রাজধানী ঢাকার গুলশানে সাবেক সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেত্রী শাম্মী আহমেদের বাসায় চাঁদাবাজির অভিযোগে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত পাঁচজন গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে বিষয়টি নিয়ে সারাদেশে চলছে নানা আলোচনা। এর মধ্যে নতুন আরেকটি খবরে নতুন এক প্রশ্ন দেখা দিয়েছে সাধারণ মানুষের মনে।
শাম্মী আহমেদেরে বাসায় চাঁদাবাজির ঘটনায় শনিবার রাতে গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে আবদুর রাজ্জাক ওরফে রিয়াদকে নিয়ে রবিবার (২৭ জুলাই) দিনভরই ছিল নানা আলোচনা। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ন সদস্যসচিব মাহিন সরকারের দেওয়া ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে এ আলোচনা চলছিল। সেই আলোচনার রেশ না কাটতেই জানা গেল রাজ্জাকের গ্রামের বাড়ি নোয়াখালীর সেনবাগে জরাজীর্ণ টিনের ঘর ভেঙে পাকা ভবন তৈরি করা হচ্ছে।
অভাব অনটনের মধ্যে বেড়ে ওঠা পরিবারটির হঠাৎই এই পরিবর্তন দেখে অবাক হয়েছিলেন এলকার মানুষ। তবে চাঁদাবাজির ঘটনায় রাজ্জাক গ্রেপ্তার হওয়ার পর এলাকার অনেকের মধ্যেই নতুন পাকা ভবন তোলার টাকার উৎস নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
যদিও রাজ্জাকের পরিবারের দাবি, মানুষের সাহায্য-সহযোগিতা, জমানো টাকা ও ঋণ করে ঘর তুলছেন তারা। রাজ্জাক কোনো টাকা পাঠায়নি।
জানা গেছে, প্রায় আড়াই মাস আগে ভবনটির নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। গত সপ্তাহে চার কক্ষ বিশিষ্ট একতলা ভবনের ছাদ ঢালাই দেওয়া হয়েছে।
আবদুর রাজ্জাক ওরফে রিয়াদ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তৎকালীন সমন্বয়ক ছিলেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন গত ফেব্রুয়ারিতে সম্মিলিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শাখার যে আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করেছিল, সেই কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়েছিল রাজ্জাককে। এরপর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের উদ্যোগে ছাত্রসংগঠন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদ। রাজ্জাক এই ছাত্রসংসদের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। চাঁদাবাজির ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর রাজ্জাককে দল থেকে বহিষ্কার করেছে গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদ।
রাজ্জাকের গ্রামে গিয়ে স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে বলেছে সংবাদমাধ্যম প্রথম আলো। স্থানীয়রা প্রথম আলোকে জানান, আর্থিক অনটনের মধ্যে বেড়ে উঠেছে আবদুর রাজ্জাক ওরফে রিয়াদ। এলাকায় বেশ ভদ্র হিসেবে পরিচিত রাজ্জাক। তবে ৫ আগস্টের পর থেকে পরিবারটির পরিবর্তন ছিল চোখে পড়ার মতো।
প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা তহয়, রাজ্জাকদের নির্মাণাধীন ভবনের দক্ষিণ পাশে চাচা জসিম উদ্দিনের জীর্ণ টিনের ঘর। পশ্চিম পাশে আরেক চাচার টিনের ঘর। জসিম উদ্দিন জানান, দুই-আড়াই মাস আগে রাজ্জাক ভবন নির্মাণের কাজে হাত দিয়েছেন। আগে ভাঙাচোরা একটি টিনের ঘর ছিল। ওই ঘরের জায়গায় নতুন ভবন করা হচ্ছে। রাজ্জাকের মা-বাবা এখন বাড়ির প্রবেশপথের পাশের একটি কক্ষ ভাড়া করে থাকেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাজ্জাকের এক স্বজন প্রথম আলোকে বলেন, "রিয়াদের বাবা ও বড় ভাই দুজনই রিকশা চালাতেন। এখন চালান না। রাজ্জাক ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করে। গত ৫ আগস্টের পর সমন্বয়ক হয়েছেন। কিছুদিন পরপর বাড়িতে আসে। দুই-আড়াই মাস আগে পুরোনো ঘর ভেঙে পাকা ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করেছে।"
রাজ্জাকের বাবা আবু রায়হান সাংবাদিকদের উপস্থিতি দেখে আড়ালে চলে গেলেও প্রথম আলোর সঙ্গে কথা হয় রাজ্জাকের মা রেজিয়া বেগমের।
তিনি জানান, তার দুই ছেলে ও দুই মেয়ে। ছোট ছেলে রাজ্জাক ঢাকায় একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন। বড় ছেলে ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। তবে বড় ছেলে ফুটপাতে ব্যবসা করেন, এমন কথাও বলেন রিজিয়া বেগম। দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন বলে জানান।
রেজিয়া বেগম দাবি করেন, মানুষের কাছ থেকে সাহায্য-সহযোগিতা নিয়ে, তার স্বামী আয়ের টাকায় ছেলেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়েছেন। ছেলে নিজেও টিউশনি করেন, পড়ালেখার খরচ জোগাড় করেন। পাকা ভবন নির্মাণ করছেন বেসরকারি সংস্থা থেকে ঋণ নিয়ে, স্বামীর জমানো টাকা দিয়ে। ধারদেনাও করেছেন।
গতবছরের বন্যায় তাদের ঘর সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গিয়েছিল উল্লেখ করে রেজিয়া বেগম দাবি করেন, বন্যার পর সরকারের কাছ থেকে চার বান্ডিল ঢেউটিন পেয়েছেন, সেগুলো বিক্রি করেছেন। আল-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন থেকে ৫০ হাজার টাকা পেয়েছেন। এসব টাকাও ঘরের কাজে ব্যয় করছেন।
রাজ্জাকের টাকায় পাকা ভবন হচ্ছে কি-না, এমন প্রশ্নের জবাবে রেজিয়া বেগম বলেন, "রাজ্জাক কোথায় থেকে টাকা দেবে? তাকে উল্টো প্রতি মাসে টাকা দিতে হয়। সে টিউশনি করে। আত্মীয়স্বজন তাকে সহযোগিতা করে। রাজ্জাকের টাকায় বাড়িতে ভবন নির্মাণের কথা সঠিক নয়।"



