বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) কেন্দ্রীয় নেতা অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী। তিনি বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের সাবেক সদস্য। দায়িত্ব পালন করেছেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রী হিসেবে।
নিতাই রায় চৌধুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করে আইন পেশায় যোগ দেন। তিনি ছাত্র জীবনে বামপন্থী সংগঠন ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। ১৯৮৮ সালের চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মাগুরা-২ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি শিক্ষা, যুব ও ক্রীড়া এবং আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
তিনি বর্তমানে বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
সম্প্রতি নিতাই রায় চৌধুরীর সঙ্গে ঢাকা ট্রিবিউনের তানভীর হাসান বাংলাদেশে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কার্যক্রম, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এবং বিএনপির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেছেন।
ঢাকা ট্রিবিউন: অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তিন মাসকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
বিগত সরকারের আমলে দেশ পরিপূর্ণভাবে বিধ্বস্ত হয়েছে। সমস্ত প্রতিষ্ঠান ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। সব ব্যাংক লুটপাট করে খালি করে ফেলা হয়েছে। এখানে সিভিল প্রশাসন, পুলিশ বাহিনী এমনকি বিচার বিভাগকেও ধ্বংস করা হয়েছে। ফ্যাসিবাদীরা নিজেদের স্বার্থে তাদেরকে ব্যবহার করেছে। আওয়ামী লীগ দেশকে একটি বিপর্যস্ত অবস্থায় রেখে পালিয়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে দেশে যতটুকু কাজ করা সম্ভব বর্তমান সরকার করছে। এর বাইরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আর কিছু করার নেই, তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা দিয়ে তাদের কাজগুলো করে যাওয়ার চেষ্টা করছে। আমি তাদেরকে নিয়ে আশাবাদী।
সরকারের উপদেষ্টার সংখ্যা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন কী?
উপদেষ্টা পরিষদ বাড়ানোর বিষয়টি সরকারের অভ্যন্তরীণ বিষয়। তবে সরকার যাতে সফল হয় সেজন্য বিএনপি তাদেরকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। সরকার চাইলে উপদেষ্টা বাড়াতে পারে, তবে আমার মনে হয় বেশি সংখ্যক লোক নিয়ে কেবিনেট করার প্রয়োজন নেই। বড় উপদেষ্টা পরিষদ হলেই যে খুব বেশি কাজ হবে তা নয়। বিগত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনাও অনেক বড় মন্ত্রিসভা নিয়ে সরকার গঠন করেছিল। অনেক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী ছিল; কিন্তু কাজ তো কিছু হয়নি, হয়েছে শুধু লুটপাট।

আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার অভিযোগ পাওয়া গেছে। দেশে একটা প্রচার রয়েছে আওয়ামী লীগ সরকারে থাকলে সংখ্যালঘুরা নিরাপদ থাকে। এই বিষয়ে আপনি কী বলবেন?
আওয়ামী লীগ যখনই ক্ষমতায় আসে তখনই ধর্মীয় সম্প্রদায়িকতা বাড়ে। ধর্মীয় সম্প্রদায়িকতার অন্যতম কারণ হচ্ছে জমি-জমা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি। আমরা দেখেছি হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সম্পত্তি আওয়ামী লীগের লোকজনরাই বেশি দখল করেছে। বলা হচ্ছে, ৫ আগস্টের পর হিন্দুদের ওপর হামলা হয়েছে। এখানে দেখতে হবে কাদের ওপর হামলা হয়েছে। যারা এই ফ্যাসিস্ট সরকারের সুবিধাভোগী ছিল, যারা এই ফ্যাসিস্ট সরকারের হয়ে সাধারণ মানুষের ওপর নির্যাতন করেছে তাদেরকে মানুষ প্রতিহত করেছে। মানুষের দীর্ঘদিনের ক্ষোভের প্রতিফলন হয়েছে। এখানে হিন্দু-মুসলিম কোনো বিষয় না। বাংলাদেশে যা হয়েছে তা কোনো সম্প্রদায়িক দ্বন্দ নয়, এটা রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব। এই দ্বন্দ্ব ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে কৃষক-শ্রমিক-জনতার দ্বন্দ্ব। এই জনতার মধ্যে যেমন মুসলিম রয়েছে তেমনি হিন্দুসহ অন্যান্যরাও রয়েছে। সবাই মিলে ফ্যাসিবাদের পতন ঘটানো হয়েছে। হাজার হাজার মানুষ খুন করে, দেশটাকে ধ্বংস করে দিয়ে শেখ হাসিনাসহ তার বাহিনী পালিয়ে গেল। মানুষ তো বদলা নিতে চায়, সেভাবে তো কিছু করেনি। ওবায়দুল কাদের বলেছিল আওয়ামী লীগ পতন হলে ১০ লাখ লোক মারা যাবে। ১০ লাখ কেন ১০ জনও তো মারা গেলো না। দেখেন এবারের দুর্গাপূজা; অন্যান্যবারের চেয়ে বেশি পূজা হয়েছে। কোথাও কোনো অঘটন ঘটেনি।
আগামীতে বিএনপি সরকার গঠন করলে সংখ্যালঘুদের জন্য বিশেষভাবে কী কী পদক্ষেপ নিবে?
