বিষাক্ত ভারী ধাতু ও মাইক্রোপ্লাস্টিকের ভাগাড়ে পরিণত হচ্ছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রাণ ভৈরব ও রূপসা নদীর তলদেশ। ১০-৩০ সেন্টিমিটার গভীরতার পলিতে প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা বা মাইক্রোপ্লাস্টিক ও ক্যাডমিয়াম-সিসার মতো ভারী ধাতুর উপস্থিতি পরিবেশবিদদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। এর প্রভাবে সুন্দরবনসহ উপকূলীয় পরিবেশ ও প্রতিবেশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক জার্নাল ‘ইমার্জিং কন্টামিন্যান্টস’-এ প্রকাশিত যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের এক গবেষণায় এই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে।
যবিপ্রবি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিশাত সালসাবিল, মো. তৌহিদুজ্জামান, তাপস কুমার চক্রবর্তী ও গোপাল চন্দ্র ঘোষ গবেষণাটি করেন। গবেষণার জন্য ভৈরব ও রূপসা নদীর ৯টি জনবহুল পয়েন্ট থেকে ৩০ সেন্টিমিটার গভীর পর্যন্ত নমুনা সংগ্রহ করা হয়।
যবিপ্রবি’র গবেষকরা ভৈরব-রূপসার নদীর দূষণ পর্যবেক্ষণে ভৈরব নদের যশোর অংশের রূপদিয়া, নওয়াপাড়া, খুলনার ফুলতলা, সিএসডি ঘাট, শোলপুর, জেলখানা ঘাট, রূপসা নদীর রূপসা সেতু, তেঁতুলতলা বোট ঘাট ও বটিয়াঘাটা এলাকা থেকে নমুনা সংগ্রহ করেন। এর মধ্যে রূপদিয়া উজান ও বটিয়াঘাটা ভাটির স্থান হিসেবে নির্ধারণ করা হয়।
এসব স্থানের নমুনা পরীক্ষায় দেখা গেছে, প্রতি কেজি পলিতে সর্বোচ্চ ৫,৭০০টি পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা রয়েছে। গড়ে এই সংখ্যা ৩,৬০০টি। মধ্যস্তরে এই সংখ্যা কমে গড়ে ২,৭৪৪টি ও নিচের স্তরে ১,০৭৭টিতে নেমে আসে।
মাইক্রোপ্লাস্টিকের মধ্যে প্রধানত ফ্র্যাগমেন্ট মিলেছে ৫১%, ফাইবার ২৬% ও ফিল্ম ১৮%। এর মধ্যে পলিইথিলিনের হার ২৩%, পলিস্টাইরিন ২১% ও ও পলিপ্রোপিলিন ১৮% সহ ৭ ধরনের পলিমারের উপস্থিতি ছিল। নমুনায় নদীর তলদেশের ১০-৩০ সেন্টিমিটার গভীরতায়ও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
মাইক্রোপ্লাস্টিকের পাশাপাশি নদীর তলদেশে ক্রোমিয়াম, নিকেল, কপার, সিসা এবং ক্যাডমিয়ামের মতো ভারী ধাতুর বিষক্রিয়া উচ্চমাত্রায় ধরা পড়েছে। মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণী এসব মাইক্রোপ্লাস্টিক খাবার হিসেবে গ্রহণ করছে। এর ফলে বিষাক্ত ভারী ধাতুগুলো মানুষের খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করছে, যা ক্যানসারসহ নানা জটিল রোগের কারণ হতে পারে।
জানা গেছে, খুলনা মহানগরীসহ যশোর নওয়াপাড়া ও আশপাশ এলাকা থেকে প্রচুর বর্জ্য পড়ছে ভৈরব ও রূপসা নদীতে। খুলনা সিটি কর্পোরেশনের বিভিন্ন খাল-নালা থেকে ২২টিরও বেশি ড্রেন হয়ে ভৈরব ও রূপসা নদীতে মিশছে বর্জ্য। নওয়াপাড়া এলাকায় গড়ে ওঠা ট্যানারিসহ শিল্প-কারখানার কেমিকেল বর্জ্য সরাসরি পড়ছে ভৈরব নদে। ফলে দিন দিন বিষাক্ত ধাতুতে ভারী হয়ে উঠছে নদীর তলদেশ।
