আকস্মিক বন্যায় বিপর্যস্ত বাংলাদেশ। ইতোমধ্যে দেশের ৯টি জেলার কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দি ও বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। বন্যাকবলিত এসব জেলা হলো ফেনী, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, কুমিল্লা, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, লক্ষ্মীপুর ও খাগড়াছড়ি। টানা বৃষ্টির পাশাপাশি বাংলাদেশে বন্যার পেছনে ত্রিপুরার গোমতী নদীর বাঁধ খুলে দেওয়াকে দায়ী করছেন অনেকে।
অন্যদিকে, বন্য পরিস্থিতি ভারতেও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় ত্রিপুরায় ফলে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ “কমলা সতর্কতা” জারি করেছে ভারতের আবহাওয়া দপ্তর।
পানির চাপে সৃষ্ট ভূমিধসে মঙ্গলবার সিকিমের তিস্তা নদীর ওপর নির্মিত বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী একটি বাঁধ বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে ভারতের সরকারি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প পরিচালনাকারী সংস্থা ন্যাশনাল হাইড্রো-ইলেকট্রিক পাওয়ার কর্পোরেশন (এনএইচপিসি)।
সবমিলিয়ে দুই দেশের জন্যই বন্যা বেশ বড় মানবিক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও ভারত কয়েকদিন ধরেই বন্যা কবলিত অঞ্চল থেকে তাদের বাসিন্দাদের নিরাপদে সরিয়ে নিচ্ছিল। কিন্তু বাংলাদেশ বন্যা আকস্মিকভাবে হওয়ায় পূর্বপ্রস্তুতির সময় পাননি স্থানীয়রা।
তবে, এই বন্যাকে সরাসরি “আকস্মিক” বলতে রাজি নন জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা। কারণ, এ বছর বৃষ্টিপাত বেশি হওয়া এবং তা থেকে বন্যা সৃষ্টি হতে পারে বলে আগেই জানিয়েছিলেন তারা।
এ বছর ২৯ এপ্রিল ভারতের পুনে শহরে সাউথ এশিয়ান ক্লাইমেট আউটলুক ফোরামের ২৮তম সম্মেলনে শুরু হয়। ওই সম্মেলনে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে বর্ষা মৌসুমের (জুন-সেপ্টেম্বর) আবহাওয়ার পূর্বাভাস নিয়ে এ অঞ্চলের শীর্ষ আবহাওয়াবিদেরা প্রাথমিকভাবে ধারণার কথা জানান যে, এবার বর্ষা মৌসুমে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টি হতে পারে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেই সময় বলা হয়ে, দেশে বর্ষায় বৃষ্টি যেমন বেশি হবে, তেমনি বাংলাদেশের উজানে ভারতের রাজ্যগুলোতেও বৃষ্টি বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সবমিলিয়ে বর্ষায় বাংলাদেশে বন্যা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা রয়েছে।
সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে কারিগরি অধিবেশন শেষে বর্ষা মৌসুমে আবহাওয়া পরিস্থিতি কী দাঁড়াতে পারে, তা নিয়ে একটি বিবৃতি প্রচার করা হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, বিশেষজ্ঞরা আলোচনা করে এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে এ অঞ্চলের আবহাওয়া থেকে “এল নিনো” দুর্বল হয়েছে, “লা নিনা” সক্রিয় হয়েছে। অর্থাৎ, শিগগিরই এই অঞ্চলে বৃষ্টি শুরু হবে।
এতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বেশিরভাগ দেশে এবার বর্ষা শক্তিশালী হয়ে উঠবে। বাংলাদেশের তাপপ্রবাহের এলাকাগুলোতে এবার বৃষ্টিও বেশি হবে। সিলেট ও চট্টগ্রামে এবার তাপপ্রবাহের দাপট কম ছিল। সেখানে এবার বৃষ্টিও কম হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এল নিনো সক্রিয় হলে প্রশান্ত মহাসাগর থেকে ভারত মহাসাগর হয়ে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত একটি শুষ্ক রেখা তৈরি হয়। এর উল্টো অবস্থা হলো লা নিনা। এটি তৈরির সময় শুষ্ক রেখাটি উষ্ণ রেখায় পরিণত হয়। এতে বাতাসে জলীয় বাষ্প বেড়ে গিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টি বেড়ে যায়।
ওই সম্মেলনে অংশ নিয়েছিলেন বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ বজলুর রশিদ। তিনি সেই সময় সাংবাদিকদের বলেছিলেন, “সম্মেলনে মূল আলোচ্য বিষয় ছিল আগামী বর্ষা মৌসুম। আবহাওয়াবিদেরা তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, এবারের বর্ষায় বৃষ্টি বেশি হবে।”
তখন তিনি জানান, বাংলাদেশের উজানে ভারতের পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলো, অর্থাৎ আসাম, মেঘালয়, পশ্চিমবঙ্গসহ কয়েকটি রাজ্যে বৃষ্টি বেশি হতে পারে বলে সম্মেলনে উল্লেখ করেছেন আবহাওয়াবিদেরা। ওই বৃষ্টি বাংলাদেশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়বে। ফলে দেশের উত্তরাঞ্চলসহ মধ্যাঞ্চলে প্রতিবছর যে বন্যা হয়, তা এবার আরও ব্যাপক রূপ নিতে পারে।
এদিকে, গত জুলাই মাসের শুরুতেও বাংলাদেশের উত্তরপূর্বাঞ্চল, উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণপূর্বাঞ্চল বন্যার কবলে পড়ে। সেই সময় ১৫টি জেলায় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েন। সেই বন্যা র্দীঘায়িত হওয়ার পাশাপাশি আগস্টে বড় ধরনের আশঙ্কার কথা তখন জানানো হয়েছিল।



বাঁধের পানি ছাড়ার পর প্রথমবার মুখ খুললো ভারত
ডুবেছে ত্রিপুরা, ভাসছে বাংলাদেশ
সিকিমে উত্তাল তিস্তা, শঙ্কায় বাংলাদেশ
এ বছর দেশে বৃষ্টিপাতও হতে পারে বেশি