কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে গভীর নলকূপ খননের সময় ভূগর্ভ থেকে গ্যাস নির্গমনের পর সেখানে আগুন ধরে যায়। ২৪ ঘণ্টা পরও সেই আগুন নেভেনি। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রায় এক সপ্তাহ লাগতে পারে বলে জানিয়েছে বাপেক্স।
নিরাপত্তার কারণে ২২ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকায় দুর্ভোগে পড়েছেন হাজারো মানুষ।
উখিয়ার জালিয়াপালং ইউনিয়নের ইনানী ছোটখাল এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল্লাহর বাড়িতে গভীর নলকূপ খননের কাজ চলছিল। এ সময় হঠাৎ ভূগর্ভ থেকে দাহ্য গ্যাস বের হতে শুরু করে। মুহূর্তেই সেই গ্যাসে আগুন ধরে যায়। দুই দিন পেরিয়ে গেলেও আগুনের তীব্রতা কমেনি।
ঘটনাস্থলের চারপাশে নিরাপত্তাবলয় তৈরি করা হয়েছে। আগুন দেখতে সেখানে ভিড় করছেন উৎসুক মানুষ। তবে ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে প্রশাসন কাউকে ঘটনাস্থলের ২০০ মিটারের মধ্যে যেতে দিচ্ছে না।
আগুনের কারণে নিরাপত্তার স্বার্থে জালিয়াপালং ইউনিয়নের প্রায় ২২ কিলোমিটার এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে। এতে হাজার হাজার পরিবার দুর্ভোগে পড়েছে। ফ্রিজে রাখা খাবার নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতিও ক্ষতির মুখে পড়েছে। বিদ্যুৎ না থাকায় স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষাকার্যক্রম, ইন্টারনেট ও মোবাইল নেটওয়ার্ক সেবাও ব্যাহত হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিরা।
স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য এখলাছ সিকদার, বাড়ির মালিক আব্দুল্লাহ, মাহমুদুল হকসহ অনেকে জানান, তারা আগে কখনও এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হননি। দিন-রাত আগুন জ্বলতে থাকায় এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছে। আগুন আর কত দিন জ্বলবে, তা নিয়েও উদ্বেগে রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যকর উদ্যোগ চান তারা।
ঘটনার পর থেকে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স। পাশাপাশি সেনাবাহিনীর বিশেষ বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয়কারী দল, পুলিশ, জেলা প্রশাসন এবং বাপেক্সের বিশেষজ্ঞ দলও ঘটনাস্থলে রয়েছে। তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এটি সাধারণ অগ্নিকাণ্ড নয়। ভূগর্ভ থেকে ক্রমাগত গ্যাস বের হওয়ায় প্রচলিত পদ্ধতিতে আগুন নেভানোর চেষ্টা করলে বড় ধরনের বিস্ফোরণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এ কারণে সতর্কতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা হচ্ছে।
বাপেক্সের ব্যবস্থাপক (ভূতত্ত্ব) ও ভূতাত্ত্বিক জরিপ দলের প্রধান এস এম নাফিফুন আরহাম জানান, ঘটনাস্থল থেকে গ্যাসের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে। পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণ করে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে।
তিনি বলেন, “গ্যাসের প্রবাহ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না এনে আগুন নিভিয়ে দিলে আরও ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। তাই ঝুঁকি মূল্যায়ন করে বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে কাজ করা হচ্ছে। পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে আরও প্রায় এক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।”
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান বলেন, “মানুষের নিরাপত্তা প্রশাসনের প্রধান অগ্রাধিকার। এ কারণে ঘটনাস্থলের চারপাশে নিরাপত্তাবলয় তৈরি করে সাধারণ মানুষকে নিরাপদ দূরত্বে রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করছে এবং পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।”
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো হতাহত বা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। তবে আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত ঝুঁকি রয়েছে। এ জন্য এলাকাবাসীকে অযথা ঘটনাস্থলে ভিড় না করতে এবং প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলতে বলা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গভীর নলকূপ খননের সময় ভূগর্ভস্থ গ্যাসের স্তরে আঘাত লাগলে এ ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে। গ্যাসের প্রবাহ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত আগুন জ্বলতে পারে। তাই তাড়াহুড়া করে আগুন নেভানোর চেষ্টা না করে নিয়ন্ত্রিত ও বিজ্ঞানভিত্তিক পদ্ধতিতে পরিস্থিতি মোকাবিলা করাই নিরাপদ। আগুন নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা নিয়ন্ত্রণে রাখাই প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।



গভীর নলকূপ খুঁড়তে গিয়ে বের হওয়া গ্যাস থেকে আগুন, নেভানো যায়নি ৬ ঘণ্টায়ও