২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে ১০,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে চায় সরকার। এ লক্ষ্য অর্জন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের উন্নয়নে বিশেষ আইন প্রণয়নের কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে ‘রিনিউয়েবল এনার্জি ফেস্ট ২০২৬’-এ অংশ নিয়ে তিনি এ কথা বলেন। একশনএইড বাংলাদেশ, বুয়েট, জাস্ট এনার্জি ট্রানজিশন নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ (জেটনেট-বিডি) এবং বুয়েটের ইনস্টিটিউট অব এনার্জি অ্যান্ড সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট (আইইএসডি) যৌথভাবে এ উৎসবের আয়োজন করেছে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, “জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে বিশ্ববাজারের অস্থিরতা ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে। ভবিষ্যতে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার ‘স্পেশাল রিনিউয়েবল এনার্জি ল’ তৈরি করছে। ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে নেওয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রম বাস্তবায়ন সহজ করবে এ আইন।”
সৌরবিদ্যুতের প্রযুক্তি ও সরঞ্জামের ওপর থেকে সব ধরনের শুল্ক তুলে নেওয়া হয়েছে জানিয়ে ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, “বনের ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপনে সরকারি প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি সাশ্রয়ী মূল্যে বিদ্যুৎ কেনার ব্যবস্থাও করা হয়েছে।”
দেশের বিদ্যুৎ সঞ্চালন গ্রিড পুরোপুরি আধুনিক না হওয়ায় পারমাণবিক, জীবাশ্ম ও নবায়নযোগ্য উৎসের বিদ্যুতের সমন্বয় করা কিছুটা কঠিন বলে উল্লেখ করেন মন্ত্রী। তবে পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) গ্রিড আধুনিকায়নের কাজ চলছে বলে জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে একশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির বলেন, গ্রিনহাউস গ্যাস ও কার্বন নিঃসরণ বিশ্বজুড়ে জলবায়ু সংকটের প্রধান কারণ। বাংলাদেশের প্রায় ৯৬% বিদ্যুৎ জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর। এতে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ছে। টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে ন্যায্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক জ্বালানি রূপান্তর প্রয়োজন।
সৌরবিদ্যুতের সরঞ্জামের ওপর থেকে শুল্ক তুলে নেওয়ার উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে তিনি এ প্রক্রিয়ায় তরুণ ও নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেন।
বুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক একরামুল হক বলেন, “আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়ায় অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে।” পরিবেশ রক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সাশ্রয়ী পরিচ্ছন্ন জ্বালানি নিশ্চিত করতে বিশ্ববিদ্যালয় ও নীতিনির্ধারকদের যৌথভাবে কাজ করতে হবে। এক্ষেত্রে উদ্ভাবন ও গবেষণার গুরুত্বও তুলে ধরেন তিনি।
অনুষ্ঠানে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অংশীদারদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিদলের ফার্স্ট কাউন্সেলর ও গ্রিন ইকোনমি অ্যান্ড পাবলিক সেক্টর ইনভেস্টমেন্টস সেকশনের প্রধান টবিয়াস বিয়ারম্যান। এ ছাড়া ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তানের জ্বালানিবিশেষজ্ঞ প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
দিনব্যাপী প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন মেলায় বুয়েটসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুশক্তি, বায়োগ্যাস ও ব্যাটারি স্টোরেজ নিয়ে নিজেদের উদ্ভাবনী প্রকল্প প্রদর্শন করেন। অতিথিরা বিভিন্ন স্টল ও প্রদর্শনী ঘুরে দেখেন। উৎসবে তরুণদের অংশগ্রহণে থিয়েটার পরিবেশনা, সংলাপ ও জ্বালানি রূপান্তরবিষয়ক আলোচনা হয়। এছাড়া দ্য আর্থ সোসাইটির আয়োজনে রিল প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়।
বুধবার উৎসবের সমাপনী দিনে জাতীয় ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় একাধিক উচ্চপর্যায়ের সমান্তরাল সংলাপ ও পূর্ণাঙ্গ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে। এসব অধিবেশনে ন্যায্য জ্বালানি রূপান্তরের জন্য নীতিমালা ও সুশাসন, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে অর্থায়ন ও বিনিয়োগ, উদ্ভাবন, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো এবং জ্বালানি রূপান্তরের সামাজিক ও পরিবেশগত সুরক্ষা নিয়ে আলোচনা হবে। এতে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিশেষজ্ঞরা নিজ নিজ দেশের অভিজ্ঞতা তুলে ধরবেন। এসব অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হবে।
সমাপনী দিনে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিশেষ অবদান রাখা উদ্ভাবক, তরুণ নেতৃত্ব ও সহযোগী প্রতিষ্ঠানকে পুরস্কৃত করা হবে। পুতুলনাচ ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মধ্য দিয়ে শেষ হবে তিন দিনব্যাপী এ উৎসব। সমাপনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ।
দেশে দ্বিতীয়বারের মতো আয়োজিত এ উৎসবের সহ-আয়োজক হিসেবে রয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার রিসার্চ কাউন্সিল (বিইপিআরসি), বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস), বাংলাদেশ সোলার অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন (বিএসআরইএ), সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ (সি৩ইআর), গ্রিনারি এনার্জি সলিউশন লিমিটেড, ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস (আইইইএফএ), অক্সফাম ইন বাংলাদেশ ও দ্য আর্থ সোসাইটি।



