শিকারিদের ছেড়ে দিয়েছিল বনবিভাগ।
১৯৯৯ সালে সরকার এ হাওড়কে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইকোলজিক্যালি ক্রিটিক্যাল এরিয়া বা ইসিএ) ঘোষণা করে।