বিএনপি ধর্মীয় সংখ্যালঘু বা সংখ্যাগুরু বলে কিছুতে বিশ্বাস করে না। বাংলাদেশে সকলের অধিকার সমান। একজন মুসলমানের যে অধিকার রয়েছে হিন্দুরও সেই অধিকার রয়েছে। বিএনপি সকলের সমান অধিকারে বিশ্বাস করে। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ গ্রামে বাস করে। তাদের মধ্যে কোনো সাম্প্রদায়িকতা নেই। যারা শহরে বাস করে তাদের মধ্যেও সাম্প্রদায়িকতা নেই। কিন্তু আমরা দেখেছি আওয়ামী লীগ সব ক্ষেত্রে সাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টি করেছে। আগামীতে বিএনপি ক্ষমতায় আসলে অন্ততপক্ষে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা যাতে কোনো প্রকার বৈষম্যের শিকার না হয় সেই দিকে নজর রাখবে। বিএনপি কোনো ধরনের বৈষম্যে বিশ্বাস করে না।
ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্কের উন্নতির জন্য কী কী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত?
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ভারতের সরকারের সঙ্গে শীর্ষ পর্যায় থেকে কয়েকটি বৈঠক হয়েছে। যদি আমাদের হৃদ্যতার সম্পর্ক না থাকে তাহলে বাংলাদেশেরও ক্ষতি ভারতেরও ক্ষতি। সুসম্পর্ক রাখাটা দুই দেশের জন্যই অত্যন্ত জরুরি। ভারত এখন বুঝতে পেরেছে বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতে হলে তাদের সঙ্গেই সুসম্পর্ক রাখতে হবে যারা বাংলাদেশের মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে। বিএনপি এই মুহূর্তে বাংলাদেশের ৮০% মানুষের রাজনৈতিক দল। অর্থাৎ বিএনপির সঙ্গে সুসম্পর্ক করা মানেই বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক করা। আমরা মনে করি প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক করতে হবে।
প্রচার রয়েছে যে, ভারত আওয়ামী লীগকে বন্ধুরূপে দেখে। বর্তমান পরিস্থিতিতে বিএনপির সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক কতটা উন্নতি হয়েছে?
ভারত শুধু আওয়ামী লীগের বন্ধু এটা আওয়ামী লীগের প্রচার। এমনকি ভারতের কিছু কর্মকান্ডের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে। আমরা দেখেছি ভারত আওয়ামী লীগ সরকারকে এমনভাবে সমর্থন দিয়েছে যেটি দেশের মানুষের বিপক্ষে গেছে। গত ১৬ বছরের পাতানো নির্বাচনগুলোতে ভারত আওয়ামী লীগকে সমর্থন দিয়ে গেছে। এইসব কারণেই মানুষের মনে একটি ধারণা তৈরি হয়েছে ভারত আওয়ামী লীগের বন্ধু, বাংলাদেশের জনগণের বন্ধু নয়। ভারত উপলব্ধি করেছে তাদের কাজ সঠিক হয়নি। এই উপলব্ধিগুলো ভারত যত দ্রুত করবে, তত মঙ্গল হবে। বিএনপি মনে করে ভারতের সঙ্গে আমাদের সুসম্পর্ক স্থাপন করা উচিত। তবে বিএনপি বাংলাদেশের স্বার্থকে সমন্বিত রেখে ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করতে চায়। বিএনপি চায় উভয়ের মধ্যে কার্যকর একটি সম্পর্ক স্থাপন হোক।
অনেকে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার দাবি তুলছে। বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখছেন? আওয়ামী লীগকে কী নিষিদ্ধ করার প্রয়োজন বলে মনে করছেন?
আওয়ামী লীগ বিগত ১৬ বছরে গুম খুন হত্যা লুটপাট চালিয়েছে। তারা হাজার-হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছে। ছাত্র আন্দোলনে হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে হত্যা করেছে। এই প্রত্যেকটা ঘটনার বিচার হতে হবে। এই বিচার যদি হয় তাহলে আওয়ামী লীগের লুটেরা আর কেউ টিকে থাকবে না। আসলে এই লুটেরা বাদে আওয়ামী লীগে আর কেউ নেই। যারা ভালো মানুষ আছে আওয়ামী লীগের, তারা আওয়ামী লীগের আমলেও মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি। আমরা আওয়ামী লীগের যারা অপরাধী আছে তাদের বিচার চাই। রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার বিষয়টিতে আমরা খুব একটা গুরুত্ব দিচ্ছি না। আমরা নিষিদ্ধের পক্ষে নয়, আমরা অপরাধের বিচারের পক্ষে।
বিএনপির কী এখন জামায়াতের সঙ্গে সমন্বয় নেই? তাদের সঙ্গে কী বিরোধ তৈরি হয়েছে?