গবেষক ও পরিবেশবিদরা বলছেন, প্রোনেটসিয়াল রিকস ম্যানেজমেন্ট ইনডেক্স (পিইআরআই) বা পরিবেশগত ঝুঁকি সূচক অনুযায়ী, এই নদীর পলিতে দূষণের মাত্রা ‘অত্যন্ত উচ্চ’ বা ক্লাস ভি পর্যায়ের। ক্যাডমিয়াম ও নিকেলের আধিক্য নদীটির জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। প্লাস্টিক বর্জ্য এবং সরাসরি নর্দমার সংযোগ নদীর স্বাস্থ্যকে এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছে যে, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে এই নদীর স্বাভাবিক বাস্তুসংস্থান পুনরুদ্ধার করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
দুই দশকের বেশি সময় ধরে রূপসা, আঠোবেকী ও ভৈরবে মাছ শিকার করা পূর্ব রূপসা পাড়ের মৎস্যজীবী জাবেদ বলেন, “দিন দিন নদীর মাছ কমছে। পানি ভালো না। জাল নিয়ে নদীতে এলে মাছ পেতাম। এখন আর সেই অবস্থা নেই। বেঁচে থাকাই কষ্ট।”
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর ড. মো. মুজিবুর রহমান নদীর তলদেশে সিসা ও ক্যাডমিয়ামের মতো ধাতুর উপস্থিতি উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, “ভৈরব-রূপসাসহ আশপাশের নদীতে প্রতিনিয়ত শিল্পকারখানার কেমিকেল, শহুরে বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য বাধাহীনভাবে পড়ছে। এসব নদীর প্রবাহ সরাসরি সুন্দরবনের সঙ্গে যুক্ত। জোয়ার-ভাটার কারণে এই দূষিত পলি ও কণাগুলো ম্যানগ্রোভ বনের গভীরে পৌঁছে যাচ্ছে। যা সুন্দরবনের পরিবেশ, বাস্তুতন্ত্র ও ভারসাম্যকে আরও বিপদাপন্ন করে তুলছে।”
তিনি এ অবস্থা থেকে সুন্দরবন, উপকূলীয় পরিবেশ ও প্রতিবেশ রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ জরুরি বলে উল্লেখ করে বলেন, “আধুনিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নদীর দূষণমুক্ত ও অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে। না হলে আমাদের বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হবে।”
সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, “জোয়ার ভাটার প্রভাবে এ সব বিষাক্ত ও ভারী বর্জ্য সুন্দরবনসহ উপকূলীয় এলাকায় ছড়িয়ে পড়বে। এতে পুরো উপকূলীয় পরিবেশ ও প্রতিবেশকে ঝুঁকিতে ফেলবে। এ থেকে উত্তরণে এখন থেকেই কলকারখানাসহ গৃহবর্জ্য সরাসরি নদ-নদীতে ফেলা বন্ধ করতে হবে। শিল্প বর্জ্য রিসাইকেল করে দূষণ মাত্রা কমাতে পদক্ষেপ নিতে হবে। এ জন্য আগে জনসচেতনতা সৃষ্টি জরুরি। শিল্প বর্জ্য নদীতে ফেলা বন্ধ করতে প্রয়োজনে আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে। এখন থেকেই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।”
তিনি জানান, সুন্দরবনের উপরিভাগ থেকে প্লাস্টিক বর্জ্য অপসারণে প্রতি সপ্তাহেই অভিযান পরিচালনা করা হয়। বন বিভাগ, ট্যুর অপারেটরস অব সুন্দরবন, সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর সহায়তায় প্লাস্টিক বর্জ্য, বন থেকে বর্জ্য অপসারণের কাজ চলমান রয়েছে।