জামায়াত একটি ভিন্ন রাজনৈতিক দল, তাদের আদর্শ ভিন্ন, তাদের রাজনীতি করা ধরন ভিন্ন। তাদের রাজনীতির সঙ্গে আমাদের রাজনীতির কোনো মিল নেই। আমাদের দাবি প্রয়োজনীয় সংস্কার শেষে যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচনের আয়োজন করা। বিএনপি দলের স্বার্থ নয়, দেশের স্বার্থ দেখে। আওয়ামী লীগ তো কখনো জনগণের স্বার্থে কাজ করে না, দেশের স্বার্থেও কাজ করে না। আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক দলের কোনো সংজ্ঞার মধ্যে আসে না। এরা একটা সন্ত্রাসী সংগঠন, চরম লুটেরা সংগঠন। বাংলাদেশকে লুটপাট করে পালিয়ে গেছে, এদেশে ওদের কোনো ভিত্তি নেই।
শিক্ষার্থীরা নতুন একটি দল গঠন করতে চাচ্ছে-এমন প্রচার রয়েছে। আপনি এটিকে কীভাবে দেখছেন?
রাজনৈতিক দল করা দেশের সকল নাগরিকের অধিকার। কেউ যদি রাজনৈতিক দল করতে চায় তাহলে সে করতেই পারে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অন্যতম বিষয় হলো শতফুল ফুঁটতে দাও। আমরা তো কাউকে বাধা দিব না।
যেসব জায়গায় আগে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা চাঁদাবাজি করতো, সেসব জায়গায় এখন বিএনপির লোকজন একই কাজ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিএনপি এদের নিয়ন্ত্রণে কী কী পদক্ষেপ নিচ্ছে?
আওয়ামী লীগ পালানোর ওস্তাদ। ৭১ সালে শেখ মুজিব আত্মসমার্পণ করলো; বলল তোরা পালা, সব পালাইয়া চলে গেল। ওরা তো মুক্তিযুদ্ধ করে নাই। মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা দিলো তো জিয়াউর রহমান। মুক্তিযুদ্ধ করলো এদেশের মানুষ। ওই যুদ্ধে আওয়ামী লীগের কোনো অংশগ্রহণ ছিল না। যুদ্ধের আগমূহুর্ত পর্যন্ত ওদের ভূমিকা ছিল। শেখ মুজিব ভূমিকা রেখেছে, কিন্তু যুদ্ধকালীন সময়ে আওয়ামী লীগ কি ভূমিকা রাখলো। তিনি পাকিস্তানের দেশদ্রোহী হতে চাননি। তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে চেয়েছিলেন। তিনি কখনো বাংলাদেশ চাননি। যাইহোক, বিএনপি লুটপাটের পক্ষে নয়। আমাদের দলের মধ্যে অনেক লোক আওয়ামী লীগ থেকে এসে বিএনপি সেজেছে। বিএনপির কিছু লোক আছে যারা এতদিন তাদের সঙ্গে মিলে ছিল। তারা মিলে কিছু কিছু জায়গায় লুটপাট করছে। বিএনপিই একমাত্র দল যেখানে আমাদের চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঘোষণা দিয়েছে যারা অপরাধের সঙ্গে জড়িত তাদের দল থেকে চিরদিনের মতো বহিষ্কার করে দেওয়া হবে। একই সঙ্গে তাকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করবো। আওয়ামী লীগ এই ধরণের কথা কখনো বলেছে? বলেনি। শেখ হাসিনার লোকজন লুটপাট করলো তাও তো তিনি কাউকে পুলিশে দেয়নি। সে আরও বলে তার বাড়ির কাজের লোক নাকি ৫০০ কোটি টাকার মালিক। কি আনন্দ যে তার কাজের লোকও ৫০০ কোটি টাকার মালিক। তাইলে বোঝা যায় এরা কী পরিমান লুটপাট করেছে। শেখ হাসিনা রাশিয়ার জারদের চেয়েও বড় ফ্যাসিস্ট। ইতিহাসে এমন ফ্যাস্টিস আর পাওয়া যাবে না।
আগামী ১০ বছর পর বাংলাদেশকে কোন অবস্থানে দেখতে চান?
আগামী ১০ বছর পরে বাংলাদেশে এশিয়ায় সিঙ্গাপুর হবে। বাংলাদেশ ভিয়েতনামের মতো সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে। বাংলাদেশ বিপুল সম্ভবনার দেশ। নেতৃত্বের অভাবে আমরা এগিয়ে যেতে পারিনি। শেখ মুজিবের সময় থেকে আজ পর্যন্ত যতবার আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছে প্রতিবার রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাট করে নিয়ে গেছে। এরা আর কখনো বাংলাদেশে স্থান পাবে না। বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদের জায়গা নেই। আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে এই দেশেকে দুর্নীতিমুক্ত, সাম্প্রদায়িকতামুক্ত উন্নায়ন সমৃদ্ধশালী একটি দেশ হিসেবে গড়ে তুলব। অতীতের ন্যায় সারাবিশ্ব আবারো বাংলায় ছুঁটে আসবে।



